মরক্কোর রাজধানী রাবাতের পাশের শহর সালেতে দাঁড়িয়ে থাকা মুহাম্মদ ষষ্ঠ টাওয়ার শুধু উচ্চতার দিক থেকেই দেশটির নতুন রেকর্ড তৈরি করেনি, বরং আধুনিক স্থাপত্যের সঙ্গে মরক্কোর বহু শতাব্দীর শিল্প ও কারুশিল্পের ঐতিহ্যকে এক ছাদের নিচে এনে অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
২৫০ মিটার উচ্চতার ৫৫ তলা এই সুউচ্চ ভবনটি চলতি বছরের এপ্রিল মাসে চালু হয়। বর্তমানে এটি মরক্কোর সবচেয়ে উঁচু ভবন এবং আফ্রিকার তৃতীয় সর্বোচ্চ টাওয়ার। দূর থেকে ভবনটির সরু, শীর্ষমুখী আকৃতি অনেকটা আকাশের দিকে ছুটে চলা রকেটের মতো মনে হয়। বুরেগ্রেগ উপত্যকার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটি ইতোমধ্যেই রাবাত ও সালেহ অঞ্চলের দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন এনেছে।
এক ভবনেই হোটেল, বাসস্থান ও বিনোদনের আয়োজন
মুহাম্মদ ষষ্ঠ টাওয়ারকে কেবল একটি দৃষ্টিনন্দন সুউচ্চ ভবন হিসেবে তৈরি করা হয়নি। এর ভেতরে রয়েছে বিলাসবহুল হোটেল, ব্যক্তিগত আবাসন, কার্যালয়, রেস্তোরাঁ, বিশাল ভোজসভা কক্ষ, উঁচুতে অবস্থিত আরামকেন্দ্র এবং জনসাধারণের জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিসর।
বিশ্বখ্যাত রন্ধনশিল্পী অ্যালাঁ দ্যুকাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিশেষ রেস্তোরাঁও রয়েছে ভবনটিতে। ভবনের বিভিন্ন অংশকে আলাদা আলাদা জগত হিসেবে না দেখে অভিন্ন একটি অভিজ্ঞতার মধ্যে যুক্ত করার লক্ষ্যেই পুরো অভ্যন্তরীণ নকশা সাজানো হয়েছে।
এই বিশাল প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ নকশার দায়িত্ব দেওয়া হয় খ্যাতনামা ফরাসি স্থপতি পিয়ের-ইভ রোশোঁকে। তাঁর প্রতিষ্ঠান প্রায় আট বছর ধরে টাওয়ারটির প্রতিটি অভ্যন্তরীণ অংশের নকশা নিয়ে কাজ করেছে।
রোশোঁর সামনে মূলত দুটি লক্ষ্য ছিল। প্রথমত, অত্যাধুনিক ভবনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিলাসবহুল ও সমকালীন অভ্যন্তর তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, সেই আধুনিকতার ভেতরে মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী শিল্প, নকশা ও কারুশিল্পের স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রাখা।
প্রবেশপথেই মরক্কোর ঐতিহ্যের ছোঁয়া
ভবনে প্রবেশ করলেই ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এই মেলবন্ধন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রবেশপথ সাজানো হয়েছে জেলিজ নামের হাতে কাটা চকচকে পোড়ামাটির টাইল দিয়ে। দশম শতাব্দী থেকেই মরক্কোর স্থাপত্যে এই ধরনের টাইল বিশেষ পরিচিতি বহন করে আসছে।
প্রবেশপথে ব্যবহার করা হয়েছে পান্না-সবুজ রঙের টাইল, যা মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী নকশায় সবচেয়ে পরিচিত রংগুলোর একটি। ভবনের অন্য অংশে একই উপকরণকে আরও আধুনিক রূপ দেওয়া হয়েছে।
নারীদের শৌচাগারে গোলাপি ও গাঢ় মেরুন রঙের টাইল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে সূক্ষ্ম ফুলের নকশা। ঐতিহ্যবাহী মরক্কোর স্থাপত্যে দেখা জটিল জ্যামিতিক নকশার পরিবর্তে এখানে কোমল ফুলেল বিন্যাস ব্যবহার করা হয়েছে। আবার বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় কালো ও নীল রঙের টাইল ব্যবহার করে একই উপকরণকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহ দেওয়া হয়েছে।
শতাব্দীপ্রাচীন কারুশিল্পের পুনর্জাগরণ
মরক্কোর ঐতিহাসিক স্থাপত্যে হাতে তৈরি জিপসাম বা প্লাস্টারের ওপর সূক্ষ্ম নকশা খোদাই করার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। দক্ষ কারিগরেরা ভেজা প্লাস্টারের ওপর আরবেস্ক, বাঁকানো অলংকরণ ও ক্যালিগ্রাফির নকশা ফুটিয়ে তোলেন।
মুহাম্মদ ষষ্ঠ টাওয়ারেও সেই পুরোনো কৌশলকে নতুন করে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে হোটেলের কক্ষ ও আবাসিক স্যুটে হাতে খোদাই করা ছাদ এবং স্তরযুক্ত অলংকরণ দেখা যায়।
ভবনের প্রবেশকক্ষেও রয়েছে সূক্ষ্ম জ্যামিতিক অলংকরণ। দেয়ালের এসব নকশায় দ্বাদশ শতাব্দীর ভূগোলবিদ আল-ইদ্রিসি এবং চতুর্দশ শতাব্দীর আন্দালুসীয় কবি ইবন আল-খতিবের রচনার প্রতি ইঙ্গিত রাখা হয়েছে।
দরজা ও ধাতব শিল্পেও ঐতিহ্যের ছাপ
ভবনের দরজাগুলোতেও ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের ব্যবহার চোখে পড়ে। খোদাই করা কাঠের প্যানেলের সঙ্গে রয়েছে ছয় ডানাবিশিষ্ট তারকার নকশা করা ঢালাই পিতলের হাতল।
পিকক অ্যালি আকাশ-প্রবেশকক্ষে শিল্পী আশরাফ তুলুব তৈরি করেছেন সূক্ষ্ম খোদাই করা লোহার কাজ। বুরেগ্রেগ উপত্যকার প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এসব নকশায় সারস ও ময়ূরের অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
তবে ভবনের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন অংশগুলোর একটি হলো উত্তর প্রবেশদ্বারের বিশাল ব্রোঞ্জের দরজা। মরক্কোর রাজপ্রাসাদে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী বিশাল দরজা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে। দরজাজুড়ে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ইসলামি নকশার সূক্ষ্ম অলংকরণ।
আলো-ছায়ার খেলায় পুরোনো নকশার নতুন রূপ
ভবনের আরামকেন্দ্রের করিডরগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে জ্যামিতিক কাঠের জালি। মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী মুশারাবিয়া পর্দা থেকে অনুপ্রাণিত এই কাঠের নকশা একদিকে আলোকে নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যদিকে দেয়ালে সৃষ্টি করে মনোরম আলো-ছায়ার খেলা।
এর পাশাপাশি ভবনের বিভিন্ন অংশে হাতে বোনা কাপড় ও কার্পেট ব্যবহার করা হয়েছে। জ্যামিতিক নকশার উলের ও রেশমের তৈরি বিশেষ কার্পেট এবং কর্ডোভার চামড়ার আসবাব ভবনের কক্ষগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
স্থানীয় প্রকৃতিও নকশার অংশ

মুহাম্মদ ষষ্ঠ টাওয়ারের নকশায় শুধু মরক্কোর ঐতিহ্য নয়, আশপাশের প্রকৃতিও জায়গা করে নিয়েছে। বিশাল ভোজসভা কক্ষে ফরাসি শিল্পী পিয়ের বোনেফিয়ের তৈরি একটি বিশেষ চিত্রকর্ম রয়েছে। পানিকে কেন্দ্র করে বিমূর্ত ভূদৃশ্যের জন্য পরিচিত এই শিল্পী পাশের বুরেগ্রেগ নদী থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে কাজটি তৈরি করেছেন।
ফলে ভবনের অভ্যন্তরীণ নকশা শুধু একটি বিলাসবহুল আন্তর্জাতিক স্থাপনার পরিচয় বহন করছে না; বরং তার চারপাশের ভূপ্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকেও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
উচ্চতার চেয়ে বড় পরিচয়
চালু হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই টাওয়ারটি দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠতে শুরু করেছে। হোটেলে অতিথিদের আনাগোনা বাড়ছে, রেস্তোরাঁগুলোতে জমছে ভিড় এবং ভোজসভা কক্ষে আয়োজন হচ্ছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান।
আন্তর্জাতিক মানের বিলাসবহুল ভবন হয়েও মুহাম্মদ ষষ্ঠ টাওয়ার তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। আধুনিক স্থাপত্যের সঙ্গে মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী টাইল, কাঠ, ধাতু, প্লাস্টার, বয়নশিল্প ও শিল্পকর্মের সমন্বয় ভবনটিকে দিয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়।
দেশটির সবচেয়ে উঁচু ভবন হিসেবে এর উচ্চতা নিঃসন্দেহে আকর্ষণের বড় কারণ। তবে এর প্রকৃত বিশেষত্ব সম্ভবত অন্য জায়গায়—আধুনিকতার দিকে এগিয়ে গিয়েও কীভাবে একটি দেশ তার শতাব্দীপ্রাচীন শিল্প ও কারুশিল্পকে নতুন ভাষায় তুলে ধরতে পারে, মুহাম্মদ ষষ্ঠ টাওয়ার তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















