বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলায় আশাব্যঞ্জক খবর খুব বেশি নেই। তবে আকাশপথে এমন একটি সুযোগের সন্ধান মিলেছে, যা কার্যকর হলে বিমান চলাচলের জলবায়ু প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে। ব্রিটেনের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ন্যাটস ও জলবায়ু নিয়ে গবেষণাকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ‘অপারেশন ব্লু স্কাইস’ নামে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা শুরু করেছে।
দুই শীত মৌসুমজুড়ে চলবে পরীক্ষা
১৮ আগস্ট ঘোষণা করা এই গবেষণার আওতায় আগামী দুই শীত মৌসুমে উত্তর আটলান্টিকের বিস্তৃত আকাশসীমায় পরীক্ষা চালানো হবে। লক্ষ্য হলো বিমানের তৈরি দীর্ঘস্থায়ী মেঘের রেখা, যাকে কনট্রেইল বলা হয়, তার সংখ্যা কমানো। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী কনট্রেইল জলবায়ুর ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে বলে গবেষণাটির মূল নজর সেদিকেই।
পরীক্ষাটি সফল হলে একই ধরনের কৌশল বিশ্বজুড়ে প্রয়োগ করে বিমান ভ্রমণের জলবায়ুগত প্রভাব অর্ধেক পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কনট্রেইল কেন উষ্ণায়ন বাড়ায়
বিমানের পেছনে তৈরি সরু মেঘের রেখা অনেক সময় ধীরে ধীরে সাইরাস মেঘে পরিণত হয়। সূর্যালোকের কিছু অংশ প্রতিফলিত করে এসব মেঘ সামান্য শীতল প্রভাব তৈরি করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা পৃথিবী থেকে মহাশূন্যের দিকে বেরিয়ে যেতে থাকা অবলোহিত বিকিরণের কিছু অংশ আটকে দেয়। ফলে বায়ুমণ্ডলে তাপ ধরে রাখার প্রবণতা বাড়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সব কনট্রেইল ও সেগুলো থেকে তৈরি সাইরাস মেঘের সম্মিলিত উষ্ণায়ন প্রভাব গড়ে তাদের শীতল করার প্রভাবের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে জলবায়ুর দৃষ্টিকোণ থেকে কনট্রেইলকে মূলত ক্ষতিকর হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
সামান্য উচ্চতা পরিবর্তনেই বড় প্রভাব
গবেষণাটির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দীর্ঘস্থায়ী কনট্রেইল এড়াতে বিমানের পথ খুব বেশি বদলানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে। এ ধরনের কনট্রেইল সাধারণত ‘আইস-সুপারস্যাচুরেটেড রিজিয়ন’ বা অতিরিক্ত বরফ-সম্পৃক্ত অঞ্চলে তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিমানকে সামান্য নিচু দিয়ে উড়ালেই এসব অঞ্চল এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হতে পারে।
অপারেশন ব্লু স্কাইস পরীক্ষা করবে, এই অঞ্চলগুলো কতটা নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেওয়া যায়, সামান্য উচ্চতা পরিবর্তন কতটা কার্যকর এবং নিরাপদভাবে এসব পরিবর্তন বিমান সংস্থা ও এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নিয়মিত কার্যক্রমে যুক্ত করা যায় কি না।
জ্বালানি খরচ বাড়বে, তবে খুব সামান্য
বিমানের উচ্চতা কমালে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা কিছুটা কমে। তবে প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় মোট ফ্লাইটের মাত্র ৫ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চতা পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। এতে জেট জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ ২ শতাংশেরও কম বাড়তে পারে।
তবে এই সামান্য অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ও বিমান সংস্থাগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কনট্রেইল কমানোর জন্য কার্বন বাজারের সঙ্গে এর সুবিধা-অসুবিধা যুক্ত করার প্রস্তাব উঠলেও বিষয়টি জটিল। কারণ নির্দিষ্ট একটি কনট্রেইল কতটা উষ্ণায়ন ঘটায়, তা অনেক সময় নির্ভুলভাবে হিসাব করা কঠিন।
সহজ পথ হতে পারে আকাশপথ ব্যবস্থাপনা
কনট্রেইল এড়ানোর কৌশল কার্যকর প্রমাণিত হলে জটিল বাজারব্যবস্থার বদলে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রকদের মাধ্যমে নিরাপদ ও সম্ভব এমন রুট নির্ধারণ করাই সহজ সমাধান হতে পারে। কোনো বিমান সংস্থা নির্দিষ্ট রুট এড়িয়ে গেলে অন্য সংস্থা সেই রুট ব্যবহার করতে পারে।
এর পাশাপাশি আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় নতুন প্রযুক্তি ও পদ্ধতির ব্যবহার বাড়লে বিমানশিল্প একই সঙ্গে কম দূষণকারী এবং আরও দক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















