যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা থেকে মাত্র ২০০ ডলারের একমুখী উড়োজাহাজের টিকিট কেটে পানামায় গিয়েছিলেন ক্রিস্টেন ক্রকেট। তখনও তিনি জানতেন না, সেই আকস্মিক ভ্রমণই তাঁর জীবনের বড় সিদ্ধান্তের পথ খুলে দেবে। পানামা শহরে গিয়ে দেশটির পরিবেশ, জীবনযাত্রা ও মানুষের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ৩৬ বছর বয়সী এই নারী।
ক্রকেটের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ডে। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি ওহাইও, নিউইয়র্ক, শার্লট ও আটলান্টায় বসবাস করেছেন। সন্তান বা স্বামী না থাকায় নিজের ইচ্ছামতো নতুন জায়গা ঘুরে দেখার সুযোগকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই একসময় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বসবাসের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখতে শুরু করেন।
হঠাৎ পানামার কথা মনে হলো
কোস্টারিকা, ব্রাজিল ও কলম্বিয়াসহ কয়েকটি দেশ তাঁর সম্ভাব্য গন্তব্যের তালিকায় ছিল। এমন সময় এক পরিচিত ব্যক্তি তাঁকে পানামার কথা বলেন। বিষয়টি নিয়ে সেদিন রাতেই খোঁজ নিতে শুরু করেন ক্রকেট।
পানামা শহরের ছবি ও তথ্য দেখে তিনি অবাক হয়ে যান। তিনি বুঝতে পারেন, এটি শুধু ছোট কোনো পর্যটনকেন্দ্র নয়; বরং আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি বড় শহর। আটলান্টা থেকে পানামার একমুখী উড়োজাহাজের টিকিটের দামও ছিল প্রায় ২০০ ডলার। তাই বেশি চিন্তা না করে সেদিন রাতেই টিকিট কিনে ফেলেন তিনি।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর ছিল পানামায় তাঁর প্রথম সফর। দেশটিতে পৌঁছেই তাঁর মনে হয়, জায়গাটি তাঁর জন্য বিশেষ কিছু বহন করছে। এরপর লাতিন আমেরিকার আরও কয়েকটি জায়গা ঘুরে দেখলেও পানামার মতো আর কোনো জায়গা তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তিনি আবার পানামায় ফিরে আসেন।
২০২৬ সালের মার্চে সেখানে স্থায়ীভাবে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন তিনি এবং বর্তমানে পানামা শহরকেই নিজের স্থায়ী আবাস হিসেবে দেখছেন।
দুই স্যুটকেসেই নতুন জীবন
আটলান্টা ছাড়ার সময় নিজের প্রায় সব জিনিসপত্র গুদামে রেখে যান ক্রকেট। সঙ্গে নিয়েছিলেন মাত্র দুটি স্যুটকেস। তাঁর মতে, অপ্রয়োজনীয় জিনিসের প্রতি আসক্তি কমিয়ে ফেলতে পারায় নতুন দেশে যাওয়ার বিষয়টি তাঁর জন্য অনেক সহজ হয়েছে।
পানামায় অনেক বাসাই আসবাবপত্রসহ ভাড়া পাওয়া যায়। ফলে তাঁকে আসবাব বা গাড়ি পাঠানোর ঝামেলায় পড়তে হয়নি। বরং নিজের গাড়িটি বিক্রি করেই দেশ ছেড়েছেন তিনি।
জীবনযাত্রার ব্যয়ের পার্থক্যও তাঁর কাছে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বড় একটি দোকান থেকে এক সপ্তাহের খাবার কিনতে প্রায় ৫০০ ডলার খরচ হলেও পানামায় ৭০ থেকে ৮০ ডলারেই এক সপ্তাহের বাজার হয়ে যায় এবং কিছু খাবার বাড়তিও থাকে।
বাড়িভাড়ার ক্ষেত্রেও তিনি বড় পার্থক্য দেখেছেন। আটলান্টায় তাঁর বর্তমান পানামার বাসার মতো একটি বাসা ভাড়া নিতে মাসে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার ডলার লাগতে পারে। অথচ পানামা শহরে একই ধরনের বাসার জন্য তাঁর খরচ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৫০ ডলার। তিনি অবশ্য স্বীকার করেছেন, এটি পানামার তুলনামূলক ব্যয়বহুল ভবনগুলোর একটি।
অর্থের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে মানুষের সম্পর্ক
ক্রকেটের কাছে পানামার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় শুধু কম খরচে জীবনযাপন নয়। বরং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সামাজিক বন্ধন তাঁকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পানামার সংস্কৃতিতে মানুষ একে অন্যকে সহযোগিতা করতে আগ্রহী। কেউ পথ হারিয়ে ফেললে বা সমস্যায় পড়লে অপরিচিত মানুষও এগিয়ে আসে। কারও সাহায্যের প্রয়োজন হলে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়েও খোঁজ নেওয়ার মতো আন্তরিকতা তিনি সেখানে দেখেছেন।
এই সামাজিক উষ্ণতাই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সময় তিনি অনেকটা হারিয়ে ফেলেছিলেন বলে মনে করেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে মানুষ জীবিকা, অর্থ উপার্জন ও কেনাকাটার প্রতিযোগিতায় এতটাই ব্যস্ত যে পারস্পরিক সহানুভূতি ও বিনয় অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে গেছে।
পানামায় মানুষের মধ্যে সেই চাপ তিনি তুলনামূলকভাবে কম অনুভব করেন। কাজের চাপ ও আর্থিক সমস্যা সেখানেও আছে, কিন্তু সামগ্রিক পরিবেশে তাঁর কাছে জীবন অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক মনে হয়েছে।
একা নারীর কাছেও নিরাপদ মনে হয়েছে শহরটি
একজন একা নারী হিসেবে পানামায় যাওয়ার আগে নিরাপত্তা নিয়েও তাঁর কিছুটা উদ্বেগ ছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে রাতে নারীদের একা হাঁটতে দেখা, কুকুর নিয়ে বাইরে বের হওয়া কিংবা হাতে মুঠোফোন নিয়ে নিশ্চিন্তে চলাফেরা করা তাঁর মনে নিরাপত্তার ধারণা তৈরি করে।
শহরটি সম্পর্কে ধীরে ধীরে জানার পর তাঁর সেই ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছে। তিনি বলেন, এমন পরিবেশে বসবাস করা শান্তির অনুভূতি দেয়, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে কোনো বিপদের আশঙ্কা করতে হয় না।

তবে তাঁর অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত। পানামার সব এলাকা বা সব মানুষের জন্য একই ধরনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রযোজ্য—এমন দাবি তিনি করেননি।
এবার পানামাই তাঁর ঘর
পানামাকে এখন নিজের ভ্রমণের স্থায়ী ঘাঁটি হিসেবে দেখছেন ক্রকেট। এখান থেকে তিনি ভবিষ্যতেও বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করতে চান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফিরে আসার জায়গা হিসেবে পানামাকেই বেছে নিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা গুয়াম থেকে যারা পানামায় এসে বসবাস শুরু করেছেন, তাঁদের অনেকের কাছ থেকেই তিনি একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা শুনেছেন বলে জানান। তাঁর মতে, দেশটির মানুষের উষ্ণতা ও আন্তরিকতা নতুন বাসিন্দাদের এমন একটি অনুভূতি দেয়, যেন জায়গাটি সত্যিই তাদের আপন করে নিয়েছে।
তাই ২০০ ডলারের আকস্মিক সেই উড়োজাহাজযাত্রা শেষ পর্যন্ত ক্রকেটের জীবনের স্থায়ী ঠিকানা বদলে দিয়েছে। ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাওয়া পানামাই এখন তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে নিজের ঘর।
পানামায় কম জীবনযাত্রার ব্যয়, মানুষের আন্তরিকতা ও সামাজিক বন্ধনই ক্রকেটকে সেখানে স্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত নিতে সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















