টানা প্রায় এক মাস ধরে তীব্র গ্যাস সংকটে ভুগছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে বুধবার বিকেলে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়েছে, বেড়েছে লোডশেডিং।
মজুত শেষ, বন্ধ হলো গ্যাস সরবরাহ
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বুধবার বিকেল ৩টার দিকে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। টার্মিনালে নতুন করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস না আসায় মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে টানা ২৫ দিন ভয়াবহ গ্যাস সংকটের পর গত শনিবার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হওয়ায় গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছিল। কিন্তু এক্সিলারেটের টার্মিনালে নতুন গ্যাসের চালান না আসায় সোমবার থেকেই সরবরাহ কমতে শুরু করে।
সরাসরি কেনা গ্যাসের চালান আসেনি

দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলো কয়েকটি চালান সরাসরি কেনার উদ্যোগ নিয়েছিল। কম দামে গ্যাস কেনার উদ্দেশ্যে নিয়মিত ক্রয়প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে এসব চালানের ব্যবস্থা করা হয়।
আগস্টে এমন চারটি চালান দেশে পৌঁছানোর কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনোটিই আসেনি। ফলে গ্যাস গ্রহণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের জন্য টার্মিনাল প্রস্তুত থাকলেও সেখানে দেওয়ার মতো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস নেই।
সামিটের মজুতও কমে আসছে
এক্সিলারেটের পাশাপাশি সামিটের টার্মিনালেও গ্যাসের মজুত দ্রুত কমে আসছে। বৃহস্পতিবার একটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী চালান দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেটি সামিটের টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে ওই টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা অব্যাহত রাখা সম্ভব হতে পারে।
অন্যদিকে এক্সিলারেটের জন্য একটি গ্যাসবাহী চালান ২৩ বা ২৪ আগস্ট দেশে পৌঁছাতে পারে। ফলে আগামী কয়েক দিন ওই টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ অনেক কম
দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রায় এক মাস ধরে সরবরাহ এই মাত্রার নিচে রয়েছে।
এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর বুধবার দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২১৮ কোটি ঘনফুটে। এর মধ্যে সামিটের টার্মিনাল থেকে এসেছে ৫৬ কোটি ঘনফুট এবং দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া গেছে ১৬২ কোটি ঘনফুট।

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন গত নয় বছর ধরে কমছে। সেই ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করছে। মহেশখালীতে আমদানি করা গ্যাস গ্রহণের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে—একটি এক্সিলারেট এনার্জির এবং অন্যটি সামিটের।
গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ধাক্কা
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব বুধবার বিকেল থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে পড়তে শুরু করে। সন্ধ্যায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
সন্ধ্যা ৭টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন নেমে আসে ১৪ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াটে। ফলে ওই সময়ে ২ হাজার ৫৩০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়। রাত ৯টাতেও লোডশেডিং ছিল প্রায় ২ হাজার ৪৪৩ মেগাওয়াট।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও সন্ধ্যার পর একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে।
শিল্প ও ঘরোয়া গ্রাহকের সামনে বড় সংকট

গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে যেতে পারে বা সাময়িকভাবে বন্ধও হয়ে যেতে পারে।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব অব্যাহত থাকলে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে। আগামী কয়েক দিন বৃষ্টি না হলে বিদ্যুৎ খাতের ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে শিল্পকারখানার পাশাপাশি সাধারণ মানুষও রান্নার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ভোগান্তিতে পড়তে পারেন।
গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে দ্রুত নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের চালান দেশে আনা না গেলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ—দুই খাতেই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গ্যাস সংকট ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতিতে দেশে লোডশেডিং আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















