০৩:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
১০ মিলিয়ন বছর আগে ২৩ ফুটের ‘দানব কুমির’ শাসন করত দৈত্যদের জলাভূমি ভ্যান্সের তোপের মুখে এল-সায়েদ, ‘এটা আমার দাদার ডেমোক্রেটিক পার্টি নয়’ ২২ ক্যারেট সোনার ভরি ২ লাখ ৪৬ হাজার ১১০ টাকা, আবারও দাম বাড়াল বাজুস নাটোর-রাজশাহী মহাসড়কে বাসের ধাক্কায় মানবহলার দুমড়েমুচড়ে, নিহত ২ টিকটকের খাবারের ভিডিওতেই বদলে যাচ্ছে কিশোরদের খাওয়ার অভ্যাস মেগানের অভিনয়ে ফেরার জল্পনা, নেটফ্লিক্সের ‘দ্য জেন্টলমেন’-এ বড় চরিত্রে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রে পকেটে টান, তবু শখের কেনাকাটায় নেই লাগাম—বদলে যাচ্ছে ক্রেতাদের খরচের ধরন বৈদ্যুতিক দরজার হাতল নিয়ে বড় বিপদ, চীনে ৪৩ লাখ গাড়ি প্রত্যাহার উৎসবের আগে চিনির দাম সামলাতে আমদানির পথে ভারত যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্যচুক্তি ভেস্তে গেল, ট্রাম্পের নতুন শুল্ক কার্যকর

শিনজিয়াংয়ে কথার চেয়েও জোরালো ভাষা নাচ, গান আর মানুষের আন্তরিকতা

চীনের শিনজিয়াং ভ্রমণে গিয়ে দুই বিদেশি পর্যটকের চোখে ধরা পড়েছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। পাহাড়, মরুভূমি কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা, লোকনৃত্য, খাবার, কারুশিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাদের ভ্রমণকে করে তুলেছে গভীরভাবে স্মরণীয়।

কানাডীয় নাগরিক ও স্লোভাক বংশোদ্ভূত ভ্রমণস্রষ্টা জে কেরেকেস এবং যুক্তরাজ্যের ভ্রমণস্রষ্টা ইয়ান ইংলিস তাঁদের অভিজ্ঞতায় শিনজিয়াংকে তুলে ধরেছেন এমন এক অঞ্চল হিসেবে, যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিক জীবন পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে।

নাচের বৃত্তে টেনে নেয় মানুষ

কেরেকেসের কাছে শিনজিয়াংয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয় হলো নাচ। তাঁর ভাষায়, শিনজিয়াং এমন এক নাচ, যেখানে নাচের ধাপ শেখার আগেই আপনাকে বৃত্তের মধ্যে টেনে নেওয়া হয়।

শিনজিয়াংয়ের রাজধানী উরুমচিতে একটি পার্কে হাঁটার সময় এক তরুণ তাঁকে স্থানীয় লোকনৃত্যে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। ভাষার চেয়ে চোখের ইশারা, হাতের ভঙ্গি আর সংগীতের ছন্দই ছিল সেই আমন্ত্রণের মাধ্যম। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি নাচের অংশ হয়ে যান।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে শিনজিয়াং ভ্রমণের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিস্ময় এবং আনন্দ যেন প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।

Tourism to Xinjiang booms as China gives the region a makeover

শিশুদের সরলতায় অন্য এক শিনজিয়াং

হেতিয়ান অঞ্চলের মোয়ু জেলায় গিয়ে স্থানীয় শিশুদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছেন কেরেকেস। শিশুরা জানতে চেয়েছে তিনি কোথা থেকে এসেছেন, তাঁকে কয়েকটি উইঘুর শব্দ শিখিয়েছে এবং ফুটবল খেলায় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

বিদায়ের সময় শিশুদের মন খারাপ হয়ে যায়। এমনকি এক লাজুক শিশুও সাহস করে চীনা ভাষায় তাঁর সঙ্গে হাত মেলাতে চায়। পরে সে নিজের ভাইয়ের হাতও মেলানোর অনুরোধ করে, কারণ ভাইটি লজ্জায় সামনে আসতে পারছিল না।

কেরেকেসের কাছে এই ছোট্ট ঘটনাটিই ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মনে হয়েছে, শিনজিয়াংয়ের সৌন্দর্য শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্যে নয়, এখানকার মানুষের মধ্যেও গভীরভাবে উপস্থিত।

স্থিতিশীলতার মধ্যে স্বাভাবিক জীবন

ভ্রমণস্রষ্টাদের চোখে শিনজিয়াংয়ে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বও স্পষ্ট। তবে তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এসব ব্যবস্থার দৈনন্দিন ফলাফল।

পার্কে মানুষ নাচছে, শিশুরা খেলছে, পরিবারগুলো একসঙ্গে খাবার খাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবে জনসমাগমস্থলে চলাফেরা করছে—এই দৃশ্যগুলো তাঁদের কাছে স্থিতিশীলতার বাস্তব প্রতিফলন।

কেরেকেসের অভিজ্ঞতায়, স্থিতিশীলতা শুধু কোনো নীতিগত শব্দ নয়; এটি এমন একটি পরিবেশ, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

পাহাড়, নাচ আর খাবারের টানে মুগ্ধতা

শিনজিয়াংয়ের তিনটি বিষয় তাঁকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিয়েছে—প্রকৃতি, নাচ এবং খাবার।

কুনলুন পর্বতমালার বিশাল ও খোলা প্রাকৃতিক দৃশ্য তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তুষারঢাকা উঁচু পর্বত, হিমবাহ ও দুর্গম ভূপ্রকৃতি তাঁর কাছে স্বাধীনতার অনুভূতি তৈরি করেছে।

এরপর রয়েছে নাচ। জনসমক্ষে মানুষকে এত স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাচতে দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। কোথাও গেলেই ছন্দের সঙ্গে মানুষকে নড়াচড়া করতে দেখেছেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজেও তাতে যোগ দিয়েছেন।

আর খাবারের মধ্যে ঝাল পদ ও ভেড়ার মাংসের শিকে কাবাব তাঁর বিশেষ পছন্দ হয়েছে। খাবারকে ঘিরে সাধারণ আড্ডাও কখনো কখনো ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে আনন্দময় বিনিময়ে পরিণত হয়েছে।

ঐতিহ্য শুধু প্রদর্শনের জন্য নয়

যুক্তরাজ্যের ভ্রমণস্রষ্টা ইয়ান ইংলিসের কাছে শিনজিয়াংয়ের সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতার একটি ছিল হেতিয়ানের স্থানীয় বেকারি।

দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় তিনি পেছন থেকে একটি ছন্দময় ডাক শুনতে পান। কৌতূহলী হয়ে বাইরে গিয়ে দেখেন, কর্মীরা চুলা থেকে গরম বেক করা রুটি বের করে বড় ঝুড়িতে রাখছেন এবং বিশেষ ধরনের ডাক দিতে দিতে সেগুলো জানালার পাশে নিয়ে যাচ্ছেন।

ছোট্ট এই দৃশ্যই তাঁর কাছে শিনজিয়াংয়ের জীবন্ত সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। তাঁর উপলব্ধি, একটি অঞ্চলকে শুধু পাহাড় বা স্থাপনা দিয়ে বোঝা যায় না। স্থানীয় বিক্রেতার ডাক, খাবারের স্বাদ, কারিগরের হাতের কাজ এবং সংগীত-নৃত্যের মধ্যেও একটি অঞ্চলের আত্মপরিচয় বেঁচে থাকে।

কারুশিল্পে জীবিকা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন

Kuqa Grand Canyon: Geological Wonder | FoyoChinaTrip

হেতিয়ানের একটি কার্পেট কারখানায় গিয়ে ইংলিস দেখেছেন স্থানীয় নারীরা বয়নশিল্পের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করছেন। এই কাজ তাঁদের জন্য শুধু আয়-রোজগারের পথ নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্য ধরে রাখারও মাধ্যম।

তিনি নিজেও কার্পেট বোনার চেষ্টা করেন। প্রায় ১০ মিনিটে মাত্র চারটি গিঁট দিতে পেরেছিলেন। দক্ষ কারিগরদের তুলনায় নিজের কাজকে খুব সামান্য মনে হলেও এই অভিজ্ঞতা তাঁকে উপলব্ধি করিয়েছে, একটি কার্পেট আসলে কেবল একটি পণ্য নয়।

এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ধৈর্য, শ্রম, স্মৃতি, দক্ষতা ও পরিচয়ের দীর্ঘ ইতিহাস।

আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের সহাবস্থান

ইংলিসের মতে, আধুনিকায়ন মানেই যদি পুরোনো ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলা হয়, তবে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। শিনজিয়াংয়ে তিনি এমন একটি চিত্র দেখেছেন, যেখানে অবকাঠামো ও আধুনিক জীবনযাত্রার পাশাপাশি স্থানীয় সংগীত, নৃত্য, বয়নশিল্প ও অন্যান্য ঐতিহ্যও টিকে আছে।

তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ। ঐতিহ্য কোনো জাদুঘরে বন্দি থাকলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মানুষ যখন নিজের জীবনে তা ব্যবহার করে, শিশুদের শেখায় এবং নিজের সংস্কৃতি নিয়ে গর্ববোধ করে, তখনই সেই ঐতিহ্য সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকে।

মানুষের মধ্যেই ভ্রমণের সবচেয়ে বড় স্মৃতি

Xinjiang Diary, Day 3: Changji, where some fields tend themselves Over the  next several days, I'll be traveling across northwest China's #Xinjiang  Uygur Autonomous Region as part of People's Daily Online's "China

দুই ভ্রমণস্রষ্টার অভিজ্ঞতায় শিনজিয়াং একটি একক গল্প নয়। এখানে রয়েছে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, নানা ঐতিহ্য, বিস্তৃত প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং অসংখ্য মানুষের জীবন ও শ্রম।

কেরেকেসের কাছে শিনজিয়াং এমন একটি জায়গা, যেখানে একজন বিদেশিও অল্প সময়ের মধ্যে নিজেকে বাইরের মানুষ বলে মনে না করে স্থানীয় আনন্দের অংশ হয়ে উঠতে পারেন।

আর ইংলিসের কাছে স্থানীয় বেকারির কর্মীর সেই ছন্দময় ডাক যেন অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে একটি সেতু। তাঁর উপলব্ধি, শিনজিয়াংয়ের অতীত হারিয়ে যায়নি; বরং ঐতিহ্য, জীবিকা ও আধুনিক জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে তা নতুন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে।

শিনজিয়াং তাই তাঁদের চোখে শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়। এটি মানুষের হাসি, শিশুদের কৌতূহল, নাচের ছন্দ, খাবারের স্বাদ এবং কারিগরের হাতে বোনা স্মৃতির এক জীবন্ত সমাহার।

শিনজিয়াংয়ের এই অভিজ্ঞতা তাঁদের দুজনের কাছেই একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—কখনো কখনো কোনো জায়গাকে বোঝার জন্য দীর্ঘ বক্তৃতার প্রয়োজন হয় না। একটি নাচের আহ্বান, একটি শিশুর বাড়িয়ে দেওয়া হাত কিংবা একজন বিক্রেতার প্রাণবন্ত ডাকই অনেক কথা বলে দিতে পারে।

শিনজিয়াংয়ে সেই ভাষাই যেন সবচেয়ে বেশি শোনা যায়।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

১০ মিলিয়ন বছর আগে ২৩ ফুটের ‘দানব কুমির’ শাসন করত দৈত্যদের জলাভূমি

শিনজিয়াংয়ে কথার চেয়েও জোরালো ভাষা নাচ, গান আর মানুষের আন্তরিকতা

০২:১৫:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

চীনের শিনজিয়াং ভ্রমণে গিয়ে দুই বিদেশি পর্যটকের চোখে ধরা পড়েছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। পাহাড়, মরুভূমি কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা, লোকনৃত্য, খাবার, কারুশিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাদের ভ্রমণকে করে তুলেছে গভীরভাবে স্মরণীয়।

কানাডীয় নাগরিক ও স্লোভাক বংশোদ্ভূত ভ্রমণস্রষ্টা জে কেরেকেস এবং যুক্তরাজ্যের ভ্রমণস্রষ্টা ইয়ান ইংলিস তাঁদের অভিজ্ঞতায় শিনজিয়াংকে তুলে ধরেছেন এমন এক অঞ্চল হিসেবে, যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিক জীবন পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে।

নাচের বৃত্তে টেনে নেয় মানুষ

কেরেকেসের কাছে শিনজিয়াংয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয় হলো নাচ। তাঁর ভাষায়, শিনজিয়াং এমন এক নাচ, যেখানে নাচের ধাপ শেখার আগেই আপনাকে বৃত্তের মধ্যে টেনে নেওয়া হয়।

শিনজিয়াংয়ের রাজধানী উরুমচিতে একটি পার্কে হাঁটার সময় এক তরুণ তাঁকে স্থানীয় লোকনৃত্যে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। ভাষার চেয়ে চোখের ইশারা, হাতের ভঙ্গি আর সংগীতের ছন্দই ছিল সেই আমন্ত্রণের মাধ্যম। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি নাচের অংশ হয়ে যান।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে শিনজিয়াং ভ্রমণের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিস্ময় এবং আনন্দ যেন প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।

Tourism to Xinjiang booms as China gives the region a makeover

শিশুদের সরলতায় অন্য এক শিনজিয়াং

হেতিয়ান অঞ্চলের মোয়ু জেলায় গিয়ে স্থানীয় শিশুদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছেন কেরেকেস। শিশুরা জানতে চেয়েছে তিনি কোথা থেকে এসেছেন, তাঁকে কয়েকটি উইঘুর শব্দ শিখিয়েছে এবং ফুটবল খেলায় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

বিদায়ের সময় শিশুদের মন খারাপ হয়ে যায়। এমনকি এক লাজুক শিশুও সাহস করে চীনা ভাষায় তাঁর সঙ্গে হাত মেলাতে চায়। পরে সে নিজের ভাইয়ের হাতও মেলানোর অনুরোধ করে, কারণ ভাইটি লজ্জায় সামনে আসতে পারছিল না।

কেরেকেসের কাছে এই ছোট্ট ঘটনাটিই ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মনে হয়েছে, শিনজিয়াংয়ের সৌন্দর্য শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্যে নয়, এখানকার মানুষের মধ্যেও গভীরভাবে উপস্থিত।

স্থিতিশীলতার মধ্যে স্বাভাবিক জীবন

ভ্রমণস্রষ্টাদের চোখে শিনজিয়াংয়ে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বও স্পষ্ট। তবে তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এসব ব্যবস্থার দৈনন্দিন ফলাফল।

পার্কে মানুষ নাচছে, শিশুরা খেলছে, পরিবারগুলো একসঙ্গে খাবার খাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবে জনসমাগমস্থলে চলাফেরা করছে—এই দৃশ্যগুলো তাঁদের কাছে স্থিতিশীলতার বাস্তব প্রতিফলন।

কেরেকেসের অভিজ্ঞতায়, স্থিতিশীলতা শুধু কোনো নীতিগত শব্দ নয়; এটি এমন একটি পরিবেশ, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

পাহাড়, নাচ আর খাবারের টানে মুগ্ধতা

শিনজিয়াংয়ের তিনটি বিষয় তাঁকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিয়েছে—প্রকৃতি, নাচ এবং খাবার।

কুনলুন পর্বতমালার বিশাল ও খোলা প্রাকৃতিক দৃশ্য তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তুষারঢাকা উঁচু পর্বত, হিমবাহ ও দুর্গম ভূপ্রকৃতি তাঁর কাছে স্বাধীনতার অনুভূতি তৈরি করেছে।

এরপর রয়েছে নাচ। জনসমক্ষে মানুষকে এত স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাচতে দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। কোথাও গেলেই ছন্দের সঙ্গে মানুষকে নড়াচড়া করতে দেখেছেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজেও তাতে যোগ দিয়েছেন।

আর খাবারের মধ্যে ঝাল পদ ও ভেড়ার মাংসের শিকে কাবাব তাঁর বিশেষ পছন্দ হয়েছে। খাবারকে ঘিরে সাধারণ আড্ডাও কখনো কখনো ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে আনন্দময় বিনিময়ে পরিণত হয়েছে।

ঐতিহ্য শুধু প্রদর্শনের জন্য নয়

যুক্তরাজ্যের ভ্রমণস্রষ্টা ইয়ান ইংলিসের কাছে শিনজিয়াংয়ের সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতার একটি ছিল হেতিয়ানের স্থানীয় বেকারি।

দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় তিনি পেছন থেকে একটি ছন্দময় ডাক শুনতে পান। কৌতূহলী হয়ে বাইরে গিয়ে দেখেন, কর্মীরা চুলা থেকে গরম বেক করা রুটি বের করে বড় ঝুড়িতে রাখছেন এবং বিশেষ ধরনের ডাক দিতে দিতে সেগুলো জানালার পাশে নিয়ে যাচ্ছেন।

ছোট্ট এই দৃশ্যই তাঁর কাছে শিনজিয়াংয়ের জীবন্ত সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। তাঁর উপলব্ধি, একটি অঞ্চলকে শুধু পাহাড় বা স্থাপনা দিয়ে বোঝা যায় না। স্থানীয় বিক্রেতার ডাক, খাবারের স্বাদ, কারিগরের হাতের কাজ এবং সংগীত-নৃত্যের মধ্যেও একটি অঞ্চলের আত্মপরিচয় বেঁচে থাকে।

কারুশিল্পে জীবিকা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন

Kuqa Grand Canyon: Geological Wonder | FoyoChinaTrip

হেতিয়ানের একটি কার্পেট কারখানায় গিয়ে ইংলিস দেখেছেন স্থানীয় নারীরা বয়নশিল্পের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করছেন। এই কাজ তাঁদের জন্য শুধু আয়-রোজগারের পথ নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্য ধরে রাখারও মাধ্যম।

তিনি নিজেও কার্পেট বোনার চেষ্টা করেন। প্রায় ১০ মিনিটে মাত্র চারটি গিঁট দিতে পেরেছিলেন। দক্ষ কারিগরদের তুলনায় নিজের কাজকে খুব সামান্য মনে হলেও এই অভিজ্ঞতা তাঁকে উপলব্ধি করিয়েছে, একটি কার্পেট আসলে কেবল একটি পণ্য নয়।

এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ধৈর্য, শ্রম, স্মৃতি, দক্ষতা ও পরিচয়ের দীর্ঘ ইতিহাস।

আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের সহাবস্থান

ইংলিসের মতে, আধুনিকায়ন মানেই যদি পুরোনো ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলা হয়, তবে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। শিনজিয়াংয়ে তিনি এমন একটি চিত্র দেখেছেন, যেখানে অবকাঠামো ও আধুনিক জীবনযাত্রার পাশাপাশি স্থানীয় সংগীত, নৃত্য, বয়নশিল্প ও অন্যান্য ঐতিহ্যও টিকে আছে।

তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ। ঐতিহ্য কোনো জাদুঘরে বন্দি থাকলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মানুষ যখন নিজের জীবনে তা ব্যবহার করে, শিশুদের শেখায় এবং নিজের সংস্কৃতি নিয়ে গর্ববোধ করে, তখনই সেই ঐতিহ্য সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকে।

মানুষের মধ্যেই ভ্রমণের সবচেয়ে বড় স্মৃতি

Xinjiang Diary, Day 3: Changji, where some fields tend themselves Over the  next several days, I'll be traveling across northwest China's #Xinjiang  Uygur Autonomous Region as part of People's Daily Online's "China

দুই ভ্রমণস্রষ্টার অভিজ্ঞতায় শিনজিয়াং একটি একক গল্প নয়। এখানে রয়েছে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, নানা ঐতিহ্য, বিস্তৃত প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং অসংখ্য মানুষের জীবন ও শ্রম।

কেরেকেসের কাছে শিনজিয়াং এমন একটি জায়গা, যেখানে একজন বিদেশিও অল্প সময়ের মধ্যে নিজেকে বাইরের মানুষ বলে মনে না করে স্থানীয় আনন্দের অংশ হয়ে উঠতে পারেন।

আর ইংলিসের কাছে স্থানীয় বেকারির কর্মীর সেই ছন্দময় ডাক যেন অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে একটি সেতু। তাঁর উপলব্ধি, শিনজিয়াংয়ের অতীত হারিয়ে যায়নি; বরং ঐতিহ্য, জীবিকা ও আধুনিক জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে তা নতুন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে।

শিনজিয়াং তাই তাঁদের চোখে শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়। এটি মানুষের হাসি, শিশুদের কৌতূহল, নাচের ছন্দ, খাবারের স্বাদ এবং কারিগরের হাতে বোনা স্মৃতির এক জীবন্ত সমাহার।

শিনজিয়াংয়ের এই অভিজ্ঞতা তাঁদের দুজনের কাছেই একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—কখনো কখনো কোনো জায়গাকে বোঝার জন্য দীর্ঘ বক্তৃতার প্রয়োজন হয় না। একটি নাচের আহ্বান, একটি শিশুর বাড়িয়ে দেওয়া হাত কিংবা একজন বিক্রেতার প্রাণবন্ত ডাকই অনেক কথা বলে দিতে পারে।

শিনজিয়াংয়ে সেই ভাষাই যেন সবচেয়ে বেশি শোনা যায়।