বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বড় বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বারবার। কিন্তু লক্ষ্য ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবায়নের গতির মিল খুব কমই দেখা গেছে। প্রায় দুই দশক আগে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি গ্রহণ করা হলেও এখনো মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে।
২০১৫ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ৫ শতাংশ বিদ্যুৎ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। দুটি লক্ষ্যই পূরণ হয়নি। এবার ২০২৫ সালের নতুন নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এবার কি সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের গতি বাড়বে?
লক্ষ্যের সঙ্গে বাস্তবতার বড় ব্যবধান
চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা ছিল প্রায় ১ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াট। বিপরীতে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।
২০৩০ সালের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আগামী কয়েক বছর প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৭৬০ মেগাওয়াট নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করতে হবে। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট নবায়নযোগ্য সক্ষমতা প্রায় ৫ হাজার ৮৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত করতে হবে। বর্তমান বাস্তবায়নের গতি বিবেচনায় নিলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন বলেই মনে হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুতেই সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা
বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত মূলত সৌরবিদ্যুতিনির্ভর। মোট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে সৌরশক্তি থেকে। এর বাইরে কাপ্তাইয়ের পুরোনো জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সীমিত পরিসরের বায়ুবিদ্যুৎ রয়েছে।
তবে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা বাংলাদেশে যথেষ্ট। দেশের সৌরশক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা ৫০ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। তাত্ত্বিকভাবে এই সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারলে ২০৪১ সালের সম্ভাব্য বিদ্যুৎ চাহিদার বড় একটি অংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব।
অর্থাৎ সূর্যালোকের অভাব বাংলাদেশের সমস্যা নয়। বড় বাধা হচ্ছে জমির সংকট, অর্থায়ন, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং এমন একটি মূল্যকাঠামো, যেখানে এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি পরোক্ষ সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে।
ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পেও অবাস্তব লক্ষ্য
সরকারের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি এর একটি বড় উদাহরণ। গত বছর এই কর্মসূচির আওতায় ডিসেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে ৩ হাজার মেগাওয়াট নতুন সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিন্তু ২০০৮ সাল থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৭ বছরে দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের স্থাপিত সক্ষমতা ছিল মাত্র ২৪৫ মেগাওয়াট। ফলে মাত্র কয়েক মাসে ৩ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছানোর লক্ষ্য বাস্তব অবকাঠামোর সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসানোর পরিকল্পনা ভালো হলেও এত দ্রুত সেই সক্ষমতা তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল কি না, সেটি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি।
লক্ষ্য ঘোষণা এবং প্রকৃত প্রকৌশলগত সক্ষমতার মধ্যে এই ব্যবধান বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন কিছু নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে এটি একটি পুনরাবৃত্ত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন
তবে সাম্প্রতিক সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সৌরপ্যানেল, বৈদ্যুতিক রূপান্তরযন্ত্র ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ও বিভিন্ন কর সুবিধা ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংরক্ষণে ব্যবহৃত ব্যাটারি ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের উদ্যোগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জাম আমদানির খরচ কমাতে পারে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এ ছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি গ্রাহকের কাছে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ দেওয়ার নীতিগত পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের জন্যও নতুন বাজার তৈরি হতে পারে।
বিদ্যুতের দামে নীতিগত অসামঞ্জস্য
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ এখন প্রতি ইউনিট প্রায় ৮ থেকে ৯ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে।
কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম এখনো এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত, যাতে সৌরবিদ্যুতে যাওয়ার আর্থিক প্রণোদনা খুব বেশি তৈরি হচ্ছে না। একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ভর্তুকি বা মূল্য নিয়ন্ত্রণ থাকবে, অন্যদিকে মানুষ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সৌরবিদ্যুতে যাওয়ার আহ্বান জানানো হবে—এই দুই নীতির মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে।
এই বৈপরীত্য দূর করা না গেলে সৌরপ্যানেল ও অন্যান্য সরঞ্জামের ওপর কর ছাড় মূলত আমদানিকারকদের সুবিধা বাড়াতে পারে, কিন্তু প্রত্যাশিত মাত্রায় নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াবে না।
জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও নবায়নযোগ্য শক্তি জরুরি
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রয়োজন শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও এটি সরাসরি যুক্ত।
চলতি বছরে গ্যাসের সংকটের কারণে এক মাসেই প্রায় ৩ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। এর সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকা ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে আরও প্রায় ১ হাজার ৬৬৮ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানো যায়নি।
দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৪৩ শতাংশ গ্যাসভিত্তিক এবং আরও ২৭ শতাংশ কয়লাভিত্তিক। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধি কিংবা আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
সূর্য ও বাতাসের জন্য কোনো জাহাজ, আমদানি চুক্তি বা আন্তর্জাতিক সরবরাহপথের প্রয়োজন নেই। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাংলাদেশের জন্য পরিবেশবান্ধব বিকল্পের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তারও অন্যতম পথ হতে পারে।
জমির সংকটে নতুন চিন্তা দরকার
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত জমি পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষিজমি ও বসতিপূর্ণ এলাকায় বড় প্রকল্প গড়ে তোলাও সবসময় বাস্তবসম্মত নয়।
এ কারণে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নদীর জেগে ওঠা চরকে কাজে লাগানোর মতো ধারণা গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। নদীমাতৃক ও ভূমিস্বল্পতার দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এসব বিকল্প ব্যবস্থাকে পরীক্ষামূলকভাবে নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে বড় পরিসরে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারে।
প্রয়োজন শক্তিশালী বাস্তবায়ন ব্যবস্থা
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখন আরেকটি নতুন লক্ষ্য নয়; বরং বিদ্যমান লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে জমি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থায় সংযোগ, বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ এবং বিনিয়োগকারীদের সেবা দেওয়ার মতো একাধিক বিষয় একই সঙ্গে সামলাতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় জনবল ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকলে এত বড় পরিবর্তন দ্রুত বাস্তবায়ন করা কঠিন।
শুধু উচ্চাভিলাষী নীতি থাকলেই হবে না। সেই নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত অর্থ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়।
এবার প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নই পরীক্ষা
২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্য বাংলাদেশের জন্য উচ্চাভিলাষী হলেও প্রয়োজনীয়। আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে এমন লক্ষ্য থাকা জরুরি।
তবে লক্ষ্য নির্ধারণই সবচেয়ে সহজ কাজ। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যুতের মূল্যকাঠামো সংস্কার, সৌরবিদ্যুতের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া, সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা আধুনিক করা এবং জমির সংকট মোকাবিলায় নতুন প্রযুক্তি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
বাংলাদেশের এখন আর আরও বড় প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন নেই। প্রায় দুই দশক ধরে প্রতিশ্রুতির ঘাটতি ছিল না। এবার প্রয়োজন একটি নির্ধারিত লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে নতুন লক্ষ্য ঘোষণায় নয়, বরং সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের গতিতে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য বাস্তবায়ন, সৌরবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা ও জ্বালানি নিরাপত্তা—বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার জায়গা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















