পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তানের স্পান্তিক চূড়া থেকে পর্বতারোহী চিকিৎসক আসما মুশতাকের মরদেহ উদ্ধারের অভিযান ভারী তুষারপাত ও প্রবল বাতাসের কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। দুর্গম ও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে উদ্ধারকারী দলের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ছয় সদস্যের উদ্ধারকারী দল ফিরে এসেছে
৩৪ বছর বয়সী আসমা মুশতাক গত বৃহস্পতিবার স্পান্তিক পর্বতের চূড়া থেকে নামার সময় প্রায় ৬ হাজার ২৫০ মিটার উচ্চতায় উচ্চতাজনিত অসুস্থতায় মারা যান। তাঁর মরদেহ বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতায় তৃতীয় শিবিরে রয়েছে।
ছয় সদস্যের উচ্চতাভূমির উদ্ধারকারী দল দ্বিতীয় শিবিরে পৌঁছে তৃতীয় শিবিরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু প্রবল তুষারপাত, বৃষ্টি ও প্রচণ্ড বাতাসের কারণে পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় তাদের মূল শিবিরে ফিরে আসতে হয়।
বালতিস্তান বিভাগের কমিশনার কামাল খান জানিয়েছেন, আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হলে আবার উদ্ধার অভিযান শুরু করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

মরদেহ নামিয়ে আনাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ
পর্বতারোহণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৬ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতা থেকে মরদেহ সরাসরি হেলিকপ্টারে উদ্ধার করা সম্ভব নয়। তাই প্রথমে স্থলপথে উদ্ধারকারী দলকে মরদেহটি মূল শিবির পর্যন্ত নামিয়ে আনতে হবে। এরপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে সেটি স্কারদুতে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
মানবিক কারণে হেলিকপ্টার ব্যবহারের অনুমোদনের প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে স্থল উদ্ধারকারী দল মরদেহটি নিচে নামানোর পর সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার সেটি স্কারদুতে নিয়ে যাবে।
উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অনেক সময় ৬ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতায় মৃত্যুবরণ করা পর্বতারোহীদের মরদেহ তুষারের নিচেই সমাহিত করে রাখতে হয়।
অভিযানের ব্যবস্থাপনা নিয়ে তদন্ত হবে
পাকিস্তানের পর্বতারোহণ সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আসমা মুশতাকের মৃত্যুর পরিস্থিতি এবং অভিযানের ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের ত্রুটি ছিল কি না, তা পরে পূর্ণাঙ্গভাবে তদন্ত করা হবে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের আয়োজক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পর্বতারোহীর কোনো লিখিত চুক্তি ছিল না এবং হেলিকপ্টারে জরুরি সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বীমার ব্যবস্থাও করা হয়নি। এ কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উদ্ধার অভিযান শুরুতে দেরি হওয়ার পুরো দায় আয়োজক প্রতিষ্ঠানের অবহেলার ওপর চাপানো সঠিক হবে না। ঘটনার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে উদ্ধারকারী দল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং একটি ইতালীয় বেসরকারি সংস্থা স্থল উদ্ধারকারী দলের ব্যয় বহন করছে।
পর্বতারোহণ কর্তৃপক্ষ একই সঙ্গে মানুষকে যাচাই না করা তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল না করার আহ্বান জানিয়েছে।

চিকিৎসক থেকে পর্বতারোহী
আসমা মুশতাক লাহোরের বাসিন্দা ছিলেন এবং যুক্তরাজ্যে প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ চিকিৎসক হিসেবে কাজ করতেন। চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি তিনি ভ্রমণ, পর্বতারোহণ এবং নিজের অভিযানের অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরার জন্য পরিচিত ছিলেন।
তিনি ৪ হাজার ৭৬ মিটার উচ্চতার মুসা কা মুসাল্লা পর্বতে শীতকালীন সফল আরোহণ করেছিলেন। রুপাল ও আরান্দু অঞ্চলের বিভিন্ন পর্বতারোহণ অভিযানেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
ব্রড পিকেও খারাপ আবহাওয়ায় উদ্ধার থেমে আছে
এদিকে ব্রড পিক থেকে মার্কিন পর্বতারোহী সারাহ ম্যালরি গেইসের মরদেহও খারাপ আবহাওয়ার কারণে এখনো হেলিকপ্টারে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
প্রাণঘাতী তুষারধসে নিখোঁজ হওয়ার ২২ দিন পর শুক্রবার তিন স্থানীয় বাহক স্বেচ্ছায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে ব্রড পিকের মূল শিবিরে নিয়ে আসেন। আবহাওয়া ভালো হলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে মরদেহটি স্কারদুতে নেওয়া হবে।
গত ৩০ জুলাই ব্রড পিকে তুষারধসে আন্তর্জাতিক একটি ১০ সদস্যের পর্বতারোহী দল নিখোঁজ হয়। ওই অভিযানে ব্রিটিশ-নেপালি খ্যাতিমান পর্বতারোহী নির্মল পুরজাসহ নয়জনের মরদেহ এখন পর্যন্ত উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দশম সদস্য নাওয়াং থিনদু শেরপার সন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮ হাজার ৪৭ মিটার উচ্চতার ব্রড পিক বিশ্বের দ্বাদশ সর্বোচ্চ পর্বত এবং কারাকোরাম পর্বতমালার অন্যতম কঠিন আরোহণস্থল হিসেবে পরিচিত।
স্পান্তিকের তুষারঝড়, দুর্গম উচ্চতা ও প্রচণ্ড বাতাসের কারণে আসমা মুশতাকের মরদেহ উদ্ধারের অভিযান আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়লেও আবহাওয়ার সামান্য উন্নতির অপেক্ষায় রয়েছে উদ্ধারকারী দল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















