আফ্রিকায় ড্রোন প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এখন আর শুধু প্রযুক্তি প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মহাদেশটির আকাশপথে ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় উড়োজাহাজ ব্যবস্থাকে নিরাপদ, টেকসই ও বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় আইন, অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ কাঠামো তৈরির দিকে এখন বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আগামী ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির সারিত প্রদর্শনী কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া দশম এভিয়েশন আফ্রিকা সম্মেলন ও প্রদর্শনীতে দ্বিতীয়বারের মতো অংশ নেবে আফ্রিকান ড্রোন ফোরাম। এবারের আয়োজনে মূল লক্ষ্য থাকবে আফ্রিকার উদীয়মান নিম্ন-উচ্চতা আকাশ অর্থনীতিকে কীভাবে নিরাপদ ও বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করা যায়, তা নিয়ে বাস্তবভিত্তিক আলোচনা।
কিগালি থেকে নাইরোবি, বদলেছে আলোচনার বিষয়
গত বছর কিগালিতে অনুষ্ঠিত এভিয়েশন আফ্রিকা সম্মেলনে প্রথমবারের মতো ড্রোন ও উন্নত আকাশ চলাচল নিয়ে বিশেষ আয়োজন করেছিল আফ্রিকান ড্রোন ফোরাম। সেখানে ড্রোন, চালকবিহীন আকাশ চলাচল ব্যবস্থাপনা, দৃষ্টিসীমার বাইরে ড্রোন পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং উন্নত আকাশ চলাচল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
কিগালির সম্মেলনে দুই হাজার একশর বেশি প্রতিনিধি অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে আফ্রিকার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ৩০ জনের বেশি মহাপরিচালকও ছিলেন। একই আয়োজনে আফ্রিকায় প্রথমবারের মতো চালকবিহীন যাত্রীবাহী বৈদ্যুতিক উল্লম্ব উড্ডয়ন ও অবতরণকারী উড়োজাহাজের প্রকাশ্য প্রদর্শন করা হয়।
সেই আলোচনায় নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা, দৃষ্টিসীমার বাইরে ড্রোন পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট আকাশপথ, উন্নত আকাশ চলাচল ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
এবার নিয়ন্ত্রকদের নিয়ে আলাদা বৈঠক
নাইরোবির আয়োজনে নতুন সংযোজন হিসেবে থাকছে আফ্রিকান ড্রোন নিয়ন্ত্রক ফোরাম। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত এই সীমিত পরিসরের বৈঠকে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ড্রোন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা অংশ নেবেন।
এটি সাধারণ আলোচনা সভার বদলে একটি কর্মভিত্তিক বৈঠক হিসেবে আয়োজন করা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে কোথায় সমস্যা রয়েছে, দৃষ্টিসীমার বাইরে ড্রোন পরিচালনার অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হবে, আকাশ চলাচল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং ড্রোন পরিচালনার প্রশিক্ষণব্যবস্থা কীভাবে গড়ে তোলা যায়—এসব বিষয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজা হবে।
প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর আইন
কিগালির আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল, শুধু উন্নত প্রযুক্তি থাকলেই আফ্রিকার ড্রোন খাত এগিয়ে যাবে না। স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, কৃষিকাজ, খনিজ অনুসন্ধান, অবকাঠামো পরিদর্শনসহ বাস্তব প্রয়োজনে ড্রোন ব্যবহারের উপযোগী আইন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
এ কারণে নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষামূলক অঞ্চল, সমন্বিত নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং সীমান্ত অতিক্রম করে ড্রোন পরিচালনার জন্য কার্যকর পরিচিতি ও নজরদারি ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা
এবারের আয়োজনে আফ্রিকান ড্রোন নিরাপত্তা ফোরামও থাকছে। সেখানে ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নিরাপত্তার মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হবে।
বেসামরিক ও নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা, ঝুঁকি কমানো, ড্রোন শনাক্তকরণ, সম্ভাব্য হুমকির জবাব এবং নতুন প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হবে।
এ ছাড়া পাঁচটি শিল্পভিত্তিক আলোচনায় ড্রোন পরিচালনায় দক্ষ জনবল তৈরি, দৃষ্টিসীমার বাইরে পরিচালনা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, ড্রোনের সংগৃহীত তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত আকাশ চলাচল এবং বিনিয়োগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
অবকাঠামো ও দক্ষ জনবলের ওপর বাড়তি গুরুত্ব
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এখন বিচ্ছিন্নভাবে ড্রোন ব্যবহারের পরিবর্তে বড় বহর ও জটিল কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। ফলে শুধু ড্রোন ব্যবহারের অনুমতি পেলেই হবে না, এর পরবর্তী ধাপের অবকাঠামোও তৈরি করতে হবে।
নির্দিষ্ট ড্রোন চলাচলপথ, ড্রোনের পরিচিতি শনাক্তকরণ, দূরবর্তীভাবে পরিচয় নিশ্চিতকরণ, বিমান চলাচল সেবাদানকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক মডেল—এসব বিষয় এবার আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।
কেনিয়াকে ঘিরে বাড়ছে প্রত্যাশা
নাইরোবিতে এবারের আয়োজনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কেনিয়া বর্তমানে আফ্রিকার অন্যতম সক্রিয় ড্রোন বাজার হিসেবে উঠে আসছে। দেশটিতে দৃষ্টিসীমার বাইরে ড্রোন পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট আকাশপথ, আকাশ চলাচল ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা সংগ্রহের প্রক্রিয়া এবং বিপুলসংখ্যক অনুমোদিত ড্রোন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
সম্মেলনের পাশাপাশি ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় আকাশ চলাচল ব্যবস্থার প্রদর্শনীও অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে আফ্রিকা ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নেবে।
আফ্রিকার আকাশে নতুন অর্থনীতির সম্ভাবনা
কিগালির আয়োজন যেখানে আফ্রিকার বিমান চলাচল কৌশলে ড্রোন ও উন্নত আকাশ চলাচল ব্যবস্থার জায়গা প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, নাইরোবির সম্মেলন সেখানে আরও এক ধাপ এগিয়ে বাস্তব প্রয়োগের কাঠামো তৈরির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
ড্রোন প্রযুক্তিকে আফ্রিকার আকাশপথে নিরাপদভাবে সংযুক্ত করতে আইন, অবকাঠামো, দক্ষতা, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ—এই পাঁচটি স্তম্ভকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে আফ্রিকায় ড্রোনের ভবিষ্যৎ এখন আর সম্ভাবনার আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা কীভাবে বড় পরিসরে বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত করা যায়, সেটিই হয়ে উঠছে মূল প্রশ্ন।
আফ্রিকান ড্রোন ফোরামের দ্বিতীয় বছরের অংশগ্রহণ তাই মহাদেশটির ড্রোন খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে—প্রযুক্তিকে আকাশের মানচিত্রে জায়গা করে দেওয়ার পর এবার সেই প্রযুক্তির জন্য কার্যকর ও টেকসই নিয়মকাঠামো গড়ে তোলার পালা।
আফ্রিকায় ড্রোন প্রযুক্তির সম্প্রসারণ নিয়ে আইন, অবকাঠামো ও বিনিয়োগের নতুন উদ্যোগই হতে পারে মহাদেশটির ভবিষ্যৎ আকাশ অর্থনীতির ভিত্তি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















