সন্তান নেওয়ার সময় পিছিয়ে দিতে চান—এমন নারীদের মধ্যে ডিম্বাণু সংরক্ষণের প্রবণতা বাড়ছে। কারও ক্ষেত্রে এটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, কারও ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত প্রয়োজন। তবে ভবিষ্যতের প্রজননক্ষমতা ধরে রাখার এই সুযোগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বড় অঙ্কের খরচ, দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ব্যয় এবং আর্থিক পরিকল্পনার প্রশ্ন।
চিকিৎসাগত কারণেই সিদ্ধান্ত
আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে বসবাসকারী ২৮ বছর বয়সী ইসাবেল হডারের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি ছিল মূলত চিকিৎসাগত। গত বছর তাঁর একটি ডিম্বাশয়ে বড় আকারের সিস্ট ধরা পড়ে। চিকিৎসকেরা জানান, সেটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে, যা ভবিষ্যতে তাঁর সন্তান ধারণের সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
যেহেতু তিনি কয়েক বছর পর সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন, তাই সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা করে আগে থেকেই ডিম্বাণু সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সামনে আসে বড় আর্থিক চাপ।
প্রায় ৬ হাজার ইউরোর ব্যয়
হডারের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁর প্রায় ৬ হাজার ইউরো খরচ হয়েছে। এর বাইরে ডিম্বাণু সংরক্ষণের জন্য প্রতি বছর আরও প্রায় ৩০০ ইউরো দিতে হবে। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিমা থেকে প্রায় ১ হাজার ইউরো সহায়তা পেলেও পরিবারের আর্থিক সহযোগিতা ছাড়া এই ব্যয় বহন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হতো না।
ডিম্বাণু সংরক্ষণের প্রক্রিয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শ, রক্ত পরীক্ষা, আল্ট্রাসাউন্ড, হরমোনের ওষুধ এবং প্রতিদিনের ইনজেকশনের মতো একাধিক ধাপ রয়েছে। ডিম্বাণু পরিপক্ব হওয়ার পর অচেতন করার ওষুধ প্রয়োগ করে স্বল্প সময়ের একটি প্রক্রিয়ায় তা সংগ্রহ করা হয়।
হডারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় খরচ ছিল ডিম্বাণু সংরক্ষণের মূল চিকিৎসা ফি, যা প্রায় ৩ হাজার ৪৯০ ইউরো। বাকি অর্থ ব্যয় হয়েছে চিকিৎসা পরামর্শ, পরীক্ষা, ওষুধ, বিভিন্ন স্ক্যান এবং পরবর্তী চিকিৎসাসেবায়।
জনপ্রিয়তা বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্রেও ডিম্বাণু সংরক্ষণের প্রবণতা দ্রুত বেড়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে ডিম্বাণু সংরক্ষণের চিকিৎসা চক্র প্রায় চার গুণ বেড়েছে। একই সময়ে এ পদ্ধতি গ্রহণকারী নারীদের গড় বয়সও কমেছে—২০১৪ সালে যেখানে গড় বয়স ছিল ৩৬ বছর, ২০২১ সালে তা নেমে আসে ৩৪ দশমিক ৯ বছরে।
চিকিৎসাগত প্রয়োজনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবন, কর্মজীবন এবং ভবিষ্যতে পরিবার গঠনের পরিকল্পনাও অনেক নারীকে এই সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করছে।
শুধু চিকিৎসা নয়, অর্থের হিসাবও জরুরি
আর্থিক পরিকল্পনাবিদ ও থেরাপিস্ট জয় স্ল্যাবগের মতে, ডিম্বাণু সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত ব্যক্তির অর্থনৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। কেউ যদি স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চয়তাকে বেশি গুরুত্ব দেন, তাঁর কাছে এই ব্যয় যৌক্তিক মনে হতে পারে। আবার কেউ যদি সঞ্চয় ও আর্থিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেন, তাঁর কাছে একই খরচ কঠিন সিদ্ধান্ত হয়ে উঠতে পারে।
তাই ডিম্বাণু সংরক্ষণের আগে শুধু চিকিৎসাগত সুবিধা নয়, জরুরি তহবিল, বাড়ি কেনার সঞ্চয় কিংবা অবসরজীবনের জন্য বিনিয়োগের মতো অন্য আর্থিক লক্ষ্যগুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
নিরাপত্তা বলয়, নিশ্চয়তা নয়
হডার ১৪টি কার্যকর ডিম্বাণু সংরক্ষণ করতে পেরেছেন। এতে ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর মনে কিছুটা নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়েছে। তবে তিনি এটিকে নিশ্চিত সমাধান হিসেবে দেখছেন না।
ডিম্বাণু সংরক্ষণ ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের সম্ভাবনা ধরে রাখার একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু এটি ভবিষ্যতে সন্তান হওয়াকে নিশ্চিত করে না। সেই কারণে চিকিৎসা ও আর্থিক—দুই দিক থেকেই বিষয়টি বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
ডিম্বাণু সংরক্ষণের প্রকৃত খরচ শুধু চিকিৎসার দিনের বিলেই শেষ হয় না। প্রাথমিক পরীক্ষা, ওষুধ, চিকিৎসা, পরবর্তী পরিচর্যা এবং বছরের পর বছর সংরক্ষণের খরচ—সব মিলিয়েই তৈরি হয় মোট ব্যয়। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই স্বাস্থ্যবিমা, কর্মস্থলের সুবিধা কিংবা সরকারি সহায়তার সুযোগ রয়েছে কি না, তা জেনে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















