সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা নিয়ে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কঠোর সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমার নিয়ম ঠিকভাবে না মানলে জরিমানা তো হতে পারে, এমনকি কাজের অনুমতিপত্র স্থগিত, বাতিল বা নবায়নেও বাধা আসতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মানবসম্পদ ও আমিরাতীকরণ মন্ত্রণালয় বেসরকারি খাতের কর্মী এবং গৃহকর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা সংক্রান্ত ছয় ধরনের অনিয়ম চিহ্নিত করেছে। কর্মীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশটির শ্রমবাজারে নিয়মকানুন আরও কার্যকর করতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
যে ছয় অনিয়মে শাস্তি হতে পারে
প্রথমত, কোনো কর্মীকে স্বাস্থ্যবিমার আওতায় না নেওয়া বা তার স্বাস্থ্যবিমার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা নবায়ন না করা অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হবে।
দ্বিতীয়ত, বিমার আওতাভুক্ত কোনো কর্মীর চিকিৎসা বা জরুরি চিকিৎসাসেবার খরচ বহন করতে অস্বীকৃতি জানানো যাবে না।
তৃতীয়ত, কর্মীর কাছ থেকে স্বাস্থ্যবিমা করার বা নবায়নের পুরো খরচ কিংবা খরচের কোনো অংশ আদায় করাও নিষিদ্ধ।
চতুর্থত, মন্ত্রণালয় নির্ধারিত ন্যূনতম সুবিধা ও চিকিৎসা সুরক্ষা পূরণ করে না—এমন স্বাস্থ্যবিমা কর্মীর জন্য গ্রহণ করা যাবে না।
পঞ্চমত, কর্মীর কাজের অনুমতিপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তার স্বাস্থ্যবিমা বাতিল করা যাবে না, যদি এতে বিমা সুরক্ষার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।
ষষ্ঠত, কাজের অনুমতিপত্র যতদিন কার্যকর থাকবে, ততদিন কর্মীর স্বাস্থ্যবিমাও অব্যাহত রাখার দায়িত্ব নিয়োগদাতার।
![]()
জরিমানা, এমনকি কাজের অনুমতিপত্রেও নিষেধাজ্ঞা
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্বাস্থ্যবিমা সংক্রান্ত নিয়ম ভঙ্গ করলে নির্ধারিত প্রশাসনিক জরিমানা করা হবে। এ ক্ষেত্রে ২০২০ সালের মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জরিমানা ও অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
শুধু জরিমানাতেই বিষয়টি শেষ হবে না। পরিস্থিতি অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাজের অনুমতিপত্র স্থগিত করা, আবেদন প্রত্যাখ্যান করা কিংবা অনুমতিপত্র নবায়ন না করার মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
কাজের অনুমতিপত্রের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে স্বাস্থ্যবিমা
কর্মীর কাজের অনুমতিপত্র দেওয়া বা নবায়নের সময় স্বাস্থ্যবিমার কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যবিমাটি মন্ত্রণালয় অনুমোদিত ন্যূনতম সুবিধা পূরণ করতে হবে। কাজের অনুমতিপত্র দেওয়া বা নবায়নের সময় বিমাটি কার্যকর থাকতে হবে এবং অনুমতিপত্রের দুই বছরের মেয়াদজুড়ে তা চালু রাখতে হবে।
এ ছাড়া কর্মীর কাছ থেকে স্বাস্থ্যবিমা করার বা নবায়নের কোনো অর্থ নেওয়া যাবে না। তবে বিমার নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে যে নির্ধারিত অংশ কর্মীকে দিতে হয়, তা এর বাইরে থাকবে।
অনুমতিপত্রের মেয়াদ চলাকালে স্বাস্থ্যবিমা বাতিল করাও সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। বিশেষ অনুমোদিত নিয়ম মেনে বাতিল করা হলেও কর্মীর বিমা সুরক্ষার ধারাবাহিকতা কোনোভাবেই নষ্ট করা যাবে না।
কর্মী ও নিয়োগদাতাদের মতামত নিচ্ছে সরকার
স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে বর্তমানে কর্মী ও নিয়োগদাতাদের কাছ থেকে মতামত সংগ্রহ করছে মানবসম্পদ ও আমিরাতীকরণ মন্ত্রণালয়।
এই মতামত গ্রহণের লক্ষ্য হলো কর্মী ও নিয়োগদাতাদের প্রয়োজন, প্রত্যাশা এবং সমস্যাগুলো বোঝা। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত বিমা সুবিধা ও চিকিৎসা সুরক্ষা বাস্তবে কতটা কার্যকর, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।
মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকবে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। সংগৃহীত মতামত ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা উন্নত করার ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হবে।
কোন বিষয়গুলো নিয়ে মতামত চাওয়া হচ্ছে
জরিপে কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা বেছে নেওয়ার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জানতে চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিমার খরচ, চিকিৎসা সুবিধার পরিধি, চিকিৎসাকেন্দ্রের সংখ্যা এবং অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কতটা সময় লাগে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্মীর সংখ্যার ভিত্তিতে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করে মতামত দিতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০ জনের কম কর্মী, ১০ থেকে ৪৯ জন, ৫০ থেকে ৯৯ জন এবং ১০০ বা তার বেশি কর্মী থাকা প্রতিষ্ঠান।
কোন ধরনের কর্মীকে স্বাস্থ্যবিমার আওতায় রাখা হবে, সেটিও জরিপের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, দাপ্তরিক কর্মী, মাঠপর্যায়ের কর্মী ও গৃহকর্মীদের কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজন হলে অন্য শ্রেণির কর্মীদেরও যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ যদি সংযুক্ত আরব আমিরাতের একাধিক এলাকায় পরিচালিত হয়, তাহলে সেসব এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে কি না, সেটিও জানতে চাওয়া হচ্ছে।
কর্মীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষায় জোর
সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রম আইন অনুযায়ী কর্মীদের জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও চিকিৎসাসেবার বিষয়টি নিশ্চিত করা নিয়োগদাতাদের দায়িত্বের অংশ।
২০২৬ সালের নতুন মন্ত্রণালয় নির্দেশনার আওতায় বেসরকারি খাতের কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা করার প্রক্রিয়াকে কাজের অনুমতিপত্র দেওয়া ও নবায়নের ব্যবস্থার সঙ্গে বৈদ্যুতিনভাবে যুক্ত করা হয়েছে।
এর ফলে কোনো কর্মীর বৈধ স্বাস্থ্যবিমা রয়েছে কি না, তা ব্যবস্থার মাধ্যমেই যাচাই করা সম্ভব হবে। আলাদাভাবে বিমার কাগজ জমা দেওয়ার প্রয়োজন কমবে। এতে প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার পাশাপাশি সময়ও বাঁচবে।
বছরে সর্বোচ্চ ৩২০ দিরহামের বিমা
মানবসম্পদ ও আমিরাতীকরণ মন্ত্রণালয় বিমা ব্যবস্থার আওতায় বিমা খাতের অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি নতুন স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা চালু করে।
এই ব্যবস্থায় ৬৪ বছর বয়স পর্যন্ত কর্মীদের জন্য বছরে সর্বোচ্চ ৩২০ দিরহাম প্রিমিয়ামের একটি বিমা সুবিধা তৈরি করা হয়েছে। এতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী, গৃহকর্মী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
স্বাস্থ্যবিমা শুধু চিকিৎসার খরচ বহনের বিষয় নয়; এটি কর্মীর নিরাপত্তা, কর্মস্থলে স্থিতিশীলতা এবং প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। তাই সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার কর্মীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষাকে আরও শক্তিশালী করতে নিয়মকানুন বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















