ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সরবরাহের যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেখানে ভারতের বিপুল পরিমাণ রুশ অপরিশোধিত তেল কেনা এতদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য তৈরি করেছিল। কিন্তু এখন সেই সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। চীন রাশিয়া থেকে আরও বেশি তেল কেনার দিকে এগিয়ে যাওয়ায় ভারতের জন্য রুশ জ্বালানির আগের সরবরাহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। এর প্রভাব শুধু ভারতের পরিশোধনাগারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এশিয়ার পরিশোধিত জ্বালানি বাজারেও এর বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
চীনের বাড়তি চাহিদাই নতুন চাপের কেন্দ্র
পণ্যবাজার বিশ্লেষক কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, আগস্টে সমুদ্রপথে চীনের রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি দৈনিক প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলে দাঁড়াতে পারে। জুলাইয়ে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ লাখ ২৩ হাজার ব্যারেল। আগস্টের হিসাব জুলাইয়ের তুলনায় কিছুটা কম হলেও, এপ্রিলের পর এটি এখনো অন্যতম শক্তিশালী আমদানি প্রবাহ।
এর পেছনে বড় কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহে অনিশ্চয়তা। ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে চীনের পরিশোধনাগারগুলো বিকল্প উৎস খুঁজছে। সেই জায়গায় রুশ তেল স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
চীন দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ও ইরানের তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে এই দুই দেশ থেকে তেল কেনার সক্ষমতা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তাকে অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি নমনীয় করেছে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে ইরানি তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় রাশিয়ার ওপর চীনের নির্ভরতা আরও বাড়ছে।
মার্চে চীন দৈনিক প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছিল। কিন্তু জুন, জুলাই ও আগস্টে সেই প্রবাহ নেমে এসেছে আনুমানিক ৩ লাখ ৬১ হাজার, ৩ লাখ ২৯ হাজার এবং ৩ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে। অর্থাৎ কয়েক মাসের মধ্যেই ইরান থেকে চীনের তেলপ্রবাহ প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
রুশ তেলের একই উৎস নিয়ে ভারত-চীন প্রতিযোগিতা
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো রুশ তেলের উৎসভিত্তিক প্রতিযোগিতা। চীন সাধারণত রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বন্দর থেকে সমুদ্রপথে তেল সংগ্রহ করে, যেখানে প্রধানত ইএসপিও গ্রেডের তেল পাঠানো হয়। পাশাপাশি পাইপলাইনের মাধ্যমেও চীন প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে।
কিন্তু আগস্টে রাশিয়ার ইউরোপীয় বন্দরগুলো থেকে চীনের কেনা তেলের অংশ বেড়ে প্রায় ৩১ শতাংশে পৌঁছানোর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এখানেই ভারতের জন্য সমস্যাটি আরও স্পষ্ট।
ভারত সাধারণত রাশিয়ার ইউরোপীয় বন্দরগুলো থেকেই বড় অংশের অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করে। ফলে চীনের বাড়তি চাহিদা যদি ওই উৎসের দিকে সরে যায়, তাহলে ভারতকে একই পরিমাণ রুশ তেল পেতে আরও কঠিন প্রতিযোগিতায় পড়তে হবে।
ভারতের আমদানিতে ইতিমধ্যেই ধাক্কা
কেপলারের অনুমান অনুযায়ী, আগস্টে ভারতের রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি দৈনিক প্রায় ১৮ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেলে নেমে আসতে পারে। জুলাইয়ে যা ছিল ২৭ লাখ ৯০ হাজার এবং জুনে ২৭ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের আমদানি প্রায় ৯ লাখ ব্যারেল দৈনিক কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আগস্টে ভারতের রুশ তেলের প্রায় ৯৭ শতাংশই রাশিয়ার ইউরোপীয় বন্দর থেকে আসছে। কিন্তু সেই বন্দরগুলোর সরবরাহও কমছে। আগস্টে সেখান থেকে ভারতের আমদানি আনুমানিক ১৮ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল দৈনিক—জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বা প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল কম।
এর প্রতিফলন ভারতের সামগ্রিক অপরিশোধিত তেল আমদানিতেও দেখা যাচ্ছে। আগস্টে ভারতের মোট আমদানি দৈনিক প্রায় ৪১ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল হতে পারে, যা ইরান যুদ্ধ শুরুর পর সর্বনিম্ন এবং জুলাইয়ের ৫০ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেলের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
অবশ্য মাস শেষ হওয়ার আগে আরও কার্গোর তথ্য যুক্ত হলে এই হিসাব কিছুটা সংশোধিত হতে পারে। তবু মূল প্রবণতাটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই—রুশ তেলের যে সরবরাহ ভারতের শোধনাগারগুলোকে এতদিন শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছিল, তার একটি অংশ এখন চীনের দিকে চলে যাচ্ছে।
ভারতের সমস্যা এশিয়ার বাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ভারতের পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিতে। ভারত শুধু বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক নয়, একই সঙ্গে এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ডিজেল ও পেট্রল রপ্তানিকারকও।
আগস্টে ভারতের হালকা ও মধ্যম শ্রেণির পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি দৈনিক প্রায় ১২ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল হতে পারে। জুলাইয়ের সঙ্গে এটি প্রায় একই এবং গত বছরের সেপ্টেম্বরের পর সবচেয়ে শক্তিশালী দুই মাসের একটি।

কিন্তু পরিশোধনাগারগুলো যদি সেপ্টেম্বর থেকে পর্যাপ্ত অপরিশোধিত তেল না পায়, তাহলে এই রপ্তানি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। রুশ তেলের ঘাটতি যদি ভারতীয় জ্বালানি উৎপাদনে প্রভাব ফেলে, তবে তার প্রভাব দ্রুত এশিয়ার বাজারে ছড়িয়ে পড়বে।
এখানেই বর্তমান তেল সংকটের প্রকৃত ঝুঁকি। অপরিশোধিত তেলের জন্য চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতা কেবল দুই দেশের আমদানি পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এশিয়ার ডিজেল ও পেট্রলের সরবরাহ, শিল্পের খরচ এবং ভোক্তা পর্যায়ের জ্বালানি মূল্য।
যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক প্রবাহ ইতিমধ্যেই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাহ কিছুটা ফিরলেও তা এখনো যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
এই পরিস্থিতিতে রুশ তেলের প্রবাহ নিয়ে চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতা যদি আরও তীব্র হয়, তাহলে এশিয়ার জ্বালানি বাজারে সরবরাহের চাপ বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভারতের শোধনাগারগুলো সেপ্টেম্বর থেকে যদি কম অপরিশোধিত তেল পায় এবং তার ফল হিসেবে জ্বালানি রপ্তানি কমে যায়, তাহলে সংকটের পরবর্তী ধাপটি আর শুধু ভারতের সমস্যা থাকবে না। তা হয়ে উঠবে গোটা এশিয়ার জ্বালানি বাজারের সমস্যা।
ক্লাইড রাসেল 


















