চীনে গাড়ির বৈদ্যুতিক দরজার হাতল নিয়ে বড় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ কারণে টেসলাসহ নয়টি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রায় ৪৩ লাখ গাড়ি বাজার থেকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে গাড়ির দরজা খুলতে জটিলতা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কেন আলোচনায় বৈদ্যুতিক দরজার হাতল
গত এক দশকে বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়িতে শরীরের সঙ্গে সমতল অবস্থায় থাকা আধুনিক দরজার হাতলের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। গাড়ির নকশাকে আরও মসৃণ ও আকর্ষণীয় করার পাশাপাশি বাতাসের বাধা কমানোর জন্য এসব হাতল তৈরি করা হয়।
সাধারণত গাড়ির মালিক কাছে এলে হাতল নিজে থেকেই বাইরে বেরিয়ে আসে। দেখতে আধুনিক হলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে এসব হাতল নিয়ে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
জরুরি সময়ে বিপদের আশঙ্কা
প্রচলিত দরজার হাতলের পরিবর্তে অনেক আধুনিক গাড়িতে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। গাড়ির বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অচল হয়ে গেলে দরজা খোলার জন্য স্পষ্ট ও সহজে ব্যবহারযোগ্য যান্ত্রিক ব্যবস্থা না থাকলে চালক ও যাত্রীরা গাড়ির ভেতরে আটকে পড়তে পারেন।
বিশেষ করে গাড়িতে আগুন লাগা বা ভয়াবহ দুর্ঘটনার মতো পরিস্থিতিতে কয়েক সেকেন্ডের বিলম্বও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। কিছু নির্মাতা ভেতর থেকে দরজা খোলার জন্য বিকল্প যান্ত্রিক ব্যবস্থা রাখলেও সেটি অনেক সময় সহজে চোখে পড়ে না।
মালিকদের অভিজ্ঞতাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
উচ্চ প্রযুক্তির এসব হাতল নিয়ে গাড়ির মালিকদের মধ্যেও বিভ্রান্তির অভিযোগ রয়েছে। নতুন নকশার কারণে জরুরি মুহূর্তে কীভাবে দরজা খুলতে হবে, তা অনেক চালক ও যাত্রী তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারেন না।
গাড়ির ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন পর্যালোচনাতেও আধুনিক দরজার হাতলকে সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়িগুলোর মধ্যে এ ধরনের অভিযোগ তুলনামূলক বেশি।
কিছু মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, দুর্ঘটনার পর গাড়িতে আটকে পড়ে চালক বা যাত্রীরা আহত কিংবা নিহত হয়েছেন। আবার কিছু গাড়ির মালিক অভিযোগ করেছেন, গাড়ি থেকে বের হওয়ার পরও ভেতরে থাকা সন্তানকে দ্রুত বের করতে পারেননি।
কোন কোন গাড়ি প্রত্যাহার হচ্ছে

টেসলার পাশাপাশি শাওমি, লিপমোটর, এক্সপেং ও জিলিসহ বেশ কয়েকটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চীনে গাড়ি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো জরুরি অবস্থায় দরজা খোলার সমস্যা কমাতে সফটওয়্যার হালনাগাদের ব্যবস্থাও নিয়েছে।
তবে বিশ্বজুড়ে ঠিক কতগুলো গাড়িতে এই ধরনের বৈদ্যুতিক হাতল ব্যবহার করা হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এখনো জানা যায়নি। গত কয়েক বছরে নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ির বহু মডেলে এই নকশা ছড়িয়ে পড়েছে।
২০২৭ সাল থেকে চীনে নতুন নিয়ম
নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে চীন এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০২৭ সাল থেকে গাড়িতে পুরোপুরি লুকানো ধরনের দরজার হাতল নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি। এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রথম দেশ হিসেবে চীন সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের দরজার হাতলের ক্ষেত্রে জরুরি অবস্থায় কাজ করবে এমন নির্ভরযোগ্য যান্ত্রিক বিকল্প রাখার বিষয়ে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ রয়েছে।
মার্কিন গাড়ি নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, শুধু একটি নির্দিষ্ট গাড়ি নির্মাতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে সব নির্মাতার জন্য নতুন নিরাপত্তা মানদণ্ড তৈরি করার মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করা যেতে পারে।

ইউরোপেও নজরদারি বাড়ছে
ইউরোপের নিয়ন্ত্রকেরাও গত বছর বৈদ্যুতিক দরজার হাতলের সম্ভাব্য ঝুঁকিকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন মানদণ্ড তৈরির কাজ চলছে, যাতে গাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও ভেতর ও বাইরে থেকে দরজা খোলার সুযোগ থাকে।
তবে চীনে গাড়ি প্রত্যাহার করা হয়েছে বলেই যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা বিধি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো ভিন্ন হওয়ায় প্রতিটি বাজারে সিদ্ধান্ত আলাদা হতে পারে।
আধুনিক গাড়ির নকশায় সৌন্দর্য ও বায়ুগত সুবিধা বাড়াতে বৈদ্যুতিক দরজার হাতল জনপ্রিয় হলেও চীনের এই রেকর্ডসংখ্যক গাড়ি প্রত্যাহার দেখিয়ে দিয়েছে, জরুরি পরিস্থিতিতে প্রযুক্তির চেয়ে সহজ ও নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















