আলবেনিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার রাজনৈতিক অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে আছে সেই ভয়াবহ সকাল। মৃত্যুর জন্য যখন কারাগার থেকে ১৩ জন বন্দিকে বের করে নেওয়া হচ্ছিল, তখন চারপাশে ছিল আতঙ্ক, কান্না আর অনিশ্চয়তা। কিন্তু মৃত্যুভয় তাদের কণ্ঠ থামাতে পারেনি। বরং শেষ মুহূর্তে জাতীয় সংগীত গেয়ে তারা যেন নিজেদের আত্মমর্যাদা আর দেশের প্রতি ভালোবাসার কথাই জানিয়ে গিয়েছিলেন।
শেষ সকালেও ছিলেন শান্ত
তাদের মধ্যে ছিলেন মুরাত বাশা—জাতীয়তাবাদী নেতা, দেশপ্রেমিক এবং আলবেনিয়ার রাজতান্ত্রিক আমলের একজন সাবেক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা। সহবন্দি জেমাল আলিমেহমেতির স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে সেই শেষ সকালের হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
কারাগারের কক্ষে তখন প্রায় ১৪ থেকে ১৫ জন মানুষ। সবাই জানতেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ১৩ জনকে নিয়ে যাওয়া হবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে। ভয় আর উৎকণ্ঠায় যখন অন্যরা অস্থির, মুরাত বাশা তখনও ছিলেন আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত। তিনি সহবন্দিদের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
কিছুক্ষণ পর পুলিশ ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দলের সদস্যরা এসে ১৩ জনকে কক্ষ থেকে বের করে আনে। তাদের দুজন দুজন করে হাত বেঁধে দেওয়া হয়। তখন মুরাত বাশা ১৯ বছরের তরুণ মুস্তাফা ভ্রাপিকে নিজের সঙ্গে বাঁধার জন্য ডাকেন।
মৃত্যুর মুখেও তিনি যেন সবচেয়ে কমবয়সী বন্দিটির পাশে থাকার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। পরে সবাইকে কাঁটাতারের মতো তার দিয়ে একসঙ্গে বেঁধে ফেলা হয়।
বিদায়ের আগে মুরাত বাশা সহবন্দিদের উদ্দেশে ক্ষমা চান। এরপর উচ্চারণ করেন দেশের জয় এবং রাজার জয়ধ্বনি। কারাগারের অন্য কক্ষগুলোতে তখন কান্নার রোল পড়ে যায়। কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি, কেউ ছুটে যান জানালার কাছে—শেষবারের মতো ওই মানুষগুলোর চলে যাওয়া দেখতে।
মায়ের চোখের সামনে ছেলের শেষযাত্রা
সবচেয়ে নির্মম দৃশ্যটি অপেক্ষা করছিল কারাগারের উঠানে।
১৯ বছরের মুস্তাফা ভ্রাপির মা ছেলেকে দেখতে সেখানে এসেছিলেন। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন, শেষবারের মতো ছেলের সঙ্গে কথা বলবেন, তাকে জড়িয়ে ধরবেন। কিন্তু তার চোখের সামনে দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য—ছেলেকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তিনি চিৎকার করে বলতে থাকেন, যেন তার ছেলেকে হত্যা না করা হয়। সেই আর্তনাদ থামাতে এক সৈন্য তাকে বন্দুকের বাঁট দিয়ে আঘাত করে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অচেতন হয়ে যান।
মাকে ওই অবস্থায় দেখে মুস্তাফা ভেঙে পড়েন। ঠিক তখনই মুরাত বাশা তাকে ধরে পাশে দাঁড় করান। তাকে সাহস দেন, বলেন ভয় না পেতে, মৃত্যুর সামনে যেন দুর্বল হয়ে না পড়ে।
এই ভয়াবহ মুহূর্তের পরই ঘটে সেই ঘটনা, যা পরে কারাগারের ইতিহাসে এক প্রতীকী স্মৃতি হয়ে ওঠে।
মুরাত বাশা জাতীয় সংগীত গাইতে শুরু করেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার সঙ্গে কণ্ঠ মেলান অন্য বন্দিরা। পরে সেই গান ছড়িয়ে পড়ে পুরো কারাগারে।
মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন ১৩ জন মানুষ, অথচ তাদের কণ্ঠে তখন ছিল দেশের গান। যেন বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়েও তারা ঘোষণা করছিলেন—শরীরকে হত্যা করা যায়, কিন্তু আত্মমর্যাদাকে নয়।
যে গান হয়ে উঠেছিল বিদায়ের প্রতীক
সেই ঘটনার পর জাতীয় সংগীত শুধু একটি গান হিসেবে থাকেনি। কারাগারের স্মৃতিতে এটি পরিণত হয়েছিল মৃত্যুর মুখে সাহসের প্রতীকে।
সহবন্দি জেমাল আলিমেহমেতির বর্ণনা অনুযায়ী, এরপর কারাগারে কেউ মৃত্যুদণ্ডের জন্য নিয়ে যাওয়া হলে জাতীয় সংগীত গাওয়ার একটি রীতি তৈরি হয়েছিল। মুরাত বাশার শেষ মুহূর্তের সেই কণ্ঠ যেন অন্য বন্দিদের মধ্যেও সাহসের প্রতীক হয়ে বেঁচে ছিল।
মুরাত বাশার দীর্ঘ সামরিক জীবন
মুরাত বাশার জীবনও ছিল ঘটনাবহুল। তরুণ বয়সেই তিনি আলবেনিয়ার রাজপরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং আহমেত জোগুর সঙ্গে তার রাজনৈতিক ও সামরিক পথচলা শুরু হয়।
১৯১৯ সালে তিনি সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আলবেনিয়ার জেন্ডারমেরিতে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সশস্ত্র সংঘর্ষ ও বিদ্রোহ দমনে অংশ নেন। ১৯২২ সালে তিরানায় এক সংঘর্ষে হাঁটুতে গুলিবিদ্ধ হন। চিকিৎসার জন্য তাকে অস্ট্রিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানেও তিনি সামরিক প্রশিক্ষণ নেন এবং পরে দেশে ফিরে আবার দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
১৯২৪ সালে আহমেত জোগুর সঙ্গে তিনি আবার আলবেনিয়ায় ফিরে আসেন। পরবর্তী সময়ে সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। রাজতান্ত্রিক আমলে তিনি বিভিন্ন সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনের অভিযানে অংশ নেন এবং তিরানার জেন্ডারমেরি বিদ্যালয়ের কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
ইতালির আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও লড়েছিলেন
১৯৩৯ সালে ইতালি আলবেনিয়া আক্রমণ করলে মুরাত বাশা সশস্ত্র প্রতিরোধে অংশ নেন। ভোরা ও প্রেজা অঞ্চলে জেন্ডারমেরির বিভিন্ন ইউনিট পরিচালনা করেন তিনি।

পরে তাকে দেশ ছাড়তে হয়। যুগোস্লাভিয়ায় গিয়ে তিনি অন্য দেশপ্রেমিকদের সঙ্গে একটি শিবিরে আটক ছিলেন। ১৯৪১ সালে বলকান অঞ্চলের পরিস্থিতি বদলে গেলে তিনি আবাজ কুপির সঙ্গে আলবেনিয়ায় ফিরে আসেন।
শেষ পর্যন্ত নতুন শাসনের হাতে বন্দি
দেশে ফিরে মুরাত বাশা আবাজ কুপির নেতৃত্বাধীন রাজতন্ত্রপন্থী প্রতিরোধ বাহিনীর সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ইতালীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি পরবর্তী সময়ে বৈধতাপন্থী রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা হয়ে ওঠেন।
১৯৪৩ সালে বৈধতাপন্থী দল গঠনের সময়ও তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পরে তিনি ওই বাহিনীর সামরিক নেতৃত্বে দায়িত্ব পান এবং তিরানার পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন সংঘর্ষে অংশ নেন।
কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে আলবেনিয়ায় কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তার ভাগ্য বদলে যায়। আহমেত জোগুর ঘনিষ্ঠ সাবেক কর্মকর্তা এবং বৈধতাপন্থী সামরিক নেতা হিসেবে নতুন সরকারের চোখে তিনি হয়ে ওঠেন রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিপক্ষ।
অবশেষে তাকে অন্য অনেক রাজনৈতিক বিরোধীর মতো গ্রেপ্তার, বন্দিত্ব ও মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে হয়।
তার জীবনের শেষ দৃশ্য তাই শুধু একজন মানুষের মৃত্যুর গল্প নয়। এটি এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন রাজনৈতিক সংঘাত মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছিল, আর মৃত্যুর মুখেও কেউ কেউ নিজের বিশ্বাস, দেশ ও মর্যাদাকে আঁকড়ে ধরে থাকার চেষ্টা করছিলেন।
মুরাত বাশার শেষ গান সেই কারণেই ইতিহাসের পাতায় একটি গভীর প্রতীকে পরিণত হয়েছে—মৃত্যু সামনে দাঁড়িয়েও মাথা নত না করার প্রতীক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















