১১:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
মাদক-জুয়ার বিরুদ্ধে কথা বলায় হামলা, ২১ দিনের লড়াই শেষে শিক্ষকের মৃত্যু নাৎসি অতীতের গল্প, কিন্তু গল্পটি বলার অধিকার কার? ভারতের এক শহরে প্রযুক্তির এমন এক কর্মক্ষেত্র, যেখানে এখনো মানুষের স্পর্শ অপরিহার্য উচ্চ ঋণের খরচ ও বদলে যাওয়া বিশ্ব অর্থব্যবস্থা হরমুজ প্রণালিতে ‘অদৃশ্য’ তেলবাহী জাহাজ, বাড়ছে ভয়াবহ তেলদূষণের ঝুঁকি তুরস্ক নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের ‘রেড নোটিশ’ চাইবে যুক্তরাজ্যে বৃষ্টির বিরতি, সপ্তাহান্তে ফিরছে রোদ মোংলায় ১৩ বছরের কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ, যুবক আটক ২০২৭ সালে এক বছরের বিরতিতে যাচ্ছে জনপ্রিয় বনরু উৎসব চীনে রেকর্ডসংখ্যক গাড়ি প্রত্যাহার, দরজার নিরাপত্তায় টেসলাসহ ৯ নির্মাতা

এক শতাব্দীর নীরব ভালোবাসা – কোরিয়ার মানহে ও রবীন্দ্রনাথ

কোরিয়ার আধুনিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবনকে একটি পরিচয়ে আটকে রাখা যায় না। হান ইয়ং-উন, যিনি ‘মানহে’ নামে বেশি পরিচিত, ছিলেন একই সঙ্গে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, কবি, চিন্তক, উপন্যাসিক, ধর্মসংস্কারক এবং কোরিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো অন্য কোথাও—তিনি এমন এক সময়ের মানুষ, যখন একটি জাতি নিজের পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।

১৮৭৯ সালের ২৯ আগস্ট জন্ম নেওয়া হান ইয়ং-উনের জীবনের সঙ্গে কোরিয়ার ইতিহাসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ আশ্চর্যভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯১০ সালের একই দিনে কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে জাপানের অধিভুক্ত হয়। আর ১৯২৬ সালের ২৯ আগস্ট প্রকাশিত হয় তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘নিমুই চিনমুক’। এই বছর সেই গ্রন্থ প্রকাশের একশ বছর পূর্ণ হলো।

এক শতাব্দী পর প্রশ্ন উঠতেই পারে—আজকের কোরিয়ানরা কতটা মন দিয়ে সেই ৮৮টি কবিতা পড়েন? ভাষা বদলে গেছে, শব্দের ব্যবহার বদলেছে, সাহিত্য পাঠের অভ্যাসও আগের মতো নেই। তবু ‘নিমুই চিনমুক’ কোরিয়ার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে এমনভাবে গেঁথে আছে যে এর শিরোনাম বা মূল আবেগের সঙ্গে পরিচয় নেই—এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন।

শতবর্ষে ফিরে দেখা মানহেকে

মানহের শেষ জীবনের বাড়ি সিমউজাংকে ঘিরে এ বছর স্মরণ আয়োজন হয়েছে। তাঁর কবিতা ও জীবনকে নতুন করে পাঠ করার চেষ্টা চলছে। এই ফিরে দেখা কেবল একজন কবিকে স্মরণ করার আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং কোরিয়ার আধুনিক সাহিত্য কীভাবে তার নিজস্ব ঐতিহ্য, বিদেশি প্রভাব, ধর্মীয় দর্শন এবং জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে একসঙ্গে ধারণ করেছিল, সেটিও বোঝার সুযোগ।

আধুনিক কোরিয়ান কবিতার ইতিহাসে ‘নিমুই চিনমুক’-এর পাশে প্রায়ই কিম সো-ওলের ‘আজালিয়া’-র কথা আসে। ‘আজালিয়া’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৫ সালে, এক বছর আগে। ঐতিহ্যবাহী কোরিয়ান কাব্যরীতির সঙ্গে তার সম্পর্ক গভীর এবং সাধারণ পাঠকের কাছেও তার ভাষা তুলনামূলকভাবে সহজ। অন্যদিকে মানহের কবিতায় ছিল এক ধরনের অপ্রচলিত বিস্তার। দীর্ঘ পঙ্‌ক্তি, মুক্ত প্রবাহ এবং আবেগের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলা ভাষা ১৯২৬ সালের পাঠকের কাছে নিশ্চয়ই যথেষ্ট নতুন মনে হয়েছিল।

মানহে অবশ্য ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। তিনি ধ্রুপদি চীনা শব্দভাণ্ডারে গভীরভাবে পারদর্শী ছিলেন, সিজো রীতিতে প্রায় ৪০টি কবিতা লিখেছিলেন এবং ধ্রুপদি চীনা ভাষাতেও বহু কবিতা রচনা করেছিলেন। তবু ‘নিমুই চিনমুক’-এর কবিতাগুলো সেই পুরোনো কাঠামোয় আবদ্ধ থাকেনি। এখানেই তাঁর কাব্যিক পরীক্ষা সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ।

রবীন্দ্রনাথের ছায়া, কিন্তু অনুকরণ নয়

মানহের কাব্যভাষা বোঝার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলি’-র প্রভাব উপেক্ষা করা যায় না। ১৯২৩ সালে কিম অকের অনুবাদে ‘গীতাঞ্জলি’ কোরিয়ায় প্রকাশিত হয়। তার আগেই কিম অকের অনুবাদে পশ্চিমা আধুনিক কবিতার একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠ মানহের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে হয়।

এর একটি কারণ ছিল রবীন্দ্রনাথের কবিতায় প্রেম, আত্মিক আকাঙ্ক্ষা ও পরম বাস্তবতার যে সম্পর্ক তৈরি হয়। আরেকটি কারণ ছিল ভারতের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে চলমান স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক। মানহে নিজেও এমন এক দেশের মানুষ ছিলেন, যার জাতীয় অস্তিত্ব তখন বিদেশি শাসনের অধীনে।

তবে রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক জগতকে মানহে সরলভাবে গ্রহণ করেননি। এখানেই তাঁদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। ‘গীতাঞ্জলি’-তে ঈশ্বর ও পরম সত্তার উপস্থিতি কেন্দ্রীয়; মানহে ছিলেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, যার দর্শনে চূড়ান্ত সত্যকে ঈশ্বরকেন্দ্রিক ধারণায় আবদ্ধ করা হয় না। তাঁর কাছে নীরবতা, শূন্যতা ও অস্তিত্বের গভীর অনুসন্ধান ছিল অন্য ধরনের আধ্যাত্মিক পথ।

তবু তাঁর কবিতায় অনুভূতির তীব্রতা এত প্রবল যে অনেক পাঠক সেখানে ব্যক্তিগত প্রেমের গল্প খুঁজেছেন। কেউ কেউ মনে করেছেন, ‘নিম’ নিশ্চয়ই কোনো নির্দিষ্ট নারী বা প্রেমিকার প্রতীক। কিন্তু এই পাঠ মানহের ভাবনার বিস্তৃতিকে সংকুচিত করে ফেলে।

‘নিম’ আসলে কী?

মানহের নিজের ব্যাখ্যাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাছে ‘নিম’ কেবল কোনো মানবপ্রেমের মানুষ নন। এটি সেই সব কিছুর প্রতীক, যার জন্য কোনো সত্তা গভীরভাবে আকাঙ্ক্ষা করে। বুদ্ধের কাছে সব প্রাণী যেমন ‘নিম’, কান্টের কাছে দর্শন যেমন আকাঙ্ক্ষার বিষয়, গোলাপের কাছে বসন্তের বৃষ্টি যেমন কাঙ্ক্ষিত—তেমনি ‘নিম’ মানে ভালোবাসার কেন্দ্র, আবার সেই ভালোবাসারও প্রতিসরণ।

এই ধারণার কারণেই ‘নিমুই চিনমুক’-কে নিছক প্রেমের কবিতার বই হিসেবে পড়লে তার গভীরতা ধরা পড়ে না। এখানে প্রেম ব্যক্তিগত অনুভূতির সীমা ছাড়িয়ে দর্শন, স্বাধীনতা, আধ্যাত্মিকতা এবং অস্তিত্বের প্রশ্নে পৌঁছে যায়।

মানহের কাছে ভালোবাসা ও স্বাধীনতার সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। যে মানুষ বা সত্তাকে আমরা ভালোবাসি, তাকে নিজের করে নেওয়া নয়; বরং সেই আকাঙ্ক্ষার মধ্যেই স্বাধীনতার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ‘নিম’ একই সঙ্গে অনুপস্থিতির প্রতীক এবং উপস্থিতির অনুসন্ধান।

A century of loving silence - The Korea Times

শিরোনামের অনুবাদও তাই সহজ নয়

‘নিমুই চিনমুক’-এর ইংরেজি অনুবাদ করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যার জায়গা সম্ভবত প্রথম শব্দটি—‘নিম’। ইংরেজিতে এর সরাসরি কোনো সমার্থক শব্দ নেই। এমনকি আধুনিক কোরিয়ান ভাষাতেও মানহে যে বিস্তৃত অর্থে শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন, সেই ব্যবহার খুব সাধারণ নয়।

এই কারণে গ্রন্থটির শিরোনাম অনুবাদ করা শুধু ভাষান্তরের কাজ নয়; এটি মানহের দর্শন বোঝারও পরীক্ষা। ‘নিম’-কে কেবল প্রিয়জন হিসেবে অনুবাদ করলে তাঁর ধারণার ব্যাপ্তি হারিয়ে যায়। আবার নিছক দার্শনিক শব্দ ব্যবহার করলেও কবিতার আবেগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সম্প্রতি পুরো কাব্যগ্রন্থের অনুবাদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও এই সমস্যাটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। সেখানে ‘নিমুই চিনমুক’-এর সম্ভাব্য ইংরেজি রূপ হিসেবে ‘Your Silence’ ধরনের একটি ব্যাখ্যা উঠে এসেছে। নামটি প্রথমে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু মানহের কবিতায় অনুপস্থিতি, নীরবতা, আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসার যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তার আলোকে এটি একেবারে অমূলকও নয়।

মানহের কবিতার বিখ্যাত সূচনাও এই দ্বৈত অনুভূতিকে ধারণ করে। সেখানে ‘তুমি’ চলে গেছ—কিন্তু সেই চলে যাওয়া কেবল বিচ্ছেদ নয়। পাহাড়, বন, সরু পথ আর দ্বিধা পেরিয়ে চলে যাওয়া যেন একদিকে হারানোর অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে অনুসন্ধানের শুরু।

একশ বছর পরও কেন মানহে গুরুত্বপূর্ণ

একটি কবিতার শতবর্ষ পূর্তি সাধারণত সাহিত্যিক স্মরণানুষ্ঠানের বিষয়। কিন্তু মানহের ক্ষেত্রে তা আরও বড় অর্থ বহন করে। তাঁর জীবন দেখায়, সাহিত্য কখনো কেবল নান্দনিকতার জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি জাতি যখন নিজের পরিচয় হারানোর আশঙ্কায় থাকে, তখন কবিতা হয়ে উঠতে পারে আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের একটি ভাষা।

মানহে একই সঙ্গে ঐতিহ্যের ভেতরে দাঁড়িয়েছিলেন এবং নতুনের দিকে তাকিয়েছিলেন। তিনি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হয়েও প্রচলিত ধর্মীয় ধারণাকে প্রশ্ন করেছেন; কবি হয়েও কেবল প্রেমের ভাষায় থেমে থাকেননি; জাতীয়তাবাদী হয়েও তাঁর ‘নিম’-কে কোনো একক রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করেননি।

তাঁর কবিতার স্থায়িত্ব সম্ভবত এখানেই। একশ বছর পর ভাষা বদলেছে, সমাজ বদলেছে, কোরিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল পাল্টেছে। কিন্তু মানুষ যে এখনও হারানো কিছুর সন্ধান করে, ভালোবাসার অর্থ নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং স্বাধীনতার সঙ্গে আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক খুঁজে ফেরে—মানহের কবিতা সেই মানবিক সত্যকে স্পর্শ করে আছে।

তাই ‘নিমুই চিনমুক’-এর শতবর্ষ কেবল একটি পুরোনো কাব্যগ্রন্থের জন্মদিন নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, কিছু কবিতা সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না; বরং সময় বদলানোর সঙ্গে তাদের অর্থ নতুন করে উন্মোচিত হয়। মানহের নীরবতা সেই অর্থে নীরব নয়। এক শতাব্দী পরও তা পাঠককে ডেকে যায়—হারিয়ে যাওয়া মানুষ, স্বাধীনতা, ভালোবাসা এবং নিজের সত্যিকারের পরিচয়ের দিকে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মাদক-জুয়ার বিরুদ্ধে কথা বলায় হামলা, ২১ দিনের লড়াই শেষে শিক্ষকের মৃত্যু

এক শতাব্দীর নীরব ভালোবাসা – কোরিয়ার মানহে ও রবীন্দ্রনাথ

১০:০০:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

কোরিয়ার আধুনিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবনকে একটি পরিচয়ে আটকে রাখা যায় না। হান ইয়ং-উন, যিনি ‘মানহে’ নামে বেশি পরিচিত, ছিলেন একই সঙ্গে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, কবি, চিন্তক, উপন্যাসিক, ধর্মসংস্কারক এবং কোরিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো অন্য কোথাও—তিনি এমন এক সময়ের মানুষ, যখন একটি জাতি নিজের পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।

১৮৭৯ সালের ২৯ আগস্ট জন্ম নেওয়া হান ইয়ং-উনের জীবনের সঙ্গে কোরিয়ার ইতিহাসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ আশ্চর্যভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯১০ সালের একই দিনে কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে জাপানের অধিভুক্ত হয়। আর ১৯২৬ সালের ২৯ আগস্ট প্রকাশিত হয় তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘নিমুই চিনমুক’। এই বছর সেই গ্রন্থ প্রকাশের একশ বছর পূর্ণ হলো।

এক শতাব্দী পর প্রশ্ন উঠতেই পারে—আজকের কোরিয়ানরা কতটা মন দিয়ে সেই ৮৮টি কবিতা পড়েন? ভাষা বদলে গেছে, শব্দের ব্যবহার বদলেছে, সাহিত্য পাঠের অভ্যাসও আগের মতো নেই। তবু ‘নিমুই চিনমুক’ কোরিয়ার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে এমনভাবে গেঁথে আছে যে এর শিরোনাম বা মূল আবেগের সঙ্গে পরিচয় নেই—এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন।

শতবর্ষে ফিরে দেখা মানহেকে

মানহের শেষ জীবনের বাড়ি সিমউজাংকে ঘিরে এ বছর স্মরণ আয়োজন হয়েছে। তাঁর কবিতা ও জীবনকে নতুন করে পাঠ করার চেষ্টা চলছে। এই ফিরে দেখা কেবল একজন কবিকে স্মরণ করার আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং কোরিয়ার আধুনিক সাহিত্য কীভাবে তার নিজস্ব ঐতিহ্য, বিদেশি প্রভাব, ধর্মীয় দর্শন এবং জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে একসঙ্গে ধারণ করেছিল, সেটিও বোঝার সুযোগ।

আধুনিক কোরিয়ান কবিতার ইতিহাসে ‘নিমুই চিনমুক’-এর পাশে প্রায়ই কিম সো-ওলের ‘আজালিয়া’-র কথা আসে। ‘আজালিয়া’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৫ সালে, এক বছর আগে। ঐতিহ্যবাহী কোরিয়ান কাব্যরীতির সঙ্গে তার সম্পর্ক গভীর এবং সাধারণ পাঠকের কাছেও তার ভাষা তুলনামূলকভাবে সহজ। অন্যদিকে মানহের কবিতায় ছিল এক ধরনের অপ্রচলিত বিস্তার। দীর্ঘ পঙ্‌ক্তি, মুক্ত প্রবাহ এবং আবেগের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলা ভাষা ১৯২৬ সালের পাঠকের কাছে নিশ্চয়ই যথেষ্ট নতুন মনে হয়েছিল।

মানহে অবশ্য ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। তিনি ধ্রুপদি চীনা শব্দভাণ্ডারে গভীরভাবে পারদর্শী ছিলেন, সিজো রীতিতে প্রায় ৪০টি কবিতা লিখেছিলেন এবং ধ্রুপদি চীনা ভাষাতেও বহু কবিতা রচনা করেছিলেন। তবু ‘নিমুই চিনমুক’-এর কবিতাগুলো সেই পুরোনো কাঠামোয় আবদ্ধ থাকেনি। এখানেই তাঁর কাব্যিক পরীক্ষা সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ।

রবীন্দ্রনাথের ছায়া, কিন্তু অনুকরণ নয়

মানহের কাব্যভাষা বোঝার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলি’-র প্রভাব উপেক্ষা করা যায় না। ১৯২৩ সালে কিম অকের অনুবাদে ‘গীতাঞ্জলি’ কোরিয়ায় প্রকাশিত হয়। তার আগেই কিম অকের অনুবাদে পশ্চিমা আধুনিক কবিতার একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠ মানহের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে হয়।

এর একটি কারণ ছিল রবীন্দ্রনাথের কবিতায় প্রেম, আত্মিক আকাঙ্ক্ষা ও পরম বাস্তবতার যে সম্পর্ক তৈরি হয়। আরেকটি কারণ ছিল ভারতের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে চলমান স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক। মানহে নিজেও এমন এক দেশের মানুষ ছিলেন, যার জাতীয় অস্তিত্ব তখন বিদেশি শাসনের অধীনে।

তবে রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক জগতকে মানহে সরলভাবে গ্রহণ করেননি। এখানেই তাঁদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। ‘গীতাঞ্জলি’-তে ঈশ্বর ও পরম সত্তার উপস্থিতি কেন্দ্রীয়; মানহে ছিলেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, যার দর্শনে চূড়ান্ত সত্যকে ঈশ্বরকেন্দ্রিক ধারণায় আবদ্ধ করা হয় না। তাঁর কাছে নীরবতা, শূন্যতা ও অস্তিত্বের গভীর অনুসন্ধান ছিল অন্য ধরনের আধ্যাত্মিক পথ।

তবু তাঁর কবিতায় অনুভূতির তীব্রতা এত প্রবল যে অনেক পাঠক সেখানে ব্যক্তিগত প্রেমের গল্প খুঁজেছেন। কেউ কেউ মনে করেছেন, ‘নিম’ নিশ্চয়ই কোনো নির্দিষ্ট নারী বা প্রেমিকার প্রতীক। কিন্তু এই পাঠ মানহের ভাবনার বিস্তৃতিকে সংকুচিত করে ফেলে।

‘নিম’ আসলে কী?

মানহের নিজের ব্যাখ্যাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাছে ‘নিম’ কেবল কোনো মানবপ্রেমের মানুষ নন। এটি সেই সব কিছুর প্রতীক, যার জন্য কোনো সত্তা গভীরভাবে আকাঙ্ক্ষা করে। বুদ্ধের কাছে সব প্রাণী যেমন ‘নিম’, কান্টের কাছে দর্শন যেমন আকাঙ্ক্ষার বিষয়, গোলাপের কাছে বসন্তের বৃষ্টি যেমন কাঙ্ক্ষিত—তেমনি ‘নিম’ মানে ভালোবাসার কেন্দ্র, আবার সেই ভালোবাসারও প্রতিসরণ।

এই ধারণার কারণেই ‘নিমুই চিনমুক’-কে নিছক প্রেমের কবিতার বই হিসেবে পড়লে তার গভীরতা ধরা পড়ে না। এখানে প্রেম ব্যক্তিগত অনুভূতির সীমা ছাড়িয়ে দর্শন, স্বাধীনতা, আধ্যাত্মিকতা এবং অস্তিত্বের প্রশ্নে পৌঁছে যায়।

মানহের কাছে ভালোবাসা ও স্বাধীনতার সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। যে মানুষ বা সত্তাকে আমরা ভালোবাসি, তাকে নিজের করে নেওয়া নয়; বরং সেই আকাঙ্ক্ষার মধ্যেই স্বাধীনতার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ‘নিম’ একই সঙ্গে অনুপস্থিতির প্রতীক এবং উপস্থিতির অনুসন্ধান।

A century of loving silence - The Korea Times

শিরোনামের অনুবাদও তাই সহজ নয়

‘নিমুই চিনমুক’-এর ইংরেজি অনুবাদ করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যার জায়গা সম্ভবত প্রথম শব্দটি—‘নিম’। ইংরেজিতে এর সরাসরি কোনো সমার্থক শব্দ নেই। এমনকি আধুনিক কোরিয়ান ভাষাতেও মানহে যে বিস্তৃত অর্থে শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন, সেই ব্যবহার খুব সাধারণ নয়।

এই কারণে গ্রন্থটির শিরোনাম অনুবাদ করা শুধু ভাষান্তরের কাজ নয়; এটি মানহের দর্শন বোঝারও পরীক্ষা। ‘নিম’-কে কেবল প্রিয়জন হিসেবে অনুবাদ করলে তাঁর ধারণার ব্যাপ্তি হারিয়ে যায়। আবার নিছক দার্শনিক শব্দ ব্যবহার করলেও কবিতার আবেগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সম্প্রতি পুরো কাব্যগ্রন্থের অনুবাদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও এই সমস্যাটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। সেখানে ‘নিমুই চিনমুক’-এর সম্ভাব্য ইংরেজি রূপ হিসেবে ‘Your Silence’ ধরনের একটি ব্যাখ্যা উঠে এসেছে। নামটি প্রথমে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু মানহের কবিতায় অনুপস্থিতি, নীরবতা, আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসার যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তার আলোকে এটি একেবারে অমূলকও নয়।

মানহের কবিতার বিখ্যাত সূচনাও এই দ্বৈত অনুভূতিকে ধারণ করে। সেখানে ‘তুমি’ চলে গেছ—কিন্তু সেই চলে যাওয়া কেবল বিচ্ছেদ নয়। পাহাড়, বন, সরু পথ আর দ্বিধা পেরিয়ে চলে যাওয়া যেন একদিকে হারানোর অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে অনুসন্ধানের শুরু।

একশ বছর পরও কেন মানহে গুরুত্বপূর্ণ

একটি কবিতার শতবর্ষ পূর্তি সাধারণত সাহিত্যিক স্মরণানুষ্ঠানের বিষয়। কিন্তু মানহের ক্ষেত্রে তা আরও বড় অর্থ বহন করে। তাঁর জীবন দেখায়, সাহিত্য কখনো কেবল নান্দনিকতার জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি জাতি যখন নিজের পরিচয় হারানোর আশঙ্কায় থাকে, তখন কবিতা হয়ে উঠতে পারে আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের একটি ভাষা।

মানহে একই সঙ্গে ঐতিহ্যের ভেতরে দাঁড়িয়েছিলেন এবং নতুনের দিকে তাকিয়েছিলেন। তিনি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হয়েও প্রচলিত ধর্মীয় ধারণাকে প্রশ্ন করেছেন; কবি হয়েও কেবল প্রেমের ভাষায় থেমে থাকেননি; জাতীয়তাবাদী হয়েও তাঁর ‘নিম’-কে কোনো একক রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করেননি।

তাঁর কবিতার স্থায়িত্ব সম্ভবত এখানেই। একশ বছর পর ভাষা বদলেছে, সমাজ বদলেছে, কোরিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল পাল্টেছে। কিন্তু মানুষ যে এখনও হারানো কিছুর সন্ধান করে, ভালোবাসার অর্থ নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং স্বাধীনতার সঙ্গে আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক খুঁজে ফেরে—মানহের কবিতা সেই মানবিক সত্যকে স্পর্শ করে আছে।

তাই ‘নিমুই চিনমুক’-এর শতবর্ষ কেবল একটি পুরোনো কাব্যগ্রন্থের জন্মদিন নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, কিছু কবিতা সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না; বরং সময় বদলানোর সঙ্গে তাদের অর্থ নতুন করে উন্মোচিত হয়। মানহের নীরবতা সেই অর্থে নীরব নয়। এক শতাব্দী পরও তা পাঠককে ডেকে যায়—হারিয়ে যাওয়া মানুষ, স্বাধীনতা, ভালোবাসা এবং নিজের সত্যিকারের পরিচয়ের দিকে।