প্যারিসের প্রযুক্তি উদ্যোক্তা গিয়োম মেয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টায় তৈরি করেছিলেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি লেখায় থাকা অদৃশ্য জলছাপ শনাক্ত ও তা ভেঙে দেওয়ার একটি মুক্ত উৎসের সরঞ্জাম। কিন্তু প্রকাশের পর সেটি যে এত দ্রুত বিশ্বজুড়ে আলোচনায় চলে আসবে, তা তিনি নিজেও ভাবেননি।
মেয়ার প্রযুক্তি খাতে দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি লেখা শনাক্ত করতে অ্যানথ্রপিক অদৃশ্য জলছাপ ব্যবহারের ঘোষণা দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর জলছাপটি কীভাবে কাজ করে এবং তা সরানো সম্ভব কি না, তা পরীক্ষা করতে নিজের সরঞ্জাম তৈরির সিদ্ধান্ত নেন।
পাঁচ ঘণ্টায় তৈরি, কয়েক দিনেই বিশ্বজুড়ে আলোচনায়
মেয়ারের দাবি, প্রথম সংস্করণ তৈরি করতে তাঁর প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। ১১ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকল্পটি নিয়ে দ্বিতীয়বার পোস্ট করার পর সেটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই পোস্টটি ২০ লাখের বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়। পরে পেশাজীবীদের যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মেও প্রকল্পটি ছড়িয়ে পড়ে।
হঠাৎ বিপুল সাড়া পাওয়ায় মেয়ারকে এমনকি মানুষের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য নতুন নতুন হিসাবও খুলতে হয়েছে। তিনি বলেন, এতটা প্রচার ও মনোযোগের জন্য তিনি মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না।

জলছাপ নিয়ে কেন আপত্তি
মেয়ারের মূল আপত্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি লেখা শনাক্ত করার ধারণার বিরুদ্ধে নয়। তাঁর আপত্তি অ্যানথ্রপিক যে পরিসংখ্যানভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করছে, সেটির কার্যকারিতা ও সম্ভাব্য ভুল ফল নিয়ে।
তাঁর মতে, এ ধরনের পদ্ধতিতে ভুলভাবে কোনো মানব-লিখিত লেখাকেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বলে চিহ্নিত করার ঝুঁকি রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেন। ইংরেজি তাঁর মাতৃভাষা নয় বলে লেখার বানান ও ব্যাকরণ ঠিক করতে তিনি ব্যাকরণ সংশোধনকারী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেন। তাঁর আশঙ্কা, এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে তাঁর পুরো লেখাই ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
গবেষণাপত্রের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে তিনি মনে করেন। দীর্ঘ একটি গবেষণাপত্রের শেষ দিকে মাত্র একটি বাক্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সংশোধন করা হলেও পুরো লেখায় জলছাপ থাকার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
কীভাবে কাজ করে সরঞ্জামটি
মেয়ারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, লেখার জলছাপ মূলত শব্দ ব্যবহারের পরিসংখ্যানগত ধরন বা বিন্যাসের ওপর নির্ভর করে। তাঁর তৈরি সরঞ্জাম প্রথমে লেখায় জলছাপ আছে কি না তা পরীক্ষা করে। এরপর অর্থ অপরিবর্তিত রেখে লেখায় সামান্য পরিবর্তন আনা হয় এবং আবার পরীক্ষা করা হয়। জলছাপের সংকেত আর শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া পুনরাবৃত্তি করা হয়।
ছবির ক্ষেত্রেও একই ধরনের ধারণা প্রয়োগ করা যায় বলে তিনি জানান। সেখানে শব্দ পরিবর্তনের পরিবর্তে ছবির বিভিন্ন বিন্দু বা চিত্রাংশে সামান্য পরিবর্তন আনা হয়।
মুক্ত উৎস প্রকল্প থেকে সম্ভাব্য ব্যবসা
প্রকল্পটি দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এতে অবদান রাখতে শুরু করেছেন। মেয়ারও এখন সহযোগিতা পাচ্ছেন। তবে প্রথম কয়েক দিন তাঁর জন্য অত্যন্ত ব্যস্ত ছিল।
ভবিষ্যতে এটিকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করার কথাও ভাবছেন তিনি। তবে এর আইনগত দিক এবং ব্যবসায়িক কাঠামো কী হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাঁর মতে, সরঞ্জামটি প্রযুক্তিগতভাবে কিছুটা জটিল হওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য ব্যবহার সহজ করাও ভবিষ্যতের একটি বড় কাজ।

পরিচয় গোপন রাখা নিয়েও সতর্ক মেয়ার
মেয়ার জানান, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে তিনি বরাবরই সতর্ক। প্রকল্পটি ভাইরাল হওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক প্ল্যাটফর্মেই তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল না। তাই হঠাৎ বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও অনলাইন ব্যবহারকারীদের তাঁর তৈরি সরঞ্জাম নিয়ে আলোচনা করতে দেখে তিনি বেশ বিস্মিত হয়েছেন।
প্রকল্পটি নিয়ে অধিকাংশ প্রতিক্রিয়াই ইতিবাচক হলেও কিছু মানুষ তাঁকে সমালোচনা করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, জলছাপ সরানোর প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি বিষয়বস্তুর পরিচয় গোপন করতে পারে।
তবে মেয়ার স্পষ্ট করে বলেছেন, তাঁর উদ্দেশ্য পরিচয় জাল করা বা অন্যের লেখা চুরি করা নয়। তিনি মনে করেন, নিজের তৈরি বিষয়বস্তু এবং শিক্ষামূলক প্রয়োজনে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকা উচিত।
জলছাপ নিয়ে বড় বিতর্কের সূচনা
মেয়ারের মতে, তাঁর ছোট্ট মুক্ত উৎস প্রকল্পটি ভাইরাল হওয়ার ঘটনা আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জলছাপ নিয়ে মানুষের মধ্যে থাকা উদ্বেগেরই প্রতিফলন। তাঁর বিশ্বাস, প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করার আগে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন ছিল।
তিনি বলেন, বিষয়টি কেবল একটি সরঞ্জামকে ঘিরে নয়; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে কোনো লেখা বা ছবি মানুষের তৈরি, নাকি যন্ত্রের তৈরি—তা কীভাবে নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করা হবে, সেই বড় প্রশ্নের সঙ্গেও এটি জড়িত।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জলছাপ নিয়ে বিতর্ক যত বাড়ছে, মেয়ারও তত বেশি নিশ্চিত হচ্ছেন যে তাঁর কয়েক ঘণ্টার পরীক্ষামূলক প্রকল্পটি এখন আর নিছক একটি ছোট উদ্যোগ নয়; এটি প্রযুক্তি বিশ্বে একটি বড় আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















