শত বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোর আশঙ্কায় ভারতের কৃষি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বেড়ে যাওয়ার পূর্বাভাসের মধ্যে ভারতের চলতি রবি মৌসুমের ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের তীব্র তাপপ্রবাহ ও বর্ষার অনিশ্চয়তা কৃষিতে আরও চাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। এ পরিস্থিতিতে প্রভাব শুধু চলতি মৌসুমেই সীমাবদ্ধ না থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে।
ভারতের কৃষিতে এল নিনোর দ্বিমুখী আঘাত
যুক্তরাজ্যের মেট অফিস জানিয়েছে, এবারের এল নিনো আধুনিক জলবায়ু রেকর্ডে সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়তে পারে। বিভিন্ন পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী, নভেম্বর নাগাদ তাপমাত্রার বিচ্যুতি ৩ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
এর প্রভাব ভারতের কৃষিতে ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মেট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাবে ভারতে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর পুরো মৌসুমে দীর্ঘমেয়াদি গড়ের ৯০ শতাংশ বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে, যা ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
রবি ফসলে বাড়ছে উদ্বেগ
![]()
মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক রঘু মুর্তুগুড্ডে বলেছেন, এল নিনোর প্রভাব চলতি বছরের রবি মৌসুমের ফসল উৎপাদনেও পড়তে পারে। কৃষিতে এর প্রভাব শুধু বর্তমান মৌসুমে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; ২০২৭ সালেও পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে বর্ষার ওপর।
তিনি জানান, ২০২৭ সালের বসন্তে তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিলে কৃষিতে নতুন করে ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হবে। এর ফলে ফসল উৎপাদনের ওপর ধারাবাহিক চাপ তৈরি হতে পারে।
চলতি পরিস্থিতিতে ভারত সরকার ইতোমধ্যে কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। ভোজ্যতেল ও চিনি নিয়ে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপও কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেছেন মুর্তুগুড্ডে।
২০২৭ সালে বিশ্ব উষ্ণতার নতুন রেকর্ড
এল নিনো শুধু ভারতের কৃষি ও বর্ষাকেই প্রভাবিত করে না; এটি বৈশ্বিক তাপমাত্রাও বাড়িয়ে দেয়। সাধারণত এই জলবায়ু প্রবণতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব দেখা যায় এর পরের বছরে। সে কারণে ২০২৬ সালের তুলনায় ২০২৭ সালেই বৈশ্বিক উষ্ণতার নতুন রেকর্ড হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
মেট অফিসের বিজ্ঞানী নিক ডানস্টোন বলেছেন, ২০২৭ সাল ২০২৪ সালকে ছাড়িয়ে বিশ্বের উষ্ণতম বছর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ছিল।
ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিজ্ঞানী ওপি শ্রীজিতও মনে করছেন, ২০২৭ সালে বৈশ্বিক উষ্ণতার রেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ভারতের তাপমাত্রা নতুন রেকর্ডে পৌঁছাবে কি না, তা নির্ভর করবে ২০২৭ সালের বর্ষা এবং বর্ষা-পরবর্তী এল নিনো পরিস্থিতির ওপর।
বর্ষার ওপর নির্ভর করছে কৃষির ভবিষ্যৎ
এল নিনো হলো মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রবণতা। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসে। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এ ঘটনা ঘটে এবং এর প্রভাব ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হতে পারে।
ভারতের জন্য এবারের এল নিনো তাই শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তনের বিষয় নয়। চলতি রবি মৌসুমের ফসল থেকে শুরু করে ২০২৭ সালের বর্ষা ও তাপপ্রবাহ—সব মিলিয়ে দেশটির কৃষি উৎপাদনের ওপর দুই মৌসুমজুড়ে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















