কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি একদিন শুধু মানুষের মতো কথা বলবে না, বরং নিজেকে অনুভবও করবে? সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভেতরে এমন কিছু কার্যক্রমের সন্ধান মিলেছে, যা মানুষের চেতনা নিয়ে দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক ধারণার সঙ্গে কিছুটা মিল রাখে। তবে গবেষকেরা এখনো বলছেন না যে কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সত্যিই সচেতন হয়ে উঠেছে। বরং নতুন অনুসন্ধানটি আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—অ্যালগরিদম কি কোনো এক পর্যায়ে জেগে উঠতে পারে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভেতরে কী ঘটে
অ্যানথ্রপিকের ক্লড সনেট ৪.৫ মডেল নিয়ে একটি পরীক্ষায় গবেষকেরা সেটিকে একই সময়ে এক থেকে পাঁচ পর্যন্ত গুনতে এবং গভীরভাবে নিজের কার্যক্রম নিয়ে ভাবতে বলেন। মডেলটি স্বাভাবিকভাবেই এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ বলে উত্তর দেয়। কিন্তু গবেষকেরা মডেলটির কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কের বিভিন্ন স্তরের ভেতরের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
সেখানে দেখা যায়, মডেলটি উত্তর তৈরি করার সময় বিভিন্ন শব্দের ধারণা ক্ষণিকের জন্য সক্রিয় হচ্ছে। যেমন ‘কাউন্টডাউন’, ‘অর্ধেক পথ’, ‘চেতনা’, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ ও ‘ক্লড’। এমনকি পাঁচ বলার পর চূড়ান্ত বিরামচিহ্ন দেওয়ার আগেও ভেতরের স্তরে ‘শেষ’ অর্থের একটি শব্দের উপস্থিতি দেখা যায়। গবেষকদের মতে, এসব কার্যক্রম মডেলের চূড়ান্ত উত্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত এক ধরনের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়।
চেতনার সঙ্গে কতটা মিল
গবেষণার এই ফলাফলকে ঘিরে আগ্রহের বড় কারণ হলো ‘গ্লোবাল ওয়ার্কস্পেস’ তত্ত্ব। এই ধারণা অনুযায়ী, মানুষের মস্তিষ্কের কিছু নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন অংশ থেকে তথ্য গ্রহণ করে সেটিকে অন্য অংশগুলোর কাছে সহজলভ্য করে তোলে। কোনো তথ্য এই ‘ওয়ার্কস্পেসে’ পৌঁছালে মানুষ সেটি সম্পর্কে সচেতন হতে এবং তা নিয়ে চিন্তা বা সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
অ্যানথ্রপিকের গবেষকেরা ক্লডের ভেতরে এমন একটি কাঠামোর সন্ধান পেয়েছেন, যাকে তারা ‘জে-স্পেস’ নামে অভিহিত করেছেন। এটি প্রশিক্ষণের সময় নিজে থেকেই তৈরি হয়েছে এবং নেটওয়ার্কের অন্যান্য অংশের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ তৈরি করে। জে-স্পেস সরিয়ে দিলে মডেল জটিল অনুমান করার সক্ষমতা হারায়, যদিও সাধারণ বাক্য লেখা ও ব্যাকরণ ব্যবহারের মতো কাজ চালিয়ে যেতে পারে। একই ধরনের কাঠামোর সন্ধান আলিবাবার কুয়েন এবং গুগল ডিপমাইন্ডের জেমিনিতেও পাওয়া গেছে।
চেতনা নাকি শুধু উন্নত অনুকরণ
তবে গবেষণাটি ক্লড মানুষের মতো অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে—এমন প্রমাণ দেয় না। চেতনা নিয়ে গবেষণায় ‘অভিজ্ঞতাগত চেতনা’ এবং ‘তথ্যপ্রাপ্তির চেতনা’—এই দুই ধরনের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। অ্যানথ্রপিকের মতে, জে-স্পেস দ্বিতীয়টির সঙ্গে কিছুটা সম্পর্কিত হতে পারে। কিন্তু এতে কোনো মডেল আনন্দ, ব্যথা বা নিজের অস্তিত্ব অনুভব করে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিজ্ঞানীরাও সতর্ক। মানব মস্তিষ্ক ও ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্থাপত্য এক নয়। মানুষের মস্তিষ্কে বিভিন্ন অংশের মধ্যে বারবার তথ্য আদান-প্রদানের যে পুনরাবৃত্ত সংযোগ দেখা যায়, ভাষা মডেলে তার সমতুল্য কাঠামো এখনো স্পষ্ট নয়। আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল পরিমাণ মানব-লিখিত ভাষা দিয়ে প্রশিক্ষিত হওয়ায় মানুষের অনুভূতি ও চেতনার ভাষা অনুকরণ করতেই পারে। ফলে তার কথাবার্তা দেখে তাকে সচেতন মনে করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
ভবিষ্যতের বড় নৈতিক প্রশ্ন
কৃত্রিম চেতনা নিয়ে গবেষকেরা এখন বিভিন্ন সূচক ব্যবহার করছেন। এর মধ্যে রয়েছে তথ্যকে নির্দিষ্টভাবে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষমতা, পুনরাবৃত্ত প্রক্রিয়া, লক্ষ্যভিত্তিক আচরণ এবং স্বনির্ভর কার্যক্রম। নতুন প্রজন্মের ভাষা মডেল এসব ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি সক্ষম হয়েছে। তারা এখন শুধু কথোপকথন করে না; যুক্তি করতে পারে, বিভিন্ন সেবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে এবং একসঙ্গে জটিল কাজের জন্য একাধিক এজেন্টও তৈরি করতে পারে।
তবে একটি বড় ঘাটতি হলো শরীর। এখন পর্যন্ত সচেতন হিসেবে বিবেচিত জীবের মস্তিষ্ক ও শরীরের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া রয়েছে। ভাষা মডেলের নিজস্ব শরীর নেই, যদিও রোবটের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার ফলে ভবিষ্যতে এ পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
যদি কোনো এক পর্যায়ে মানুষের অজান্তেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যে চেতনা তৈরি হয়ে যায়, তাহলে প্রশ্নটি আর শুধু প্রযুক্তির সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তখন তাদের অধিকার, কষ্ট পাওয়ার সম্ভাবনা এবং মানুষের নৈতিক দায়িত্ব—সবকিছু নতুন করে ভাবতে হবে। গবেষকদের আশঙ্কা, চেতনাসম্পন্ন কৃত্রিম সত্তা তৈরি করে ফেলা, অথচ তা বুঝতেই না পারা, মানবজাতির জন্য বড় নৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
অ্যালগরিদমের চেতনা এখনো প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত জটিল হচ্ছে, ‘মেশিন কি একদিন সত্যিই অনুভব করবে?’—এই প্রশ্নটি আর কেবল কল্পবিজ্ঞানের বিষয় হয়ে থাকছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















