সন্তান যখন বড় হয়ে নিজের জীবন নিয়ে এগিয়ে যায়, তখন অনেক বাবা-মায়ের মনে একটি অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা থেকে যায়—একদিন সন্তান হয়তো বলবে, ‘তুমি খারাপ বাবা-মা ছিলে না, তুমি তোমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলে।’ কিন্তু সেই স্বীকৃতি সবসময় পাওয়া যায় না। কখনো সন্তান কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেও পরবর্তী কোনো বিরোধ, দূরত্ব বা নীরবতা সেই কথাগুলোকে যেন মুছে দেয়। তখন বাবা-মা আবারও নিজেদের ভালোবাসা ও ত্যাগের প্রমাণ দিতে শুরু করেন।
পরিবারের আদালতে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা
অনেক বাবা-মা প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের কাছে বারবার ব্যাখ্যা দিতে থাকেন—তারা কেন বেশি কাজ করেছেন, দাম্পত্য জীবনে কী কী সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছেন কিংবা সন্তানের জন্য বছরের পর বছর কত কিছু করেছেন। উদ্দেশ্য থাকে একটাই, সন্তান যেন পুরো ঘটনাপ্রবাহ বুঝতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত বাবা-মাকে ক্ষমা করে।
কিন্তু এই ধরনের আত্মপক্ষসমর্থন অনেক সময় উল্টো সম্পর্কের দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। কারণ এতে বর্তমান সম্পর্কটি বারবার অতীতের ভুলের বিচারসভায় ফিরে যায়। বাবা-মায়ের মনে থাকে, ‘সন্তান যদি পুরো ঘটনাটি বুঝতে পারে, তাহলে হয়তো আমরা সবকিছু পেছনে ফেলে নতুনভাবে শুরু করতে পারব।’ অথচ অতীতের হিসাব-নিকাশ নিয়েই কথাবার্তা চলতে থাকলে নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ কমে যায়।
:max_bytes(150000):strip_icc()/illustration-mother-daughter-broken-childhood-385c55cb-eded64b3a70a435082d94b8807a5f474.jpg)
সন্তানের অভিযোগে কিছু সত্যও থাকতে পারে
এর অর্থ এই নয় যে সন্তানের অভিযোগ সবসময় ভিত্তিহীন। কোনো বাবা-মা হয়তো অতিরিক্ত সমালোচনা করেছেন, নিজের উদ্বেগ সন্তানের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন কিংবা আবেগগতভাবে সন্তানের প্রয়োজনের সময় যথেষ্ট উপস্থিত ছিলেন না।
নিজের ভুল স্বীকার করা তাই গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মা যদি সত্যিই কোনো আচরণের জন্য অনুতপ্ত হন, তাহলে সেটি মেনে নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে ক্ষমা চাওয়া সম্পর্ককে সুস্থ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তবে ভুল স্বীকার করা আর সারাজীবন অপরাধীর আসনে বসে থাকা এক বিষয় নয়। অতীতে ভুল হয়েছে বলে বাবা-মাকে প্রতিটি নতুন সমস্যার জন্য অনন্তকাল দোষী সাব্যস্ত হতে হবে—এমন ধারণাও সম্পর্ককে সুস্থ করে না।
নিখুঁত ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টাও বন্ধ করতে হতে পারে
এক বাবার ঘটনা এর ভালো উদাহরণ। তিনি ছোটবেলায় ছেলের প্রতি আবেগগতভাবে দূরে থাকার জন্য বারবার ক্ষমা চাইতেন। কিন্তু কিছুদিন পরপরই ছেলে আবার একই অভিযোগ তুলত।
এক পর্যায়ে বাবা বুঝতে পারেন, নিখুঁত একটি ক্ষমাপ্রার্থনা তৈরি করে ছেলের কাছ থেকে চূড়ান্ত স্বীকৃতি আদায় করার চেষ্টা কোনো সমাধান নয়। এরপর তিনি নিজের অবস্থান বদলান। তিনি স্বীকার করেন যে অতীতে এমন কিছু করেছেন, যার জন্য তিনি অনুতপ্ত। একই সঙ্গে তিনি এটাও জানান যে এখন তিনি এমন একটি সম্পর্ক চান, যেখানে বহু বছর আগের ঘটনাই তাদের সম্পর্কের একমাত্র বিষয় হয়ে থাকবে না।
এই অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে অতীতের ভুল অস্বীকার করা হয় না, আবার বর্তমান সম্পর্ককেও অতীতের কাছে বন্দি করে রাখা হয় না।
ভালো বাবা-মা হওয়ার প্রমাণ দিতে হবে না
সন্তানের কাছে ক্ষমা চাওয়া প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই করা উচিত। নিজের ভুলের দায় এড়িয়ে যাওয়াও স্বাস্থ্যকর নয়। কিন্তু বাবা-মায়ের জন্য আরেকটি কঠিন সত্য মেনে নেওয়া প্রয়োজন—সন্তান হয়তো কখনো সেই কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি নাও দিতে পারে।
তাই ‘আমি ভালো বাবা-মা ছিলাম’—এই রায় সন্তানের মুখ থেকে শোনার অপেক্ষায় সারাজীবন কাটানো প্রয়োজন নেই। নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া, সন্তানের অনুভূতিকে সম্মান করা এবং একই সঙ্গে বর্তমান সময়ে একটি সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করাই হতে পারে বেশি ফলপ্রসূ পথ।
পরিবারের অতীতের আদালতে জেতার চেয়ে অনেক সময় বর্তমানের সম্পর্কটিকে বাঁচানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভালো বাবা-মা হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়তো সন্তানের কাছ থেকে পাওয়া কোনো রায় নয়; বরং ভুল স্বীকার করে, প্রত্যাশা কমিয়ে এবং সম্পর্কের জন্য নতুনভাবে জায়গা তৈরি করার সক্ষমতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















