০৬:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬
তিয়ানআনমেন স্মরণে হংকংয়ের দুই অধিকারকর্মী দোষী সাব্যস্ত রাজা চার্লসের কাছে উইলিয়ামই অগ্রাধিকার, হ্যারি-মেগানের নিরাপত্তায় বছরে লাগতে পারে ৫০ লাখ পাউন্ড মিয়ানমারের বিবৃতি কি রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল করে তুলছে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘হ্যাকিং’ ঠেকিয়ে আলোচনায় টেক্সাসের শিক্ষার্থী ডেঙ্গু নিয়ে ঢাকার বাইরে যে পাঁচ জেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে যুক্তরাজ্যে ফিরেই অভিনয়ে ফিরতে পারেন মেগান হলুদ খাওয়ার উপকার নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলো কতটা সত্য আমেরিকায় হ্যারি-মেগানের ‘স্বপ্ন’ কেন ফিকে হয়ে গেল ট্রাম্পের ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’তে কতটা বিপাকে পড়তে পারে ইরান? রাশিয়ার বিরল ক্ষেপণাস্ত্র মহড়া, জাপানের দাবি করা দ্বীপ ঘিরে বাড়ল উত্তেজনা

চট্টগ্রামে গড়ে উঠছে আরেক ‘জঙ্গল সলিমপুর’, পাহাড় কেটে দখল সরকারি জমি

চট্টগ্রাম নগরের দক্ষিণ পাহাড়তলীর বারাইতলী এলাকায় সরকারি পাহাড়ি জমি দখল করে বসতি গড়ে তোলা এবং পাহাড় কেটে ছোট ছোট প্লট তৈরির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এরই মধ্যে ওই এলাকায় তিন শতাধিক পরিবার বসবাস করছে। আশপাশের পাহাড়েও রয়েছে আরও কয়েক শ ঘরবাড়ি।

দক্ষিণ পাহাড়তলীর ১ নম্বর ওয়ার্ডের বারাইতলী এলাকা শহরের সীমানার মধ্যে হলেও এর পরিবেশ অনেকটা প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদের মতো। সরু মাটির রাস্তার দুই পাশে টিন, বাঁশ ও বেড়া দিয়ে তৈরি ঘর। কোথাও পাহাড়ের ঢালে ঘর, কোথাও পাহাড় কেটে সমতল করে তৈরি করা হয়েছে বসতভিটা। আবার কোথাও নতুন ঘর নির্মাণের কাজ চলছে। বিভিন্ন স্থানে পড়ে আছে কাটা গাছের গুঁড়ি ও পাহাড়ের মাটি।

৯৪ একর সরকারি জমিতে বসতি

ভূমি কার্যালয়ের নথি অনুযায়ী, জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী মৌজার ৩৫৯২, ৩৬৯৬, ৩০৫৩ ও ৩৫৪০ নম্বর দাগে মোট ৯৪ দশমিক ৪৫ একর জমি সরকারের খাস খতিয়ানভুক্ত। এর মধ্যে ৩৫৯২ নম্বর দাগের জমি পাহাড়, ৩০৫৩ নম্বর দাগের জমি খোলা ঘাসজমি এবং বাকি দুটি দাগ নিচু জমি হিসেবে নথিভুক্ত।

তবে বাস্তবে এসব জমির বড় একটি অংশ পাহাড়ি এলাকা। পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে গড়ে উঠেছে বিচ্ছিন্ন বসতি। সরকারি কোনো পূর্ণাঙ্গ জরিপ না থাকায় কত পরিবার সেখানে বসবাস করছে বা কতটা জমি দখল হয়েছে, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু বারাইতলী এলাকাতেই তিন শতাধিক পরিবার বসবাস করছে। আশপাশের পাহাড় মিলিয়ে বাড়ির সংখ্যা আরও কয়েক শ।

দলিল ছাড়াই লাখ টাকায় প্লট বিক্রি

বারাইতলীর প্রায় ৩০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা ছোট ছোট জমির টুকরা কিনতে ৭০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন। কিন্তু জমির বৈধ মালিকানার কোনো কাগজপত্র তাদের কাছে নেই।

একটি লিখিত হস্তান্তরপত্রও পাওয়া গেছে। সেখানে পাঁচটি আধাপাকা ঘরসহ একটি জমি ৭ লাখ টাকায় হস্তান্তরের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে এটি কোনো নিবন্ধিত মালিকানা দলিল নয়।

স্থানীয় পোশাকশ্রমিক আবদুর রহিম তিন বছর আগে প্রায় ৭০ হাজার টাকায় একটি প্লট কিনেছেন। তাঁর ভাষ্য, পাহাড় কেটে প্লট তৈরি করে বিক্রেতারাই তাদের কাছে জমি বুঝিয়ে দিয়েছেন। জমির কোনো কাগজও দেওয়া হয়নি।

গত বছরের ১১ ডিসেম্বর মনোয়ারা বেগম নামের এক নারী পাঁচটি আধাপাকা ঘরসহ একটি পাহাড়ি জমি ৭ লাখ টাকায় মো. সাইফুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী সুরমা আক্তারের কাছে হস্তান্তর করেন বলে ওই কাগজে উল্লেখ রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই জায়গায় পাহাড় কাটার দায়ে সাইফুলকে জরিমানাও করা হয়েছিল।

পাহাড় কাটার প্রমাণ মিলেছে

পাহাড় কাটার অভিযোগ পাওয়ার পর হাটহাজারী উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের উদ্যোগে এলাকা পরিদর্শন করা হয়। পরে পরিবেশ অধিদপ্তর ১৪টি স্থানে পাহাড় কাটার প্রমাণ পায়।

সরকারি নথি অনুযায়ী, এসব স্থানে মোট ১৮ হাজার ৯৯৪ ঘনফুট, অর্থাৎ প্রায় ৫৩৮ ঘনমিটার পাহাড়ি মাটি কাটা হয়েছে। তবে পুরো এলাকার চিত্র এই হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়।

গত ৪ আগস্ট পাহাড় কাটার ঘটনায় ১৪ জনকে মোট ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু জরিমানার পরও কেটে ফেলা পাহাড়ে ঘরবাড়ি রয়ে গেছে। সরকারি জমিও দখলমুক্ত হয়নি।

চার দশকে বাড়তে থাকা বসতি

স্থানীয়দের মতে, বারাইতলীতে বসতির শুরু প্রায় চার দশক আগে। মোহাম্মদ মানিক ১৯৮৬ সালের দিকে ৩ নম্বর বাজার এলাকায় বসবাস শুরু করেন। তখন সেখানে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি ঘর ছিল বলে জানান তিনি।

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর সন্দ্বীপ, হাতিয়াসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষ সেখানে এসে বসতি গড়তে শুরু করেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ঘরের সংখ্যা।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, একপর্যায়ে নিম্ন আয়ের মানুষের বসতিকে সামনে রেখে পাহাড় কেটে নতুন প্লট তৈরি ও জমি হস্তান্তরের প্রবণতা শুরু হয়। এভাবে সরকারি পাহাড়ি জমিতে ধীরে ধীরে স্থায়ী বসতি গড়ে উঠছে।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন কাউন্সিলর গাজী শফিউল আজমের অনুসারী হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের প্রভাব কাজে লাগিয়ে পাহাড় কাটা ও নতুন ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গাজী শফিউল আজমের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

হাটহাজারী উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের একটি প্রতিবেদনে পাহাড় কাটার সঙ্গে মোহাম্মদ হোসেনের নাম এসেছে। নিজেকে বিএনপির কর্মী পরিচয় দেওয়া হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে এটিকে ষড়যন্ত্রমূলক দাবি বলে মন্তব্য করেছেন।

এলাকার কয়েকজনের অভিযোগ, বর্তমানে মো. রুবেলের প্রভাবেই পাহাড় কাটা এবং প্লট কেনাবেচা চলছে। রুবেল নিজেকে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের হাটহাজারী উপজেলা শাখার সাবেক সহকারী দপ্তর সম্পাদক পরিচয় দেন। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করলেও বারাইতলীতে একটি জমি কেনাবেচায় মধ্যস্থতা করার কথা স্বীকার করেছেন।

আবুধাবিপ্রবাসী মোহাম্মদ ফরহাদ রুবেলের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে গত ২৭ জুলাই বাংলাদেশ দূতাবাসে লিখিত অভিযোগও দেন তিনি। রুবেল অবশ্য এই অভিযোগও অস্বীকার করেছেন।

জরিমানা হলেও উচ্ছেদ হয়নি

স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বারাইতলীতে কোনো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার নথি পাওয়া যায়নি।

চলতি বছরের জুনে পাহাড় কাটার অভিযোগ ওঠার পর ভূমি কার্যালয় এলাকা পরিদর্শন করে। পরে পরিবেশ অধিদপ্তর ১৪টি স্থানে পাহাড় কাটার প্রমাণ পায় এবং অভিযুক্তদের জরিমানা করা হয়।

চট্টগ্রাম মহানগর পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা জানিয়েছেন, সরকারি খাস জমি কীভাবে একটি গোষ্ঠী ইজারা বা বিক্রি করছে, তা তদন্ত করতে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে চিঠি পাঠানো হবে। একই সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং সরকারি জমি উদ্ধার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

‘জঙ্গল সলিমপুরের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হবে’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের মতে, নিম্ন আয়ের ও অসহায় মানুষকে সামনে রেখে প্রথমে বসতি তৈরি করা এবং পরে সেই বসতির আড়ালে ধীরে ধীরে পাহাড় কেটে সমতল করে জমি দখল করা—এটি পাহাড় দখলের পরিচিত কৌশল।

সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে দক্ষিণ পাহাড়তলীর পরিস্থিতিকে এখনই নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, শুরুতেই পাহাড় কাটা ও সরকারি জমি দখল বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে বারাইতলীও বড় ধরনের অবৈধ বসতিতে পরিণত হতে পারে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেছেন, আরেকটি জঙ্গল সলিমপুর গড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া হবে না। সেখানে শিগগিরই অবৈধভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদে অভিযান চালানো হবে।

চট্টগ্রামের পাহাড়ি সরকারি জমিতে অবৈধ বসতি ও পাহাড় কাটা এখনই বন্ধ করা না গেলে পরিস্থিতি জঙ্গল সলিমপুরের মতো জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই শুধু জরিমানা নয়, দখলদারদের উচ্ছেদ ও সরকারি জমি পুনরুদ্ধারের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।

জনপ্রিয় সংবাদ

তিয়ানআনমেন স্মরণে হংকংয়ের দুই অধিকারকর্মী দোষী সাব্যস্ত

চট্টগ্রামে গড়ে উঠছে আরেক ‘জঙ্গল সলিমপুর’, পাহাড় কেটে দখল সরকারি জমি

০৫:৪২:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬

চট্টগ্রাম নগরের দক্ষিণ পাহাড়তলীর বারাইতলী এলাকায় সরকারি পাহাড়ি জমি দখল করে বসতি গড়ে তোলা এবং পাহাড় কেটে ছোট ছোট প্লট তৈরির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এরই মধ্যে ওই এলাকায় তিন শতাধিক পরিবার বসবাস করছে। আশপাশের পাহাড়েও রয়েছে আরও কয়েক শ ঘরবাড়ি।

দক্ষিণ পাহাড়তলীর ১ নম্বর ওয়ার্ডের বারাইতলী এলাকা শহরের সীমানার মধ্যে হলেও এর পরিবেশ অনেকটা প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদের মতো। সরু মাটির রাস্তার দুই পাশে টিন, বাঁশ ও বেড়া দিয়ে তৈরি ঘর। কোথাও পাহাড়ের ঢালে ঘর, কোথাও পাহাড় কেটে সমতল করে তৈরি করা হয়েছে বসতভিটা। আবার কোথাও নতুন ঘর নির্মাণের কাজ চলছে। বিভিন্ন স্থানে পড়ে আছে কাটা গাছের গুঁড়ি ও পাহাড়ের মাটি।

৯৪ একর সরকারি জমিতে বসতি

ভূমি কার্যালয়ের নথি অনুযায়ী, জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী মৌজার ৩৫৯২, ৩৬৯৬, ৩০৫৩ ও ৩৫৪০ নম্বর দাগে মোট ৯৪ দশমিক ৪৫ একর জমি সরকারের খাস খতিয়ানভুক্ত। এর মধ্যে ৩৫৯২ নম্বর দাগের জমি পাহাড়, ৩০৫৩ নম্বর দাগের জমি খোলা ঘাসজমি এবং বাকি দুটি দাগ নিচু জমি হিসেবে নথিভুক্ত।

তবে বাস্তবে এসব জমির বড় একটি অংশ পাহাড়ি এলাকা। পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে গড়ে উঠেছে বিচ্ছিন্ন বসতি। সরকারি কোনো পূর্ণাঙ্গ জরিপ না থাকায় কত পরিবার সেখানে বসবাস করছে বা কতটা জমি দখল হয়েছে, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু বারাইতলী এলাকাতেই তিন শতাধিক পরিবার বসবাস করছে। আশপাশের পাহাড় মিলিয়ে বাড়ির সংখ্যা আরও কয়েক শ।

দলিল ছাড়াই লাখ টাকায় প্লট বিক্রি

বারাইতলীর প্রায় ৩০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা ছোট ছোট জমির টুকরা কিনতে ৭০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন। কিন্তু জমির বৈধ মালিকানার কোনো কাগজপত্র তাদের কাছে নেই।

একটি লিখিত হস্তান্তরপত্রও পাওয়া গেছে। সেখানে পাঁচটি আধাপাকা ঘরসহ একটি জমি ৭ লাখ টাকায় হস্তান্তরের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে এটি কোনো নিবন্ধিত মালিকানা দলিল নয়।

স্থানীয় পোশাকশ্রমিক আবদুর রহিম তিন বছর আগে প্রায় ৭০ হাজার টাকায় একটি প্লট কিনেছেন। তাঁর ভাষ্য, পাহাড় কেটে প্লট তৈরি করে বিক্রেতারাই তাদের কাছে জমি বুঝিয়ে দিয়েছেন। জমির কোনো কাগজও দেওয়া হয়নি।

গত বছরের ১১ ডিসেম্বর মনোয়ারা বেগম নামের এক নারী পাঁচটি আধাপাকা ঘরসহ একটি পাহাড়ি জমি ৭ লাখ টাকায় মো. সাইফুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী সুরমা আক্তারের কাছে হস্তান্তর করেন বলে ওই কাগজে উল্লেখ রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই জায়গায় পাহাড় কাটার দায়ে সাইফুলকে জরিমানাও করা হয়েছিল।

পাহাড় কাটার প্রমাণ মিলেছে

পাহাড় কাটার অভিযোগ পাওয়ার পর হাটহাজারী উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের উদ্যোগে এলাকা পরিদর্শন করা হয়। পরে পরিবেশ অধিদপ্তর ১৪টি স্থানে পাহাড় কাটার প্রমাণ পায়।

সরকারি নথি অনুযায়ী, এসব স্থানে মোট ১৮ হাজার ৯৯৪ ঘনফুট, অর্থাৎ প্রায় ৫৩৮ ঘনমিটার পাহাড়ি মাটি কাটা হয়েছে। তবে পুরো এলাকার চিত্র এই হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়।

গত ৪ আগস্ট পাহাড় কাটার ঘটনায় ১৪ জনকে মোট ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু জরিমানার পরও কেটে ফেলা পাহাড়ে ঘরবাড়ি রয়ে গেছে। সরকারি জমিও দখলমুক্ত হয়নি।

চার দশকে বাড়তে থাকা বসতি

স্থানীয়দের মতে, বারাইতলীতে বসতির শুরু প্রায় চার দশক আগে। মোহাম্মদ মানিক ১৯৮৬ সালের দিকে ৩ নম্বর বাজার এলাকায় বসবাস শুরু করেন। তখন সেখানে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি ঘর ছিল বলে জানান তিনি।

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর সন্দ্বীপ, হাতিয়াসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষ সেখানে এসে বসতি গড়তে শুরু করেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ঘরের সংখ্যা।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, একপর্যায়ে নিম্ন আয়ের মানুষের বসতিকে সামনে রেখে পাহাড় কেটে নতুন প্লট তৈরি ও জমি হস্তান্তরের প্রবণতা শুরু হয়। এভাবে সরকারি পাহাড়ি জমিতে ধীরে ধীরে স্থায়ী বসতি গড়ে উঠছে।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন কাউন্সিলর গাজী শফিউল আজমের অনুসারী হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের প্রভাব কাজে লাগিয়ে পাহাড় কাটা ও নতুন ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গাজী শফিউল আজমের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

হাটহাজারী উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের একটি প্রতিবেদনে পাহাড় কাটার সঙ্গে মোহাম্মদ হোসেনের নাম এসেছে। নিজেকে বিএনপির কর্মী পরিচয় দেওয়া হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে এটিকে ষড়যন্ত্রমূলক দাবি বলে মন্তব্য করেছেন।

এলাকার কয়েকজনের অভিযোগ, বর্তমানে মো. রুবেলের প্রভাবেই পাহাড় কাটা এবং প্লট কেনাবেচা চলছে। রুবেল নিজেকে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের হাটহাজারী উপজেলা শাখার সাবেক সহকারী দপ্তর সম্পাদক পরিচয় দেন। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করলেও বারাইতলীতে একটি জমি কেনাবেচায় মধ্যস্থতা করার কথা স্বীকার করেছেন।

আবুধাবিপ্রবাসী মোহাম্মদ ফরহাদ রুবেলের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে গত ২৭ জুলাই বাংলাদেশ দূতাবাসে লিখিত অভিযোগও দেন তিনি। রুবেল অবশ্য এই অভিযোগও অস্বীকার করেছেন।

জরিমানা হলেও উচ্ছেদ হয়নি

স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বারাইতলীতে কোনো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার নথি পাওয়া যায়নি।

চলতি বছরের জুনে পাহাড় কাটার অভিযোগ ওঠার পর ভূমি কার্যালয় এলাকা পরিদর্শন করে। পরে পরিবেশ অধিদপ্তর ১৪টি স্থানে পাহাড় কাটার প্রমাণ পায় এবং অভিযুক্তদের জরিমানা করা হয়।

চট্টগ্রাম মহানগর পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা জানিয়েছেন, সরকারি খাস জমি কীভাবে একটি গোষ্ঠী ইজারা বা বিক্রি করছে, তা তদন্ত করতে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে চিঠি পাঠানো হবে। একই সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং সরকারি জমি উদ্ধার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

‘জঙ্গল সলিমপুরের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হবে’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের মতে, নিম্ন আয়ের ও অসহায় মানুষকে সামনে রেখে প্রথমে বসতি তৈরি করা এবং পরে সেই বসতির আড়ালে ধীরে ধীরে পাহাড় কেটে সমতল করে জমি দখল করা—এটি পাহাড় দখলের পরিচিত কৌশল।

সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে দক্ষিণ পাহাড়তলীর পরিস্থিতিকে এখনই নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, শুরুতেই পাহাড় কাটা ও সরকারি জমি দখল বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে বারাইতলীও বড় ধরনের অবৈধ বসতিতে পরিণত হতে পারে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেছেন, আরেকটি জঙ্গল সলিমপুর গড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া হবে না। সেখানে শিগগিরই অবৈধভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদে অভিযান চালানো হবে।

চট্টগ্রামের পাহাড়ি সরকারি জমিতে অবৈধ বসতি ও পাহাড় কাটা এখনই বন্ধ করা না গেলে পরিস্থিতি জঙ্গল সলিমপুরের মতো জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই শুধু জরিমানা নয়, দখলদারদের উচ্ছেদ ও সরকারি জমি পুনরুদ্ধারের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।