ইরানের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বৃহস্পতিবার এ ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, সামরিক অভিযান বাড়ানোর পরিবর্তে তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করাই এখন ওয়াশিংটনের প্রধান কৌশল।
এর এক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ শুরুর হুমকি দেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, যে কোনো দেশ ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা বা অর্থনৈতিক সুবিধা দিলে সেই দেশকেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে হবে।
সামরিক অভিযানের বদলে অর্থনৈতিক চাপ
বেসেন্ট বলেন, ইরানের ওপর সর্বোচ্চ মাত্রার অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হলে বড় ধরনের নতুন সামরিক অভিযান শুরুর প্রয়োজন কমে আসতে পারে। তাঁর ভাষায়, নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধকে একসঙ্গে ব্যবহার করে ইরানের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করা হবে।
তিনি জানান, আগামী সোমবার সংবাদ সম্মেলনে ইরানবিষয়ক মার্কিন পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।
বেসেন্ট আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলা। এ ক্ষেত্রে মিত্র দেশগুলোসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নিষেধাজ্ঞাকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলছে ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
ইরানের দাবি, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে সাধারণ মানুষের ওপর। তেহরানের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে চলা অর্থনৈতিক চাপকে আরও বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি বিশ্ব অর্থনীতি ও বিভিন্ন দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করার সক্ষমতা দেখানোর পর আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বিশ্বের তেল বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সেখানে উত্তেজনা বাড়লেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকির পর বৃহস্পতিবার তেলের দাম তিন সপ্তাহের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এর আগে এপ্রিল ও জুনে দুবার যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। তবে উভয় উদ্যোগই দ্রুত ভেঙে পড়ে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হয়।
চীনকে নিয়েও চাপ তৈরির ইঙ্গিত
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে গেলে চীনও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বেসেন্ট সরাসরি কিছু না বললেও বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলোচনা প্রয়োজন বলে ইঙ্গিত দেন।
ইরানের তেল রপ্তানির বড় অংশই চীন কিনে থাকে। ফলে ইরানের ওপর নতুন করে ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে চীনকে পাশে পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে চীনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিলে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজসহ বিভিন্ন পণ্য সরবরাহে চীনের ভূমিকা থাকায় দুই দেশের মধ্যে নতুন অর্থনৈতিক সংঘাত তৈরি হতে পারে।
প্রায় পাঁচ দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার চাপ
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই ইরান প্রায় ধারাবাহিকভাবে মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। ট্রাম্প বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজিরবিহীন মাত্রায় ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতার’ হুমকি দেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থা ইরানকে কোনো ধরনের সহায়তা দিলে সংশ্লিষ্ট দেশও বড় ধরনের অর্থনৈতিক শাস্তির মুখে পড়বে।
তবে ট্রাম্পের ঘোষণার বাস্তবায়ন নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে। তিনি ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন বা কোন কোন দেশকে লক্ষ্য করা হবে, তা স্পষ্ট করেননি।
যুদ্ধের লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প যে লক্ষ্যগুলো ঘোষণা করেছিলেন, সেগুলোর পুরোপুরি বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া, আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দেশটির সামরিক সক্ষমতা সীমিত করা এবং দেশটির ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহের পরিস্থিতি তৈরি করা ছিল তাঁর ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলাদা আলোচনা চলছে। তেহরান সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে একাধিকবার জানিয়েছে, এ বিষয়ে একটি সমঝোতা কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি বৃহস্পতিবার বলেন, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পুরো অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা জরুরি। তিনি পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করার বিরুদ্ধেও অবস্থান নেন।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন আরও বড় অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















