১১:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
বিশ্বের কোনো দেশের সঙ্গেই চোখে চোখ রেখে কথা বলতে ভয় নেই: প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির শত বছরের ভয়াবহ এল নিনো, ভারতের কৃষিতে দুই মৌসুমে বড় ধাক্কার আশঙ্কা ‘দুই শতাধিক পেলেটের ক্ষত, চোখে স্থায়ী ক্ষতি’: রাহুল গান্ধীর পাশে থাকা শিক্ষার্থীর অভিযোগে এফআইআর চীনে রেকর্ড গাড়ি প্রত্যাহার: বৈদ্যুতিক দরজার হাতল নিয়ে কেন বাড়ছে উদ্বেগ স্টার্কের বিধ্বংসী বোলিংয়ে চার ওভারেই ৫ উইকেট, চাপে বাংলাদেশ ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি, গ্রাহাম না জিতলে ‘সবকিছু হারাবেন’ দক্ষিণ ক্যারোলিনার ভোটাররা চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দক্ষিণ কোরিয়া সফরে ‘বড় ধাক্কা’ সিউলের ইউক্রেনের ব্যস্ত বিপণিবিতানে রুশ ড্রোন হামলা, নিহত ১৬ হোয়াইট হাউসের বলরুম নির্মাণে আপাতত ট্রাম্পকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি সুপ্রিম কোর্টের তীব্র গরমেও ব্রিটেনে কমল খুচরা বিক্রি, বিশ্বকাপের উন্মাদনায় বাড়ল খাবার-পানীয়ের চাহিদা

হরমুজ প্রণালিতে ‘অদৃশ্য’ তেলবাহী জাহাজ, বাড়ছে ভয়াবহ তেলদূষণের ঝুঁকি

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তায় এমন এক ঝুঁকি তৈরি করেছে, যার প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ছাড়িয়ে পরিবেশেও পড়তে পারে। সামরিক হামলার আশঙ্কায় পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী আরও বেশি তেলবাহী জাহাজ এখন নিজেদের অবস্থান শনাক্তকারী ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দিচ্ছে। ফলে জাহাজগুলো রাডার ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার কাছে অনেকটাই ‘অদৃশ্য’ হয়ে যাচ্ছে।

যুদ্ধের সময় হামলা এড়াতে কোনো জাহাজের অবস্থান গোপন রাখার সিদ্ধান্ত হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তিসংগত মনে হতে পারে। কিন্তু হরমুজের মতো সংকীর্ণ, ব্যস্ত ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথে এর অর্থ হলো—একই সঙ্গে বাড়ছে সংঘর্ষ, অগ্নিকাণ্ড এবং বড় ধরনের তেলদূষণের ঝুঁকি।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আধুনিক নৌপরিবহনের যেসব প্রযুক্তি দুর্ঘটনা কমাতে তৈরি হয়েছিল, যুদ্ধের কারণে সেগুলোই এখন অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

‘অদৃশ্য’ জাহাজের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে

সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, ১ মার্চ থেকে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা জাহাজের ১ হাজার ৫১৪টি চলাচল শনাক্ত হয়েছে। প্রায় ৩০০টি জাহাজ এসব ‘ডার্ক ক্রসিং’-এর সঙ্গে যুক্ত।

এর বেশির ভাগ জাহাজই বিমাহীন অবস্থায় চলাচল করছে। এর মধ্যে ৫০টি জাহাজ ইরানের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির মালিকানাধীন। অন্যগুলোর মালিকানা বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস ও চীনের কোম্পানির উপস্থিতি বেশি।

Dark, oily streaks on a body of water along sandy banks. Small boats are moored near a concrete building, under a clear blue sky.

যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ১৩০টিরও বেশি জাহাজ চলাচল করত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে বিমান হামলা শুরুর পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ইরান হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী কয়েক ডজন তেলবাহী জাহাজের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর পর থেকেই জাহাজগুলোর ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখার প্রবণতা বেড়েছে।

সমস্যাটি শুধু জাহাজের অবস্থান জানা যাচ্ছে না—এমন নয়। আধুনিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরই এতে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

প্রযুক্তি বন্ধ হলে নিরাপত্তার দেয়ালও দুর্বল হয়

বড় বাণিজ্যিক জাহাজে অবস্থান, গতি ও গতিপথের তথ্য সম্প্রচারের ব্যবস্থা এখন আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের স্বাভাবিক অংশ। ২০০৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী প্রায় সব বড় আন্তর্জাতিক কার্গো ও যাত্রীবাহী জাহাজে এ ধরনের শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এর উদ্দেশ্য ছিল সহজ—একটি জাহাজ যেন অন্য জাহাজের গতিপথ বুঝতে পারে, উপকূলীয় কর্তৃপক্ষ যেন সামুদ্রিক চলাচল পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং সংঘর্ষের সম্ভাবনা কমানো যায়।

যুদ্ধ সেই ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করেছে।

জাহাজের ক্যাপ্টেনরা নিরাপত্তার প্রয়োজনে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করার আইনগত সুযোগ রাখেন। স্বাভাবিক সময়ে এ ধরনের সিদ্ধান্তে সাধারণত জাহাজের নিবন্ধনকারী দেশ এবং বিমা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বা সমন্বয় প্রয়োজন হয়। কিন্তু যুদ্ধের পরিস্থিতিতে ক্যাপ্টেনদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

A crude tanker with a brown lower half and black upper half under a bridge on open water.

ফলে তৈরি হচ্ছে একটি বিপজ্জনক বৈপরীত্য। হামলা এড়াতে কোনো জাহাজ নিজেকে আড়াল করছে, কিন্তু একই সঙ্গে অন্য জাহাজ ও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও তার অবস্থান গোপন হয়ে যাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির মতো সরু জলপথে, যেখানে একই জায়গায় বিপুলসংখ্যক জাহাজ চলাচল করে, এই অদৃশ্যতা সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আর তেলবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে একটি বড় সংঘর্ষ মানেই সম্ভাব্য পরিবেশগত বিপর্যয়।

সমুদ্রপৃষ্ঠেই দেখা যাচ্ছে বিপদের চিহ্ন

ইতিমধ্যে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরে অন্তত তিনটি তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা নজরে এসেছে।

এর একটি ইরানের কেশম দ্বীপের উপকূলে পৌঁছেছে। দ্বীপটির ম্যানগ্রোভ পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। ধারণা করা হচ্ছে, ৩ আগস্ট হরমুজ প্রণালিতে একটি কার্গো জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো প্রজেক্টাইল আঘাত হানার পর ওই তেল ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের পরিবেশ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বুধবার নাগাদ ছড়িয়ে পড়া তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল।

আরেকটি তেলের স্তর দেখা গেছে সিরি দ্বীপের কাছে। এটি উপসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস কেন্দ্র। তবে ওই তেলদূষণের উৎস এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ক্যারোলিন বেজেঙ্গি নামের একটি তেলবাহী জাহাজকে ঘিরে। জাহাজটিতে এশিয়ার উদ্দেশে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ছিল। জুনের শুরুতে রহস্যজনক বিস্ফোরণের পর ওমানের উপকূলের কাছে জাহাজটি আটকে যায়।

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা এই জাহাজটি রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রাশিয়ার তেল রপ্তানি চালিয়ে যেতে এ ধরনের জাহাজ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় ছড়িয়ে পড়া তেলের পরিমাণ এখন প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত। তেল ঢুকে পড়ছে একটি প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকায়, যেখানে রয়েছে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা হকসবিল ও সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপ, আরব সাগরের হাম্পব্যাক তিমি এবং সমৃদ্ধ প্রবালপ্রাচীর।

ওমানের মূল ভূখণ্ডের সৈকতেও তেল ভেসে উঠতে শুরু করেছে। এলাকাটি ‘টার্টল কোস্ট’ নামে পরিচিত।

Another oil tanker hit by drone boat as Strait of Hormuz tensions rise |  Euronews

কোনো একটি দুর্ঘটনার দায় নয়, কিন্তু ঝুঁকির যোগসূত্র স্পষ্ট

বর্তমানে সক্রিয় কোনো তেলদূষণের ঘটনাকেই সরাসরি ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে হামলা এড়ানো জাহাজের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। তাই একটি দুর্ঘটনার জন্য ‘ডার্ক’ জাহাজ চলাচলকে সরাসরি দায়ী করা ঠিক হবে না।

কিন্তু সামগ্রিক ঝুঁকির চিত্রটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

যখন কোনো জাহাজ নিজের অবস্থান জানানোর ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়, তখন সংঘর্ষ ঠেকানোর জন্য থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা স্তর অকার্যকর হয়ে যায়। যুদ্ধের কারণে যদি একই সময়ে শত শত জাহাজ এমন অবস্থায় চলাচল করে, তাহলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।

বিশেষ করে তেলবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বেঁচে থাকার কৌশল এবং নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত অনিরাপদ নৌপরিবহনের পদ্ধতি এক জায়গায় এসে মিলেছে। দুই ক্ষেত্রেই ফলাফল হতে পারে একই—জাহাজের গতিবিধি সম্পর্কে কম তথ্য এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কম সুযোগ।

হরমুজের ওপর নির্ভরতা সমস্যাকে আরও গভীর করছে

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা এখনো অনেক বেশি।

বিকল্প পাইপলাইন ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ তেলকে এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে যেতে হবে। ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, নিরাপদ নৌপরিবহনের জন্য তত বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক কারেন ই. ইয়ং-এর মতে, উপসাগরীয় তেল উৎপাদক দেশগুলো হরমুজ এড়িয়ে তেল পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত পাইপলাইন সক্ষমতা তৈরি না করা পর্যন্ত অনিরাপদ নৌচলাচল অব্যাহত থাকতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানিগুলো তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। কারণ তারা নিজেদের জাহাজের মালিক হতে পারে এবং এমন আর্থিক ঝুঁকি বহন করতে পারে, যা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানির জন্য কঠিন।

অর্থাৎ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এমন এক বাজার তৈরি করতে পারে, যেখানে বেশি ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতাই ব্যবসায়িক সুবিধায় পরিণত হবে।

Oil tanker traffic picks up through Hormuz | Reuters

যুদ্ধ শেষ হলেও পরিবেশগত ক্ষতি থেকে যাবে

পারস্য উপসাগরের পরিবেশ এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। অতিরিক্ত মাছ ধরা, লবণমুক্তকরণ প্রকল্প এবং জলবায়ু পরিবর্তন সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে দুর্বল করছে। এর মধ্যে বড় ধরনের তেলদূষণ নতুন ক্ষত তৈরি করতে পারে।

তেলের স্তর স্যাটেলাইটে আর দৃশ্যমান না থাকলেই বিপদ শেষ হয় না। তেল সৈকত, ম্যানগ্রোভ, প্রবালপ্রাচীর ও সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থলে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষতি করতে পারে। সামুদ্রিক প্রাণীর পাশাপাশি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

যুদ্ধের একটি সামরিক অভিযান কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের ঘটনা হতে পারে। কিন্তু একটি বড় তেলদূষণের পরিবেশগত প্রভাব বহু বছর ধরে টিকে থাকতে পারে।

এই কারণেই হরমুজের নিরাপত্তাকে শুধু সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে চলবে না। জাহাজকে হামলা থেকে রক্ষা করা এবং যে সমুদ্রপথ দিয়ে জাহাজগুলো চলাচল করে সেটিকে পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা—দুটিকে একই কৌশলের অংশ করতে হবে।

হরমুজে এখন সবচেয়ে প্রয়োজন দৃশ্যমানতা

বাণিজ্যিক জাহাজকে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার সামনে দাঁড় করিয়ে শুধু ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু রাখার দাবি বাস্তবসম্মত নয়। একজন ক্যাপ্টেনের প্রথম দায়িত্ব তার জাহাজ ও ক্রুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

কিন্তু একই সঙ্গে ‘ডার্ক’ জাহাজ চলাচলের দ্রুত বৃদ্ধি দেখিয়ে দিচ্ছে যে প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামো কতটা চাপে রয়েছে।

Iran demands compensation for Hormuz oil spill apparently caused by its own  attack | The Times of Israel

যতটা সম্ভব নিরাপদভাবে জাহাজের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য ভাগাভাগির নতুন ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি। ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখার প্রয়োজন হলে বিকল্প যোগাযোগ, সমন্বিত সতর্কবার্তা এবং নিরাপদ নৌপথ নির্ধারণের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদে উপসাগরীয় দেশগুলোকেও হরমুজের বাইরে তেল পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পর্যাপ্ত পাইপলাইন তৈরি হলে প্রণালিটির কৌশলগত গুরুত্ব পুরোপুরি শেষ হবে না, কিন্তু বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে সেখানে আটকে থাকা জাহাজের সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে।

বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—আধুনিক নৌপরিবহন নিরাপদ করতে যে প্রযুক্তি, নিয়মকানুন ও বিমা কাঠামো গড়ে উঠতে কয়েক দশক লেগেছে, যুদ্ধ তা খুব দ্রুত দুর্বল করে দিতে পারে।

জাহাজ যখন ট্র্যাকিং স্ক্রিন থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়, তখন শুধু তার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য হারায় না; দুর্ঘটনা ঠেকানোর নিরাপত্তার ব্যবধানও সংকুচিত হয়।

হরমুজ প্রণালি এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকটস্থল। সেখানে যদি ক্রমেই বেশি জাহাজ অদৃশ্য অবস্থায় চলাচল করে, তাহলে একটি ভূরাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আরও ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়।

লিসা ফ্রিডম্যানের বিশ্লেষণের মূল সতর্কবার্তা তাই স্পষ্ট: যুদ্ধের আগুন শুধু জাহাজকে লক্ষ্য করছে না, এর ছায়া পড়ছে সেই সমুদ্রের ওপরও, যার ওপর বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নির্ভরশীল।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্বের কোনো দেশের সঙ্গেই চোখে চোখ রেখে কথা বলতে ভয় নেই: প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির

হরমুজ প্রণালিতে ‘অদৃশ্য’ তেলবাহী জাহাজ, বাড়ছে ভয়াবহ তেলদূষণের ঝুঁকি

১০:৫৪:১৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তায় এমন এক ঝুঁকি তৈরি করেছে, যার প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ছাড়িয়ে পরিবেশেও পড়তে পারে। সামরিক হামলার আশঙ্কায় পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী আরও বেশি তেলবাহী জাহাজ এখন নিজেদের অবস্থান শনাক্তকারী ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দিচ্ছে। ফলে জাহাজগুলো রাডার ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার কাছে অনেকটাই ‘অদৃশ্য’ হয়ে যাচ্ছে।

যুদ্ধের সময় হামলা এড়াতে কোনো জাহাজের অবস্থান গোপন রাখার সিদ্ধান্ত হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তিসংগত মনে হতে পারে। কিন্তু হরমুজের মতো সংকীর্ণ, ব্যস্ত ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথে এর অর্থ হলো—একই সঙ্গে বাড়ছে সংঘর্ষ, অগ্নিকাণ্ড এবং বড় ধরনের তেলদূষণের ঝুঁকি।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আধুনিক নৌপরিবহনের যেসব প্রযুক্তি দুর্ঘটনা কমাতে তৈরি হয়েছিল, যুদ্ধের কারণে সেগুলোই এখন অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

‘অদৃশ্য’ জাহাজের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে

সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, ১ মার্চ থেকে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা জাহাজের ১ হাজার ৫১৪টি চলাচল শনাক্ত হয়েছে। প্রায় ৩০০টি জাহাজ এসব ‘ডার্ক ক্রসিং’-এর সঙ্গে যুক্ত।

এর বেশির ভাগ জাহাজই বিমাহীন অবস্থায় চলাচল করছে। এর মধ্যে ৫০টি জাহাজ ইরানের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির মালিকানাধীন। অন্যগুলোর মালিকানা বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস ও চীনের কোম্পানির উপস্থিতি বেশি।

Dark, oily streaks on a body of water along sandy banks. Small boats are moored near a concrete building, under a clear blue sky.

যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ১৩০টিরও বেশি জাহাজ চলাচল করত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে বিমান হামলা শুরুর পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ইরান হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী কয়েক ডজন তেলবাহী জাহাজের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর পর থেকেই জাহাজগুলোর ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখার প্রবণতা বেড়েছে।

সমস্যাটি শুধু জাহাজের অবস্থান জানা যাচ্ছে না—এমন নয়। আধুনিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরই এতে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

প্রযুক্তি বন্ধ হলে নিরাপত্তার দেয়ালও দুর্বল হয়

বড় বাণিজ্যিক জাহাজে অবস্থান, গতি ও গতিপথের তথ্য সম্প্রচারের ব্যবস্থা এখন আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের স্বাভাবিক অংশ। ২০০৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী প্রায় সব বড় আন্তর্জাতিক কার্গো ও যাত্রীবাহী জাহাজে এ ধরনের শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এর উদ্দেশ্য ছিল সহজ—একটি জাহাজ যেন অন্য জাহাজের গতিপথ বুঝতে পারে, উপকূলীয় কর্তৃপক্ষ যেন সামুদ্রিক চলাচল পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং সংঘর্ষের সম্ভাবনা কমানো যায়।

যুদ্ধ সেই ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করেছে।

জাহাজের ক্যাপ্টেনরা নিরাপত্তার প্রয়োজনে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করার আইনগত সুযোগ রাখেন। স্বাভাবিক সময়ে এ ধরনের সিদ্ধান্তে সাধারণত জাহাজের নিবন্ধনকারী দেশ এবং বিমা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বা সমন্বয় প্রয়োজন হয়। কিন্তু যুদ্ধের পরিস্থিতিতে ক্যাপ্টেনদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

A crude tanker with a brown lower half and black upper half under a bridge on open water.

ফলে তৈরি হচ্ছে একটি বিপজ্জনক বৈপরীত্য। হামলা এড়াতে কোনো জাহাজ নিজেকে আড়াল করছে, কিন্তু একই সঙ্গে অন্য জাহাজ ও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও তার অবস্থান গোপন হয়ে যাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির মতো সরু জলপথে, যেখানে একই জায়গায় বিপুলসংখ্যক জাহাজ চলাচল করে, এই অদৃশ্যতা সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আর তেলবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে একটি বড় সংঘর্ষ মানেই সম্ভাব্য পরিবেশগত বিপর্যয়।

সমুদ্রপৃষ্ঠেই দেখা যাচ্ছে বিপদের চিহ্ন

ইতিমধ্যে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরে অন্তত তিনটি তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা নজরে এসেছে।

এর একটি ইরানের কেশম দ্বীপের উপকূলে পৌঁছেছে। দ্বীপটির ম্যানগ্রোভ পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। ধারণা করা হচ্ছে, ৩ আগস্ট হরমুজ প্রণালিতে একটি কার্গো জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো প্রজেক্টাইল আঘাত হানার পর ওই তেল ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের পরিবেশ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বুধবার নাগাদ ছড়িয়ে পড়া তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল।

আরেকটি তেলের স্তর দেখা গেছে সিরি দ্বীপের কাছে। এটি উপসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস কেন্দ্র। তবে ওই তেলদূষণের উৎস এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ক্যারোলিন বেজেঙ্গি নামের একটি তেলবাহী জাহাজকে ঘিরে। জাহাজটিতে এশিয়ার উদ্দেশে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ছিল। জুনের শুরুতে রহস্যজনক বিস্ফোরণের পর ওমানের উপকূলের কাছে জাহাজটি আটকে যায়।

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা এই জাহাজটি রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রাশিয়ার তেল রপ্তানি চালিয়ে যেতে এ ধরনের জাহাজ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় ছড়িয়ে পড়া তেলের পরিমাণ এখন প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত। তেল ঢুকে পড়ছে একটি প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকায়, যেখানে রয়েছে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা হকসবিল ও সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপ, আরব সাগরের হাম্পব্যাক তিমি এবং সমৃদ্ধ প্রবালপ্রাচীর।

ওমানের মূল ভূখণ্ডের সৈকতেও তেল ভেসে উঠতে শুরু করেছে। এলাকাটি ‘টার্টল কোস্ট’ নামে পরিচিত।

Another oil tanker hit by drone boat as Strait of Hormuz tensions rise |  Euronews

কোনো একটি দুর্ঘটনার দায় নয়, কিন্তু ঝুঁকির যোগসূত্র স্পষ্ট

বর্তমানে সক্রিয় কোনো তেলদূষণের ঘটনাকেই সরাসরি ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে হামলা এড়ানো জাহাজের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। তাই একটি দুর্ঘটনার জন্য ‘ডার্ক’ জাহাজ চলাচলকে সরাসরি দায়ী করা ঠিক হবে না।

কিন্তু সামগ্রিক ঝুঁকির চিত্রটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

যখন কোনো জাহাজ নিজের অবস্থান জানানোর ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়, তখন সংঘর্ষ ঠেকানোর জন্য থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা স্তর অকার্যকর হয়ে যায়। যুদ্ধের কারণে যদি একই সময়ে শত শত জাহাজ এমন অবস্থায় চলাচল করে, তাহলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।

বিশেষ করে তেলবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বেঁচে থাকার কৌশল এবং নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত অনিরাপদ নৌপরিবহনের পদ্ধতি এক জায়গায় এসে মিলেছে। দুই ক্ষেত্রেই ফলাফল হতে পারে একই—জাহাজের গতিবিধি সম্পর্কে কম তথ্য এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কম সুযোগ।

হরমুজের ওপর নির্ভরতা সমস্যাকে আরও গভীর করছে

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা এখনো অনেক বেশি।

বিকল্প পাইপলাইন ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ তেলকে এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে যেতে হবে। ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, নিরাপদ নৌপরিবহনের জন্য তত বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক কারেন ই. ইয়ং-এর মতে, উপসাগরীয় তেল উৎপাদক দেশগুলো হরমুজ এড়িয়ে তেল পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত পাইপলাইন সক্ষমতা তৈরি না করা পর্যন্ত অনিরাপদ নৌচলাচল অব্যাহত থাকতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানিগুলো তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। কারণ তারা নিজেদের জাহাজের মালিক হতে পারে এবং এমন আর্থিক ঝুঁকি বহন করতে পারে, যা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানির জন্য কঠিন।

অর্থাৎ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এমন এক বাজার তৈরি করতে পারে, যেখানে বেশি ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতাই ব্যবসায়িক সুবিধায় পরিণত হবে।

Oil tanker traffic picks up through Hormuz | Reuters

যুদ্ধ শেষ হলেও পরিবেশগত ক্ষতি থেকে যাবে

পারস্য উপসাগরের পরিবেশ এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। অতিরিক্ত মাছ ধরা, লবণমুক্তকরণ প্রকল্প এবং জলবায়ু পরিবর্তন সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে দুর্বল করছে। এর মধ্যে বড় ধরনের তেলদূষণ নতুন ক্ষত তৈরি করতে পারে।

তেলের স্তর স্যাটেলাইটে আর দৃশ্যমান না থাকলেই বিপদ শেষ হয় না। তেল সৈকত, ম্যানগ্রোভ, প্রবালপ্রাচীর ও সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থলে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষতি করতে পারে। সামুদ্রিক প্রাণীর পাশাপাশি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

যুদ্ধের একটি সামরিক অভিযান কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের ঘটনা হতে পারে। কিন্তু একটি বড় তেলদূষণের পরিবেশগত প্রভাব বহু বছর ধরে টিকে থাকতে পারে।

এই কারণেই হরমুজের নিরাপত্তাকে শুধু সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে চলবে না। জাহাজকে হামলা থেকে রক্ষা করা এবং যে সমুদ্রপথ দিয়ে জাহাজগুলো চলাচল করে সেটিকে পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা—দুটিকে একই কৌশলের অংশ করতে হবে।

হরমুজে এখন সবচেয়ে প্রয়োজন দৃশ্যমানতা

বাণিজ্যিক জাহাজকে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার সামনে দাঁড় করিয়ে শুধু ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু রাখার দাবি বাস্তবসম্মত নয়। একজন ক্যাপ্টেনের প্রথম দায়িত্ব তার জাহাজ ও ক্রুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

কিন্তু একই সঙ্গে ‘ডার্ক’ জাহাজ চলাচলের দ্রুত বৃদ্ধি দেখিয়ে দিচ্ছে যে প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামো কতটা চাপে রয়েছে।

Iran demands compensation for Hormuz oil spill apparently caused by its own  attack | The Times of Israel

যতটা সম্ভব নিরাপদভাবে জাহাজের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য ভাগাভাগির নতুন ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি। ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখার প্রয়োজন হলে বিকল্প যোগাযোগ, সমন্বিত সতর্কবার্তা এবং নিরাপদ নৌপথ নির্ধারণের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদে উপসাগরীয় দেশগুলোকেও হরমুজের বাইরে তেল পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পর্যাপ্ত পাইপলাইন তৈরি হলে প্রণালিটির কৌশলগত গুরুত্ব পুরোপুরি শেষ হবে না, কিন্তু বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে সেখানে আটকে থাকা জাহাজের সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে।

বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—আধুনিক নৌপরিবহন নিরাপদ করতে যে প্রযুক্তি, নিয়মকানুন ও বিমা কাঠামো গড়ে উঠতে কয়েক দশক লেগেছে, যুদ্ধ তা খুব দ্রুত দুর্বল করে দিতে পারে।

জাহাজ যখন ট্র্যাকিং স্ক্রিন থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়, তখন শুধু তার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য হারায় না; দুর্ঘটনা ঠেকানোর নিরাপত্তার ব্যবধানও সংকুচিত হয়।

হরমুজ প্রণালি এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকটস্থল। সেখানে যদি ক্রমেই বেশি জাহাজ অদৃশ্য অবস্থায় চলাচল করে, তাহলে একটি ভূরাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আরও ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়।

লিসা ফ্রিডম্যানের বিশ্লেষণের মূল সতর্কবার্তা তাই স্পষ্ট: যুদ্ধের আগুন শুধু জাহাজকে লক্ষ্য করছে না, এর ছায়া পড়ছে সেই সমুদ্রের ওপরও, যার ওপর বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নির্ভরশীল।