সন্তানকে বড় করা শুধু ভালোবাসা আর দায়িত্বের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক চাপও। বিশেষ করে একটি পরিবারের জন্য বাসস্থানের খরচের সঙ্গে শিশুর যত্নের ব্যয় যোগ হলে অনেক শহরে আয়ের বড় একটি অংশ সেখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০০টি জনবহুল মহানগর এলাকার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও পরিবারের মোট আয়ের ৯০ শতাংশেরও বেশি শুধু বাসস্থান ও শিশুর যত্নের পেছনে চলে যাচ্ছে।
একই শহরে আয় বেশি হলেও স্বস্তি নেই
বাসস্থানের দাম বেশি এমন এলাকায় শিশুর যত্নের ব্যয়ও সাধারণত বেশি। তবে শুধু বাড়ির দাম দেখলেই একটি পরিবারের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয় বোঝা যায় না। কোনো কোনো শহরে তুলনামূলকভাবে ভালো আয় থাকলেও বাড়ি ও শিশুর যত্নের খরচ এত বেশি যে পরিবারের হাতে অবশিষ্ট অর্থ খুব সামান্যই থাকে।
উদাহরণ হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ার সান হোসে শহরের কথা বলা যায়। সেখানে একটি পরিবারের মধ্যম বার্ষিক আয় প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪০১ ডলার হলেও বাসস্থান ও শিশুর যত্ন মিলিয়ে আয়ের ৮৩ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হয়। অর্থাৎ আয় বেশি হলেই যে পরিবার আর্থিকভাবে স্বস্তিতে থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
তুলনামূলক স্বস্তিতে লিটল রক
তালিকার অন্য প্রান্তে রয়েছে আরকানসাসের লিটল রক। সেখানে বাসস্থান ও শিশুর যত্নের সম্মিলিত ব্যয় পরিবারের আয়ের ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ। শিশুর যত্নে বছরে মধ্যম ব্যয় ৯ হাজার ৬১২ ডলার এবং বাসস্থানে ১৯ হাজার ৫৩৯ ডলার। শহরটির মধ্যম বার্ষিক পারিবারিক আয় ৭৩ হাজার ১৭০ ডলার।
তুলনামূলক কম ব্যয়ের শহরগুলোর তালিকায় এরপর রয়েছে ওকলাহোমা সিটি, যেখানে পরিবারের আয়ের ৪০ দশমিক ৮ শতাংশ বাসস্থান ও শিশুর যত্নে ব্যয় হয়। ডেস মইনসে এই হার ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ। ওয়ারেনে ৪২ দশমিক ২ শতাংশ, সেন্ট লুইসে ৪২ দশমিক ২ শতাংশ এবং ব্যাটন রুজে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ।
এ ছাড়া অ্যাক্রনে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ, তুলসায় ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ, লুইসভিলে ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ডেটনে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ আয় বাসস্থান ও শিশুর যত্নে চলে যায়।
বিপরীত চিত্র লস অ্যাঞ্জেলেসে
তালিকার সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর লস অ্যাঞ্জেলেস। সেখানে একটি পরিবারের আয়ের ৯৬ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাসস্থান ও শিশুর যত্নের খরচে চলে যেতে পারে। শিশুর যত্নে মধ্যম বার্ষিক ব্যয় ২২ হাজার ৬৫৬ ডলার এবং বাসস্থানে ৭১ হাজার ৯৫৭ ডলার। অথচ পরিবারের মধ্যম বার্ষিক আয় ৯৭ হাজার ৭৭৫ ডলার।
অর্থাৎ হিসাবটি দাঁড়ায় খুবই কঠিন জায়গায়—একটি পরিবার সারা বছর যে আয় করে, তার প্রায় পুরোটাই যদি ঘর ও সন্তানের যত্নের পেছনে চলে যায়, তাহলে খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত, সঞ্চয় কিংবা জরুরি প্রয়োজনের জন্য অর্থ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
নিউইয়র্ক ও সান ফ্রান্সিসকোতেও চাপ তীব্র
লস অ্যাঞ্জেলেসের পর রয়েছে নিউইয়র্ক। সেখানে বাসস্থান ও শিশুর যত্নে পরিবারের আয়ের ৯৫ শতাংশ ব্যয় হয়। শিশুর যত্নে মধ্যম বার্ষিক ব্যয় ২৬ হাজার ৭৯৬ ডলার এবং বাসস্থানে ৬৬ হাজার ৬১৭ ডলার। পরিবারের মধ্যম বার্ষিক আয় ৯৮ হাজার ২৮৭ ডলার।
সান ফ্রান্সিসকোতে এই হার ৯৪ দশমিক ২ শতাংশ। সেখানে বাসস্থানের মধ্যম বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৭৮ ডলার এবং শিশুর যত্নে ২২ হাজার ৬৬৮ ডলার। পরিবারের মধ্যম আয় ১ লাখ ৬২ হাজার ১১৮ ডলার।
এর পরেই রয়েছে আনাহেইম। সেখানে বাসস্থান ও শিশুর যত্ন মিলিয়ে পরিবারের আয়ের ৯৩ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয় হয়।

সান দিয়েগো থেকে মিয়ামি—চাপের তালিকাও দীর্ঘ
সান দিয়েগোতে পরিবারের আয়ের ৮২ দশমিক ১ শতাংশ বাসস্থান ও শিশুর যত্নে চলে যায়। সান হোসেতে এই হার ৮৩ দশমিক ১ শতাংশ। অক্সনার্ডে ৭৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং স্প্রিংফিল্ডে ৭৫ দশমিক ৩ শতাংশ। মিয়ামিতেও একই হার ৭৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
রিভারসাইডে এই হার ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ের তালিকার শহরগুলোর সঙ্গে সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরগুলোর ব্যবধান অনেক বড়।
শুধু সস্তা বাড়ি দেখলেই হবে না
এই হিসাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কোনো শহরে বাড়ির দাম কম হলেই সেখানে পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় কম হবে, এমন নয়। শিশুর যত্নের খরচ অনেক সময় সেই সুবিধাকে মুছে দিতে পারে। আবার কোনো শহরে আয় বেশি হলেও বাসস্থান ও সন্তানের যত্নের ব্যয় এত বেশি হতে পারে যে পরিবারের আর্থিক স্বস্তি থাকে না।
তাই পরিবার গড়ার জন্য কোথায় বসতি স্থাপন করা হবে, সেই সিদ্ধান্তে শুধু বাড়ির দাম বা চাকরির বেতন দেখলে চলবে না। ঘরভাড়া বা বাড়ির খরচ, শিশুর যত্ন, পরিবারের আয় এবং দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য ব্যয়—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করাই বেশি বাস্তবসম্মত।
সন্তানকে ঘিরে একটি পরিবারের স্বপ্ন যত বড়ই হোক, সেই স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তব অর্থনীতির হিসাবটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক এই পরিসংখ্যান দেখিয়ে দিচ্ছে, কিছু শহরে সেই হিসাব সত্যিই বেশ কঠিন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















