প্রযুক্তি যখন জীবনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্তকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তখন ঘর সাজানোর ক্ষেত্রেই যেন মানুষ উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে। একসময় যে বাড়িকে যত বেশি স্বয়ংক্রিয়, সংযুক্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর করা যেত, সেটিই ছিল আধুনিকতার প্রতীক। এখন সেই ধারণার বিপরীতে জনপ্রিয় হচ্ছে এমন এক ধরনের ঘর, যেখানে প্রযুক্তির উপস্থিতি ইচ্ছাকৃতভাবেই কম। সহজ ভাষায়, মানুষ আবার ফিরে চাইছে এমন বাড়ি, যেখানে সুইচ টিপলে আলো জ্বলে, বই পড়ার জন্য আলাদা জায়গা থাকে এবং বসার ঘরের কেন্দ্রবিন্দু বিশাল পর্দা নয়।
এই নতুন প্রবণতাকে বলা হচ্ছে ‘নির্বোধ বাড়ি’, ‘প্রযুক্তিবিহীন অভ্যন্তর’ কিংবা ‘সরল জীবনধারার ঘর’। নাম যাই হোক, মূল আকাঙ্ক্ষা একটাই—অতিরিক্ত প্রযুক্তি থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে ঘরকে আবার মানুষের জন্য শান্ত, উষ্ণ ও স্বাভাবিক করে তোলা।
অতিরিক্ত প্রযুক্তির বিপরীতে স্বস্তির খোঁজ
লন্ডনের নকশাবিদ বারি জেরল্ডের মতে, এই পরিবর্তন মূলত অতিরিক্ত উদ্দীপনার বিরুদ্ধে মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। দিনের বড় অংশ মানুষ পর্দা, দ্রুতগতির তথ্যপ্রবাহ ও ডিজিটাল পরিবেশে কাটাচ্ছে। ফলে বাড়িকে তারা এমন একটি জায়গা হিসেবে দেখতে চাইছে, যেখানে এর সম্পূর্ণ বিপরীত অনুভূতি পাওয়া যায়।
মানুষ এখন এমন ঘর চাইছে, যেখানে উষ্ণতা আছে, ব্যক্তিত্ব আছে এবং মনে হয় সেই ঘরেরও একটি নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে। দেয়ালে হাতে আঁকা ছবি, পুরোনো আসবাব, ঐতিহ্যবাহী সাজসজ্জা কিংবা স্মৃতিবাহী জিনিস তাই নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
নকশাবিদদের অনেকের কাছেই বিষয়টি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো পছন্দ নয়। গ্রাহকেরাই সরাসরি বলছেন, তারা এমন ঘর চান যেখানে আলো জ্বালাতে কম্পিউটার বা জটিল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার প্রয়োজন হবে না। একটি সাধারণ সুইচই যথেষ্ট।
স্মার্ট বাড়ির জটিলতাও বিরক্তির কারণ
স্বয়ংক্রিয় বাড়ি বাইরে থেকে যত আকর্ষণীয়ই মনে হোক, বাস্তবে তা সব সময় ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় না। পরিবেশগত মনোবিজ্ঞানী স্যালি অগাস্টিনের মতে, স্বয়ংক্রিয় আলো কিংবা অন্য কোনো ব্যবস্থাকে বারবার নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বদলাতে হলে মানুষের নিয়ন্ত্রণবোধ বরং কমে যেতে পারে।
প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার আরেকটি সমস্যা হলো ত্রুটির সম্ভাবনা। কম্পিউটার যেমন হঠাৎ অচল হতে পারে, তেমনি স্বয়ংক্রিয় বাড়ির বিভিন্ন ব্যবস্থাও ভুল করতে পারে। ফলে পুরো বাড়ি যদি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যায়, তাহলে সব সময় কোথাও না কোথাও কিছু নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
আরেকটি বিষয় হলো সামাজিক যোগাযোগ। অতিরিক্ত পর্দানির্ভর ঘর পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার সরাসরি কথোপকথনও কমিয়ে দিতে পারে। আগে কোনো প্রশ্ন উঠলে মানুষ পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করত। এখন অনেক সময় উত্তর খুঁজতে সঙ্গে সঙ্গে মুঠোফোন হাতে নেওয়াই স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
সন্তানদের জন্যও প্রযুক্তিবিহীন ঘর
লন্ডনের নকশাবিদ ভেনেশিয়া রুডেবেক মনে করেন, পরিবারগুলো এই প্রবণতাকে এগিয়ে নিচ্ছে। বিশেষ করে সন্তানদের পর্দার সামনে কাটানো সময় নিয়ে বাবা-মায়ের সচেতনতা বাড়ছে। তাই তারা ঘরের নকশাতেই এমন ব্যবস্থা রাখতে চাইছেন, যা পরিবারের সবাইকে পরস্পরের কাছাকাছি রাখবে।
প্রবেশপথের কাছে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় মুঠোফোন রেখে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেখানে ফোন রাখা, চার্জ দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো সম্ভব। কারও ক্ষেত্রে এটি একটি বড় ঝুড়ি হতে পারে, আবার কারও বাড়িতে আলাদা তাক বা সংরক্ষণস্থলও তৈরি করা যায়।
মুঠোফোনের বদলে পুরোনো ধরনের তারযুক্ত ফোনও ফিরছে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের পরিবারে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। দেয়ালে যুক্ত ফোনে কথা বলার সময় একই সঙ্গে অন্য অনেক কাজ করার সুযোগ থাকে না। ফলে কথোপকথনের প্রতি মনোযোগ বাড়ে।
বসার ঘরেও ফিরছে বই, খেলা ও আড্ডা
বসার ঘরের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিশাল পর্দাকে রাখার ধারণারও পরিবর্তন ঘটছে। এর বদলে নকশাবিদরা এমন আরামদায়ক জায়গা তৈরি করছেন, যেখানে বই পড়া, লেখা, খেলাধুলা, ধাঁধা সমাধান কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্প করা যায়।
কোনো ঘরে শিশুদের জন্য পরিবর্তনযোগ্য দেয়াল থাকতে পারে, কোথাও কিশোরদের জন্য বিলিয়ার্ড খেলার ব্যবস্থা, আবার কোথাও সুন্দরভাবে সাজানো বইয়ের স্তূপই হয়ে উঠতে পারে আকর্ষণের কেন্দ্র।
উদ্দেশ্য একটাই—ঘর যেন মানুষকে পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকার বদলে একে অপরের দিকে তাকাতে উৎসাহিত করে।
পুরোনো আসবাব ও সাধারণ নকশার প্রত্যাবর্তন
প্রযুক্তি কমানোর পাশাপাশি পুরোনো দিনের আসবাব ও সাজসজ্জাও গুরুত্ব পাচ্ছে। বহু পর্দাযুক্ত আধুনিক কর্মস্থলের বদলে ছোট ও সাধারণ লেখার টেবিলকে বেশি পছন্দ করছেন কেউ কেউ। কারণ সেটি শুধু কাজ করার জায়গা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট দৈনন্দিন অভ্যাস বা আচার তৈরি করে।
একইভাবে পুরোনো রেডিও, হাতে তৈরি কার্পেট, বাঁকানো নকশার আসবাব এবং ঐতিহ্যবাহী আলোকসজ্জা ঘরে অতীতের আরাম ও পরিচিতির অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে পারে।
নকশাবিদ সামান্থা ফয়েরের মতে, ঘরের আলোয়ও সরলতা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ছাদের আধুনিক বাতির ওপর নির্ভর না করে টেবিলের বাতি, দেয়ালের বাতি এবং অন্যান্য আলোর স্তর ব্যবহার করলে ঘরে অনেক বেশি উষ্ণতা তৈরি হয়। আলো নিয়ন্ত্রণে জটিল স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বাদ দিয়ে সাধারণ ঘূর্ণনযোগ্য নিয়ন্ত্রক বা টগল সুইচ ব্যবহার করাও এই প্রবণতার অংশ।
দেয়ালের বৈদ্যুতিক সংযোগস্থলেও সাধারণ ব্যবস্থার পক্ষে মত দিচ্ছেন অনেকে। কারণ আজকের নির্দিষ্ট সংযোগব্যবস্থা কয়েক বছর পরেই পুরোনো হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সাধারণ সংযোগস্থল দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়।
নস্টালজিয়ার সঙ্গে আধুনিকতার ভারসাম্য
তবে এই প্রবণতার অর্থ প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়। বিশেষ করে ঘরে বসে কাজ করার যুগে প্রযুক্তি ছাড়া চলা প্রায় অসম্ভব। বরং লক্ষ্য হচ্ছে প্রযুক্তিকে প্রয়োজনীয় সীমার মধ্যে রাখা এবং ঘরের প্রতিটি অংশকে প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল না করা।
নকশাবিদ এমিলি স্পানোসের মতে, সবচেয়ে ভালো সমাধান হলো অতীতের স্মৃতি ও বর্তমান প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। আশির ও নব্বইয়ের দশকের মতো এমন একটি পরিবেশ, যেখানে মানুষ সব সময় সংযুক্ত থাকার চাপ অনুভব করত না, সেই অনুভূতিটিই নতুন করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
এর পেছনে মানসিক স্বস্তির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সুখকর পুরোনো স্মৃতি মানুষের মনে ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করতে পারে। এতে মেজাজ ভালো হওয়ার পাশাপাশি চিন্তাশক্তি ও অন্যদের সঙ্গে সহজে মিশে থাকার ক্ষমতাও বাড়তে পারে।
‘কম প্রযুক্তি’ কি দীর্ঘস্থায়ী প্রবণতা হবে?
নকশাবিদদের মতে, এটি সাময়িক কোনো সাজসজ্জার ধারা নয়। বরং এর পেছনে বাস্তব অর্থনৈতিক যুক্তিও রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর বাড়ির যন্ত্রপাতি কয়েক বছর পরপর বদলাতে হয়। নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পুরোনো যন্ত্রের সামঞ্জস্যও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে সাধারণ সুইচ, সাধারণ সংযোগব্যবস্থা, পুরোনো ধরনের আসবাব কিংবা হাতে তৈরি সামগ্রী সহজে অচল হয়ে যায় না। এগুলোর স্থায়িত্ব বেশি এবং সময়ের সঙ্গে এগুলো আরও চরিত্রবান হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ‘বুদ্ধিমান’ বাড়ির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়তো কোনো নতুন প্রযুক্তি নয়—বরং এমন একটি বাড়ি, যেখানে মানুষ প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে, প্রযুক্তি মানুষকে নয়। আধুনিক জীবনের অবিরাম শব্দের বাইরে শান্তি, স্মৃতি, পারিবারিক যোগাযোগ ও সরলতার জন্য এই ফিরে আসাই হয়তো আগামী দিনের ঘর সাজানোর অন্যতম বড় প্রবণতা।
প্রযুক্তির যুগে তাই বাড়ি যতটা ‘স্মার্ট’ হবে, ততটাই ভালো—এমন ধারণা বদলে যাচ্ছে। কখনও কখনও কম প্রযুক্তিই হয়তো ঘরকে আরও বেশি মানবিক করে তোলে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















