বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মডেল যতই শক্তিশালী হোক, সেগুলো মানুষের মতো চেতনা অর্জন করতে পারবে কি না—এ নিয়ে বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের মধ্যে বিতর্ক চলছে। কারও মতে, বর্তমান এআইয়ের প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো এতে জীবন্ত জৈব উপাদান নেই। অন্যদের ধারণা, সমস্যাটি এর কম্পিউটিং কাঠামোর মধ্যেই নিহিত। তবে ভবিষ্যতে জীবন্ত কোষ কিংবা মানুষের মস্তিষ্কের কাছাকাছি কাঠামোয় তৈরি এআই চেতনার দিকে এগোতে পারে বলে মনে করছেন কিছু গবেষক।
মস্তিষ্কের মতো কম্পিউটিংয়ের খোঁজ
আধুনিক কম্পিউটারের মূল নকশা ১৯৪৫ সালে হাঙ্গেরীয় বহুমুখী প্রতিভা জন ভন নিউম্যানের ধারণার ওপর গড়ে ওঠে। এই কাঠামোয় হিসাব করার জন্য প্রসেসিং ইউনিট এবং তথ্য ও নির্দেশনা সংরক্ষণের জন্য আলাদা মেমোরি ইউনিট থাকে। ফলে তথ্যকে দুই ইউনিটের মধ্যে বারবার চলাচল করতে হয়। বিশেষ করে এআইয়ের বিপুল পরিমাণ গণনায় এতে প্রচুর শক্তি খরচ হয়।
মানুষের মস্তিষ্কে বিষয়টি ভিন্ন। নিউরন একই জায়গায় তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ—দুই কাজই করতে পারে। এ কারণে বিপুল সংখ্যক নিউরনের সমন্বিত নেটওয়ার্ক প্রচলিত ডিজিটাল কম্পিউটারের তুলনায় অনেক বেশি শক্তি-সাশ্রয়ী। একটি সাধারণ মানবমস্তিষ্ক প্রায় ২০ ওয়াট শক্তি ব্যবহার করে। বিপরীতে সমপরিমাণ সমান্তরাল হিসাব চালাতে সক্ষম কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক পরিচালনায় প্রয়োজন হতে পারে লাখ লাখ ওয়াট শক্তি খরচ করা ডেটা সেন্টার।
নিউরোমরফিক কম্পিউটিংয়ে নতুন সম্ভাবনা
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে ‘নিউরোমরফিক’ কম্পিউটিং নিয়ে গবেষণা চলছে। এর লক্ষ্য হলো মানুষের মস্তিষ্কের মতো কাঠামো তৈরি করে আরও দক্ষভাবে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করা। এ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে মেমরিস্টর—এমন এক ধরনের যন্ত্র, যার বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা ভোল্টেজ প্রয়োগের পর পরিবর্তিত হয় এবং ভোল্টেজ সরিয়ে নেওয়ার পরও সেই পরিবর্তন ধরে রাখে। ফলে একই জায়গায় তথ্য সংরক্ষণ ও হিসাব করা সম্ভব হয়।
দার্শনিকদের একটি অংশ মনে করেন, শুধু দ্রুত বা শক্তিশালী গণনা করলেই মেশিন সচেতন হয়ে উঠবে না। বরং কম্পিউটার কীভাবে ‘চিন্তা’ করে, সেটিই হয়তো চেতনা তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সিলিকনে জীবন্ত নিউরন
আরও এক ধাপ এগিয়ে বাস্তব মানব মস্তিষ্কের কোষ ব্যবহার করে কম্পিউটার তৈরির পরীক্ষাও চলছে। অস্ট্রেলিয়ার স্টার্টআপ কোর্টিক্যাল ল্যাবস দান করা স্টেম সেল থেকে তৈরি কয়েক লাখ মানব নিউরন সিলিকনের ওপর বসিয়ে একটি ‘জৈব কম্পিউটার’ তৈরি করেছে। এই কম্পিউটারকে প্রথমে ‘পং’ নামের সহজ ভিডিও গেম এবং পরবর্তী সংস্করণে ‘ডুম’ খেলতে শেখানো হয়েছে।
ভবিষ্যতে গবেষণার আরেকটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র হলো নিউরাল অর্গানয়েড—গবেষণাগারে তৈরি মস্তিষ্কের কোষের ত্রিমাত্রিক সমষ্টি। বর্তমানে এগুলো মূলত মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ও আচরণ বোঝার গবেষণায় ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে একদিন এগুলোকে গণনার কাজেও ব্যবহার করা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সচেতন মেশিনের পথে কতটা এগোনো সম্ভব
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের দার্শনিক পিটার গডফ্রে-স্মিথের মতে, বর্তমানে গবেষণাগারে তৈরি সবচেয়ে বড় অর্গানয়েডে মৌমাছির মস্তিষ্কের চেয়েও বেশি কোষ রয়েছে। এগুলোতে চেতনা বিকাশের সম্ভাবনা থাকতে পারে, যদিও এখনো সেগুলোর কোষগুলো প্রয়োজনীয় সংগঠনে বিন্যস্ত নয়।
সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী অনিল শেঠ মনে করেন, শুধু অত্যন্ত দক্ষভাবে নির্মিত সিলিকনভিত্তিক ব্যবস্থা সম্ভবত নিজে থেকে চেতনা অর্জন করবে না। তবে কোনো এআই ব্যবস্থা যদি ধীরে ধীরে মানুষের মস্তিষ্কের আরও বেশি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, তাহলে সেটি সচেতন হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতার মাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে।
Sarakhon Report 


















