রাজপরিবারের দায়িত্ব ছেড়ে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর সময় প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কেল সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন এমন এক পরিচয়, যা হলিউডে অর্থ দিয়ে তৈরি করা কঠিন—রাজপরিবারের সদস্য হওয়ার মর্যাদা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে তাদের সেই স্বপ্ন যতটা উজ্জ্বলভাবে শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার মন্টেসিটোতে নতুন জীবন শুরু করে এই দম্পতি স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আর্থিক স্বনির্ভরতার কথা বলেছিলেন। অপরাহ উইনফ্রের সঙ্গে ২০২১ সালের আলোচিত সাক্ষাৎকারে মেগান বলেছিলেন, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার স্বাধীনতা তার কাছে ছিল মুক্তিদায়ক। হ্যারি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারকে এমন ব্যক্তিগত পরিসর ও স্বাধীনতা পাওয়া সম্ভব, যা যুক্তরাজ্যে পাওয়া কঠিন।
শুরুতেই রাজকীয় জৌলুস
মন্টেসিটোতে বসতি গড়ার পর তাদের প্রতিবেশীদের তালিকায় ছিলেন অপরাহ উইনফ্রে, গোয়েনিথ প্যালট্রো ও রব লোয়ের মতো তারকারা। এরপর একের পর এক বড় চুক্তি আসে। পডকাস্ট ও স্ট্রিমিংভিত্তিক বিনোদন প্রকল্পের জন্য কোটি কোটি ডলারের চুক্তি তাদের যুক্তরাষ্ট্রের বিনোদন জগতের অন্যতম আলোচিত নতুন শক্তিতে পরিণত করে।
হলিউডের বিপণন ও জনসংযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুরুতে হ্যারি-মেগান ছিলেন এমন নাম, যাদের ঘিরে সংবাদমাধ্যম ও দর্শকের আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হতো। তাদের নামই ছিল বড় সম্পদ।
কিন্তু তারকা পরিচিতি দিয়ে দরজা খোলা গেলেও সেই দরজা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এগিয়ে যাওয়া সহজ হয়নি।
পডকাস্ট ও স্ট্রিমিং চুক্তিতে ভাটা
মেগানের পডকাস্ট ‘আর্কিটাইপস’ একাধিক পরিচিত ব্যক্তিকে অতিথি হিসেবে হাজির করেছিল। তবে কয়েক বছর পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও তাদের প্রযোজনা সংস্থা যৌথভাবে পথ আলাদা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
২০২০ সালে স্বাক্ষরিত তাদের পাঁচ বছরের স্ট্রিমিং চুক্তিও বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান উপহার দেয়। তবে পরবর্তীতে সেই চুক্তির জায়গায় তুলনামূলক কম লাভজনক ব্যবস্থা আসে। একই সময়ে বিনোদন শিল্পজুড়ে শুরু হয় বড় ধরনের মন্দা, কর্মী ছাঁটাই ও পুনর্গঠন।
তাদের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানেও কর্মী বদলের হার ছিল বেশি। এমনকি সাবেক কয়েকজন কর্মী ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক নাম ব্যবহার করতেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
হ্যারির সবচেয়ে বড় সাফল্য নিজের গল্পে
হ্যারিও বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছেন। তবে তার সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে মূলত নিজের রাজকীয় জীবন ও পরিবারের গল্প তুলে ধরার মাধ্যমে।
তার স্মৃতিকথা ‘স্পেয়ার’ প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বইটি ছয় মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি করে এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নয়—এমন বইয়ের মধ্যে দ্রুততম বিক্রির রেকর্ড গড়ে বলে জানা যায়।
নিজের শৈশব, রাজপরিবারের অভিজ্ঞতা ও মানসিক আঘাত নিয়ে হ্যারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কথা বলেছেন। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। প্রযুক্তি ও বিনোদন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি যুদ্ধাহত ও আহত সাবেক সেনাসদস্যদের নিয়ে তৈরি প্রতিযোগিতা এবং পোলো খেলাকে ঘিরে অনুষ্ঠানেও যুক্ত হয়েছেন।
তবে এসব প্রকল্প কোনোটিই তার রাজপরিবারের অভিজ্ঞতা নিয়ে তৈরি আলোচিত তথ্যচিত্র কিংবা ‘স্পেয়ার’-এর মতো ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করতে পারেনি।

রাজকীয় পরিচয়ের বাইরে বেরোতে পারেননি
যুক্তরাষ্ট্রে হ্যারির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিজের নতুন পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা। তিনি রাজপরিবারের সদস্য হওয়ার পরিচয় থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা একজন বিনোদন ব্যক্তিত্ব বা উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চাইলেও সেই পরিবর্তন পুরোপুরি সফল হয়নি।
মেগানের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব ভিন্ন ছিল না।
সাবেক অভিনেত্রী মেগান জীবনধারা ও রান্নাবিষয়ক অনুষ্ঠান নিয়ে নতুনভাবে দর্শকের সামনে আসেন। সেখানে ক্যালিফোর্নিয়ার মনোরম পরিবেশে তাদের ব্যক্তিগত জীবনের একটি অত্যন্ত সাজানো ও পরিপাটি ছবি তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানটি দুই মৌসুমের পর বন্ধ হয়ে গেলেও তা পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। একই সময়ে মেগানের জীবনধারাভিত্তিক ব্যবসা ‘অ্যাজ এভার’ নিয়েও বড় পরিবর্তন আসে।
হলিউডের এক বিপণন বিশেষজ্ঞের ভাষায়, স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠান সিনেমা ও অনুষ্ঠান তৈরি করে—জ্যাম বা ফলের পণ্য তৈরি করা তাদের মূল কাজ নয়। অর্থাৎ মেগানের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডকে বিনোদন ব্যবসার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে যুক্ত রাখার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে।
নেতিবাচক প্রচারও যে কাজে লাগে
মেগানের জীবনযাপনভিত্তিক অনুষ্ঠান নিয়ে সমালোচনা কম হয়নি। অনেক সমালোচক তার উপস্থাপিত বিলাসী ও অত্যন্ত সাজানো জীবনযাপনকে বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেছেন।
তবে বিপণন বিশেষজ্ঞদের মতে, তারকাদের জন্য নেতিবাচক প্রচারও কখনো কখনো লাভজনক হতে পারে। কারণ সমালোচনা হলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা যায়।
এই অর্থে হ্যারি-মেগান পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যাননি। বরং তারা নিজেদের নিয়ে দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখতে পেরেছেন এবং একই সঙ্গে এমন কিছু পণ্য ও অনুষ্ঠান তৈরি করেছেন, যেগুলো দর্শক দেখতে বা কিনতে পারে।
যুক্তরাজ্যে ফিরেও কি বদলাবে সবকিছু?
যুক্তরাষ্ট্রে তাদের অধ্যায় শেষের দিকে এগোলেও হ্যারি-মেগানের কাজ পুরোপুরি থেমে যাচ্ছে না। সম্প্রতি তারা কিশোরী সংগঠনকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি অভিজাত পোলো জগতকে কেন্দ্র করে একটি ধারাবাহিকও তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে তাদের সামগ্রিক আমেরিকান অভিজ্ঞতা হলিউডের একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে এনেছে—খ্যাতি আপনাকে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘদিন টিকে থাকার নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
হলিউড বর্তমানে ছাঁটাই, পুনর্গঠন ও কর্মী পরিবর্তনের মতো নানা সংকটে রয়েছে। এমন পরিবেশে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান তৈরি করে সেটিকে দীর্ঘদিন সফলভাবে পরিচালনা করা কঠিন। আর প্রতিষ্ঠানের পেছনে যদি তারকা থাকেন, তাহলেও শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ কর্মী ছাড়া সাফল্য ধরে রাখা যায় না।
রাজপরিবারের ছায়া থেকেই যাবে
হ্যারি-মেগান যুক্তরাজ্যে ফিরে গিয়ে সাধারণ মানুষের মতো ব্যক্তিগত জীবন কাটাতে চান—এমন ইঙ্গিত থাকলেও বাস্তবে তাদের পক্ষে পুরোপুরি আড়ালে চলে যাওয়া কঠিন।
তাদের রাজকীয় পরিচয়, পারিবারিক ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মানুষের আগ্রহ এখনো প্রবল। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের তারকাখ্যাতি আগের মতো না থাকলেও জনজীবন থেকে তারা হারিয়ে যাবেন—এমন সম্ভাবনা কম।
তাদের আমেরিকান স্বপ্ন হয়তো প্রত্যাশিত মাত্রায় সফল হয়নি, কিন্তু সেই ব্যর্থতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য দেখিয়েছে—রাজপরিবারের পরিচয় আপনাকে বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত করতে পারে, কিন্তু সেই খ্যাতিকে দীর্ঘস্থায়ী ব্যবসায়িক সাফল্যে রূপ দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















