পরিবারের হলোকাস্ট ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে সাংবাদিক জুডিথ জিলভার্সমিট জড়িয়ে পড়লেন তথ্য, উত্তরাধিকার ও গল্প বলার অধিকার নিয়ে এক জটিল দ্বন্দ্বে
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে সাংবাদিক জুডিথ জিলভার্সমিট ২০২৩ সালের অক্টোবরে নিজের ইনস্টাগ্রাম দেখছিলেন। হঠাৎ অপরিচিত এক নারীর কাছ থেকে একটি বার্তা পেলেন। বার্তাটিতে বলা হয়েছিল, তাঁর পরিবারের অতীত সম্পর্কে ওই নারীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। আরও বিস্ময়কর বিষয়—নারীটি ছিলেন সেই ব্যক্তির নাতনি, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জিলভার্সমিটের পরিবারকে নাৎসিদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
জিলভার্সমিটের বাবা হান্স ছোটবেলায় নাৎসিদের হাতে ধরা পড়া থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন। ১৯৪০ সালে জার্মানি নেদারল্যান্ডস আক্রমণ করলে তাঁর পরিবার বেলজিয়ামে পালিয়ে যায়। ১৯৪৩ সালে সীমান্তবর্তী একটি শহরে আত্মগোপনে থাকার সময় কেউ তাদের বিশ্বাসঘাতকতা করে। গেস্টাপো তাদের লুকিয়ে থাকার জায়গায় হানা দেয়। পরিবারটি ছাদে উঠে সেখান থেকে নিচের উঠানে লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। হান্স, তখন মাত্র ১৪, এবং তাঁর বাবা-মা পালাতে সক্ষম হলেও তাঁর ১৯ বছর বয়সী বোন হেলগা ধরা পড়েন। পরে তাঁকে পাঠানো হয় আউশভিৎস-বিরকেনাউয়ে।
বহু বছর পর সেই বিশ্বাসঘাতকতার গল্প আবার সামনে আসে।
অপরিচিত নারীর পরিচয় ছিল ইনগেবর্গ বোলেন। তিনি বেলজিয়ামের বাসিন্দা এবং তাঁর দাদি মারিয়া-এলিজাবেথ স্ট্রাটারমান্স-কোয়েনেগ্রাখটস ছিলেন জিলভার্সমিট পরিবারের বিরুদ্ধে নাৎসিদের তথ্যদাতা। বোলেন তাঁর দাদির অপরাধের নথি বেলজিয়ামের একটি বিচারিক আর্কাইভ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। সেসব নথিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের সঙ্গে তাঁর দাদির সহযোগিতার বিবরণ ছিল।

জিলভার্সমিট প্রথমে বুঝতে পারছিলেন না, এই তথ্য নিয়ে তাঁর কী করা উচিত। তিনি ইতিমধ্যেই জানতেন যে তাঁর পরিবারের সদস্যরা হলোকাস্টের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু নতুন নথি তাঁকে এমন একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যার উত্তর সহজ নয়—পরিবারের ইতিহাসের আরও গভীরে যাওয়া কি প্রয়োজন? আর সেই ইতিহাস কে বলবে?
হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের দরজা খুলে যায়
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিচারিক নথি ও নাৎসি সহযোগীদের বিষয়ে সংরক্ষিত পুরোনো আর্কাইভ ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হচ্ছে। ফলে হলোকাস্টের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের উত্তরসূরিরা এমন সব তথ্যের মুখোমুখি হচ্ছেন, যা তাঁদের পরিবার বহু দশক ধরে চাপা দিয়ে রেখেছিল।
জিলভার্সমিটের ক্ষেত্রেও অতীতের অনুসন্ধান নতুন ক্ষত তৈরি করে। সাংবাদিক হিসেবে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, বোলেনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং পরিবারের ইতিহাস নিয়ে একটি পডকাস্ট করবেন। ডাচ সংবাদপত্র হেট পারোলের সঙ্গে কাজ করা পডকাস্ট নির্মাতা আনেট রোস্টও এতে যুক্ত হন। শেষ পর্যন্ত তৈরি হয় ছয় পর্বের পডকাস্ট—‘দ্য বিট্রেয়াল অব দ্য জিলভার্সমিট ফ্যামিলি’।
জিলভার্সমিট নিজের মায়ের ঘরের পুরোনো বাক্সপত্র ঘেঁটে গবেষণা শুরু করেন। সেখানে ছিল তাঁর দাদা ও বাবার নথি। তিনি আত্মীয়স্বজন, ইতিহাসবিদ ও অন্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও কথা বলেন।
এদিকে বোলেনের দাদি ও তাঁর স্বামী ল্যামবার্ট বেলজিয়ামের ভ্রোহোনেন শহরে একটি ক্যাফে চালাতেন। কিন্তু ওই নারী একই সঙ্গে জার্মান গেস্টাপোর প্রভাবশালী কর্মকর্তা রিশার্ড নিটশের হয়ে গোপন তথ্যদাতা হিসেবেও কাজ করতেন। তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের সদস্যদের ধরিয়ে দিয়েছিলেন এবং অন্তত একটি ইহুদি পরিবারকে নাৎসিদের হাতে তুলে দিতে ভূমিকা রেখেছিলেন—সেই পরিবারই ছিল জিলভার্সমিটদের।
যুদ্ধের পর স্ট্রাটারমান্স-কোয়েনগ্রাখটস বিচার ও দোষী সাব্যস্ত হন। তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও পরে ক্ষমা করা হয় এবং ১৯৫১ সালে তিনি মুক্তি পান।

একই ইতিহাস নিয়ে দুই গল্প
এই নথি নিয়ে আগ্রহী ছিলেন শুধু জিলভার্সমিট নন। ডাচ ইতিহাসবিদ মারি-সেসিল ভান হিনটুমও জিলভার্সমিট পরিবারের বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস নিয়ে একটি বই লেখার পরিকল্পনা করেছিলেন।
দুই নারীর কাজের ক্ষেত্র ধীরে ধীরে একই জায়গায় এসে পড়ে। ভান হিনটুম জিলভার্সমিটের পরিবারের পুরোনো বাক্সপত্র গবেষণার জন্য দেখতে পান। বাক্সগুলোর মধ্যে ছিল চিঠি, সংবাদপত্রের কাটিং, হলুদ ইহুদি তারকা, স্বস্তিকা চিহ্নযুক্ত নথি এবং লুট করা সম্পদের তালিকা।
জিলভার্সমিট ভেবেছিলেন, দুজন হয়তো পাশাপাশি কাজ করতে পারবেন। ইতিহাসবিদ বই লিখবেন, আর তিনি নিজের পরিবারের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প পডকাস্টে বলবেন।
কিন্তু খুব দ্রুতই সহযোগিতার জায়গায় তৈরি হয় বিরোধ।
জিলভার্সমিট জানতে চেয়েছিলেন, গবেষণার সময় ভান হিনটুম নতুন কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেলে তাঁকে জানাবেন কি না। ইতিহাসবিদ জানান, তাঁর নিজের বইয়ের কাজের জন্য তিনি একই সঙ্গে পডকাস্টের গবেষণায় সময় দিতে পারবেন না।
একপর্যায়ে জিলভার্সমিট ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, তিনি যখন নিজের পরিবারের এত তথ্য ও নথি ইতিহাসবিদের হাতে তুলে দিয়েছেন, তখন গবেষণায় পাওয়া তথ্য তাঁর সঙ্গে ভাগ না করা অস্বাভাবিক।
ভান হিনটুমের উত্তর ছিল—তথ্য তিনি ভাগ করবেন, তবে তাঁর বইয়ে।
এই কথোপকথনই দুই পক্ষের সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তোলে।

নথি কার, গল্পই বা কার?
জিলভার্সমিটের পডকাস্ট প্রকাশের পর বিরোধ আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। ভান হিনটুমের অভিযোগ, পডকাস্টে তাঁকে এমন একজন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যিনি সহযোগিতা করতে চান না এবং পরিবারের আর্কাইভ নিজের দখলে রাখতে চান।
অন্যদিকে জিলভার্সমিটের বক্তব্য, এটি তাঁর পরিবার ও তাঁর নিজের ইতিহাস। তিনি শুধু নিজের পরিবারের গল্প বলার অধিকার প্রয়োগ করতে চেয়েছেন।
বোলেনও শেষ পর্যন্ত নথি দেখানোর ক্ষেত্রে দ্বিধা করেন। তিনি জানিয়েছিলেন, ভান হিনটুমকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে বই প্রকাশের আগে জিলভার্সমিটকে বিচারিক নথিগুলো দেখতে দেবেন না।
এখানেও প্রশ্নটি একই—একটি পরিবারের ইতিহাসের নথি যদি অন্য একটি পরিবারের হাতে থাকে, তবে সেই ইতিহাস প্রকাশের অধিকার কার?
অতীত যখন বর্তমানের সঙ্গে সংঘর্ষে
জিলভার্সমিট পরে বেলজিয়ামে বোলেনের বাড়িতে যান। সেখানে বোলেন তাঁদের দুপুরের খাবার পরিবেশন করেন এবং পরে বাড়ির ওপরের তলায় একটি বইভরা লাইব্রেরিতে তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন।
কিন্তু নথি দেখানোর অনুরোধে তিনি রাজি হননি।
এরপর আরও অপ্রত্যাশিত একটি ঘটনা ঘটে। বোলেন তাঁদের বাড়ির চিলেকোঠায় নিয়ে গিয়ে কিছু ছবি দেখান। জিলভার্সমিট অবাক হয়ে দেখেন, ছবিগুলোর কয়েকটিতে তাঁর পরিবারের সদস্যদের দৃশ্য ফুটে উঠেছে। ছবিগুলো তৈরি করা হয়েছিল তাঁর ফুফু হেলগার লেখা স্মৃতিকথার কিছু অংশ অবলম্বনে।
হেলগা ২০০৬ সালে প্রকাশিত ‘থ্রু দ্য আই অব দ্য নিডল’ বইয়ে তাঁদের পরিবারের ওপর নেমে আসা নাৎসি নিপীড়নের বর্ণনা দিয়েছিলেন। সেখানে ছিল ছাদ থেকে তাঁর মায়ের লাফ দেওয়া, বৈদ্যুতিক খুঁটিতে আঘাত লাগা, তাঁর বাবার চিমনির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এবং হেলগার পড়ে গিয়ে আহত ও আটক হওয়ার বিবরণ। পরে তাঁকে আউশভিৎস-বিরকেনাউয়ে পাঠানো হয়।
জিলভার্সমিটের কাছে চিলেকোঠায় নিজের পরিবারের ছবি দেখতে পাওয়া ছিল অবাস্তব এক অভিজ্ঞতা।

পডকাস্টে নতুন করে আলোচনায় অতীত
জিলভার্সমিটের পডকাস্ট নভেম্বর মাসে প্রচার শুরু হয়। নেদারল্যান্ডসের ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের দেশে এটি পাঁচ লাখের বেশি শ্রোতা পায়, যা সেখানে বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
পডকাস্টে জিলভার্সমিট বলেন, তাঁর পরিবারের সঙ্গে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা শুরু হয়েছিল বোলেনের দাদির কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। কিন্তু তাঁর মনে হয়েছিল, পরিবারটি যেন আবারও অন্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এবার অতীতের নথি ও ইতিহাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।
তিনি বুঝতে পারছিলেন না, কেন ভান হিনটুম গবেষণার তথ্য তাঁর সঙ্গে ভাগ করতে চান না। আবার বোলেন কেন প্রথমে যোগাযোগ করে নথি দেখানোর প্রস্তাব দিয়েও পরে তা আটকে রাখলেন, সেটিও তাঁর কাছে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
একই ইতিহাসের মালিক কি একাধিকজন হতে পারেন?
এই বিরোধ শেষ পর্যন্ত একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে। একটি পরিবারের অতীত কি শুধু সেই পরিবারের সদস্যদের? নাকি সেই ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা একজন ইতিহাসবিদও তার নিজস্ব গবেষণার অধিকার দাবি করতে পারেন?
আমস্টারডামের ডে বালিতে আন্তঃপ্রজন্মীয় যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক ক্ষত ও লজ্জা নিয়ে একটি আলোচনায় জিলভার্সমিট ও ভান হিনটুমের বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। সেখানে বোলেনও দর্শকসারি থেকে উঠে জিলভার্সমিটের বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন।

বোলেন বলেন, পডকাস্টটি নাটকীয় ও আকর্ষণীয় হলেও কিছু জায়গায় তা আর বাস্তবতার নিরপেক্ষ উপস্থাপন নয়। তাঁর দাবি, জিলভার্সমিট যে ‘শত শত’ পারিবারিক ছবি দেখার কথা বলেছেন, আসলে সেগুলোর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০টি এবং সেগুলোও সরাসরি জিলভার্সমিট পরিবারের ছবি নয়; বরং হেলগার বইয়ের দৃশ্য অবলম্বনে আঁকা।
আলোচনার সঞ্চালক ইয়ানথে মোসেলমান তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন—প্রত্যেকের নিজের গল্প আছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়তো এগুলো কখনোই একক একটি গল্পে পরিণত হবে না।
জিলভার্সমিটও শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেন, হয়তো এই প্রজন্ম এখনও এমন আলোচনার জন্য প্রস্তুত নয়। হয়তো পরবর্তী প্রজন্ম সেই কথোপকথনকে অন্যভাবে দেখতে পারবে।
হলোকাস্টের ইতিহাস তাই শুধু অতীতের ঘটনা নয়। বহু দশক পরও তার নথি, স্মৃতি ও উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের সামনে একই প্রশ্ন ফিরিয়ে আনছে—ইতিহাসের মালিক কে, আর সেই ইতিহাস বলার অধিকারই বা কার?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















