রেকটাল ক্যানসারে আক্রান্ত বহু রোগীর জন্য বড় ধরনের অস্ত্রোপচার এড়িয়ে যাওয়ার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্যে পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় দেখা গেছে, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির সমন্বিত চিকিৎসায় পাঁচজনের মধ্যে চারজন রোগীর রেকটাম বা মলাশয়ের শেষাংশ সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে অনেক রোগী স্থায়ী কলোস্টমি ব্যাগ এবং অস্ত্রোপচারের দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে রক্ষা পেতে পারেন।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন, ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম ও ইউনিভার্সিটি অব লিডসের গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত স্টার-ট্রেক পরীক্ষায় এই ফল পাওয়া গেছে। গবেষণাটি ক্যানসার রিসার্চ ইউকে ও স্ট্যান্ড আপ টু ক্যানসারের অর্থায়নে পরিচালিত হয় এবং এর ফল প্রকাশিত হয়েছে দ্য ল্যানসেট অনকোলজিতে।
চার হাজারের বেশি রোগীর জন্য নতুন আশা
যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর প্রায় ৪ হাজার ১০০ জনের প্রাথমিক পর্যায়ের রেকটাল ক্যানসার শনাক্ত হয়। প্রচলিত চিকিৎসায় অনেক রোগীর রেকটাম অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করতে হয়। এ ধরনের বড় অস্ত্রোপচারের পর কারও স্থায়ী কলোস্টমি ব্যাগ ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা, যৌনজীবনে জটিলতা এবং মূত্রসংক্রান্ত সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
স্টার-ট্রেক পরীক্ষায় পাঁচটি দেশের ৫০০-এর বেশি রোগী অংশ নেন। তাদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়। একটি দল প্রচলিত বড় অস্ত্রোপচার পদ্ধতি পায়, দ্বিতীয় দল পাঁচ সপ্তাহের কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির সমন্বিত চিকিৎসা নেয় এবং তৃতীয় দল পাঁচ দিনের রেডিওথেরাপি পায়।
চিকিৎসায় সাড়া না দিলে অস্ত্রোপচার
যেসব রোগী শুধু কেমোথেরাপি-রেডিওথেরাপি অথবা রেডিওথেরাপি পেয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে বড় অস্ত্রোপচার তখনই করা হয়, যখন প্রাথমিক চিকিৎসায় টিউমার যথেষ্ট সংকুচিত হয়নি। আবার ক্যানসারের ছোট অংশ অবশিষ্ট থাকলে সেটি অপসারণে তুলনামূলক কম আক্রমণাত্মক, স্থানীয় অস্ত্রোপচার করা হয়।
১২ মাস পর দেখা যায়, পাঁচ সপ্তাহের কেমোথেরাপি-রেডিওথেরাপি পাওয়া রোগীদের পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পাঁচ দিনের রেডিওথেরাপি পাওয়া রোগীদের তুলনায় কম হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এই চিকিৎসা পাওয়া পাঁচজনের মধ্যে চারজনই তাদের রেকটাম সংরক্ষণ করতে পেরেছেন।
চিকিৎসাপদ্ধতিতে সম্ভাব্য বড় পরিবর্তন
স্টার-ট্রেক পরীক্ষার সহ-প্রধান গবেষক ও ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের কোলোরেকটাল সার্জারির অধ্যাপক সাইমন বাখ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসার নিরাময়ের বিনিময়ে রোগীদের রেকটাম হারানো এবং অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী স্টোমা গ্রহণ করতে হয়েছে। নতুন ফলাফল বলছে, বহু রোগীর জন্য ভবিষ্যতে সেই মূল্য আর দিতে নাও হতে পারে।
ক্যানসার রিসার্চ ইউকের প্রধান নির্বাহী মিশেল মিচেলও এই ফলাফলকে হাজারো মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে সক্ষম বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, স্ক্রিনিংয়ের কারণে এখন আরও বেশি রেকটাল ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হচ্ছে এবং রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও বাড়ছে। তবে এতদিন চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘমেয়াদি ফল যাচাইয়ের অপেক্ষা
এনএইচএস ইংল্যান্ডের ক্যানসারবিষয়ক জাতীয় ক্লিনিক্যাল পরিচালক অধ্যাপক পিটার জনসন বলেছেন, গবেষণার ফল ভবিষ্যতে আরও বেশি রোগীর ক্ষেত্রে বড় অস্ত্রোপচার এড়ানোর পথ দেখাতে পারে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে দিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই ফলাফল একই থাকে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। এরপর যেসব রোগী এই চিকিৎসা থেকে উপকৃত হতে পারেন, তাদের সবার কাছে পদ্ধতিটি পৌঁছে দেওয়াই হবে পরবর্তী লক্ষ্য।
পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৬৫ বছর বয়সী হিউ চাউন ২০২০ সালের ডিসেম্বরে রেকটাল ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর ২০২১ সালের জানুয়ারিতে এই পরীক্ষায় যুক্ত হন। এখন পর্যন্ত তাকে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়নি। তার মেয়ে র্যাচেল চাউন বলেন, ২০০১ সালে মাত্র ৪১ বছর বয়সে ক্যানসারে তার মায়ের মৃত্যু হয়েছিল। তবে বর্তমান চিকিৎসায় রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ছে এবং অনেকেই ক্যানসারের পরও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন।
রেকটাল ক্যানসারের চিকিৎসায় এই পরীক্ষার ফল শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার প্রচলিত কাঠামো বদলে দিতে পারে কি না, তা নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের ওপর।
রেকটাল ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির সমন্বিত পদ্ধতিতে পাঁচজনের মধ্যে চারজনের রেকটাম সংরক্ষণের সম্ভাবনা দেখা গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















