পাকিস্তানে নারী অধিকার ও ক্ষমতায়নের চিত্র এখনো হতাশাজনক। শিক্ষা থেকে কর্মক্ষেত্র, প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থেকে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীরা পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছেন। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক মেয়ে এখনো বিদ্যালয়ের বাইরে, নারীদের প্রযুক্তি ব্যবহারে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে এবং নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে ঘটছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে। জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হলেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাদের উপস্থিতি এখনো অত্যন্ত সীমিত।
নেতৃত্বে নারীদের ঐতিহাসিক অগ্রযাত্রা
তবে পাকিস্তানের ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত রয়েছে। দেশটির প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহ স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থীও হয়েছিলেন।
১৯৮৮ সালে বেনজির ভুট্টো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে পাকিস্তান মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে একজন নারীকে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব দেয়। স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলনেও পাকিস্তানি নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী আসমা জাহাঙ্গীর সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবী সমিতির প্রথম নারী সভাপতি নির্বাচিত হন। বেগম নাসিম ওয়ালি খান সাধারণ নির্বাচনে আসন জয়ী প্রথম পাকিস্তানি নারীদের একজন হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন। বিচারপতি আয়েশা মালিক দেশটির সুপ্রিম কোর্টের প্রথম নারী বিচারপতি হন। আর বর্তমানে মরিয়ম নওয়াজ পাকিস্তানের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পাঞ্জাবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
নারী নেতৃত্বের এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি রূপান্তরকামী নারীরাও জনপরিসরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। আয়েশা মুঘল জাতিসংঘের অধিবেশনে একটি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী প্রথম রূপান্তরকামী নারী হিসেবে পরিচিতি পান। সম্প্রতি নায়াব আলীকেও সরকারি বেসামরিক পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক নারীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন
অগ্রগতির এসব উদাহরণের বিপরীতে পাকিস্তানে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় নারীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবন্দিত্বের ঘটনাও বেড়েছে।
তেহরিক-ই-ইনসাফের কয়েকজন নারী নেত্রী এখনো কারাগারে রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রবীণ চিকিৎসক ও ক্যানসারজয়ী ইয়াসমিন রশিদ। মানবাধিকার আইনজীবী ইমান মাজারি হাজিরও দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করছেন। বেলুচিস্তানের বহু নারীও নিখোঁজ ও রাজনৈতিক মামলায় কারাবন্দি পুরুষদের সঙ্গে একই ধরনের দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা তরুণীদের সামনে কী বার্তা দিচ্ছে—সেই প্রশ্নই তুলেছেন লেখক। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় নারীদের কারাবন্দি করা হলে পরিবারগুলো কি মেয়েদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে উৎসাহিত করবে? তরুণ আইনজীবীরা কি নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে আগ্রহী হবেন? আর তরুণীরা কি রাজনীতিতে এসে মানুষের জন্য কাজ করার সাহস পাবেন?
নির্বাচনী রাজনীতিতে নারীকে হেয় করার প্রবণতা
নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য শুধু রাজনৈতিক মামলা বা কারাবন্দিত্বেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচনী প্রচারণার সময় নারী রাজনীতিকদের লক্ষ্য করে লিঙ্গভিত্তিক অপপ্রচারও বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী রাজনীতিকদের নিয়ে অন্তত ১৬৩টি লিঙ্গভিত্তিক বিভ্রান্তিকর প্রচারের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছিল। একই সময়ে নির্বাচনী সংবাদ সংগ্রহকারী নারী সাংবাদিকদের লক্ষ্য করেও অপমানজনক মন্তব্য, অনলাইন হয়রানি এবং শারীরিক হামলার হুমকিসহ অন্তত ৪৭টি পোস্টের তথ্য পাওয়া যায়।
নারী মানবাধিকারকর্মীদের লক্ষ্য করে বিকৃত ছবি ও কৃত্রিমভাবে তৈরি ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনা করা নারীদের উদ্দেশ্যে এসব অমানবিক ও অপমানজনক প্রচারণা চালানো হলেও অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
আইন আছে, কিন্তু সুরক্ষা কতটা?
নারীদের সম্মতি ছাড়া বিকৃত ছবি বা দৃশ্য তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার আইন পাকিস্তানে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী হয়রানির বিরুদ্ধে সেই আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রের সমালোচনাকারী সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধের মামলা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সমালোচকদের মতে, একই আইনের প্রয়োগ যদি নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি ঠেকাতে সমানভাবে না হয়, তাহলে আইনের উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
অনলাইনে নারীবিদ্বেষী প্রচারণা কখনো কখনো বাস্তব সহিংসতারও জন্ম দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় নারী ও কনটেন্ট নির্মাতাদের বিরুদ্ধেও হয়রানি ও হুমকির ঘটনা ঘটছে। ফলে অনলাইন নারীবিদ্বেষ এবং বাস্তব জীবনে নারীর ওপর হামলার মধ্যকার যোগসূত্রকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
নারীর পাশে দাঁড়ালেও শাস্তির অভিযোগ
আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ শুধু নারীদের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। মানবাধিকার আইনজীবী হাদি আলী চাথাকেও তার স্ত্রী ইমান মাজারি হাজিরকে সমর্থন করার কারণে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ত্রীর পোস্ট পুনঃপ্রচারকে কেন্দ্র করে।
এ ঘটনা নতুন আরেকটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—কোনো পুরুষ যদি কোনো নারী অধিকারকর্মী বা পরিবারের নারী সদস্যের পাশে দাঁড়ান, তাকেও কি একই ধরনের আইনি ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে?
প্রতিবেশী অঞ্চলের বাস্তবতায় পাকিস্তানের দায়িত্ব
দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নারী নেতৃত্বের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আফগানিস্তানে ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই এবং নারীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইরানেও রাষ্ট্রীয় পোশাকবিধির বিরোধিতা করায় নারীদের প্রাণ হারানোর ঘটনা ঘটেছে।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানে নারীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা পুরো অঞ্চলের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীদের প্রতিনিধিত্ব জনসংখ্যার অনুপাতে অত্যন্ত কম।
সরকারে নারীর অংশগ্রহণ অপ্রতুল
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারে কোনো নারী পূর্ণ মন্ত্রী নেই; প্রতিমন্ত্রী পর্যায়েও নারী রয়েছেন মাত্র একজন। সিন্ধু প্রদেশে যে রাজনৈতিক দল একসময় দেশকে একজন নারী প্রধানমন্ত্রী দিয়েছিল, তাদের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় নারী সদস্য মাত্র দুজন। বেলুচিস্তানেও নারী মন্ত্রীর সংখ্যা একজন।
খাইবার পাখতুনখোয়ায় ক্ষমতাসীন দলে মন্ত্রিসভায় কোনো নারী নেই। পাঞ্জাবে একজন নারী মুখ্যমন্ত্রী থাকলেও তার মন্ত্রিসভায় নারী মন্ত্রী মাত্র দুজন। ফলে একজন নারী সরকারপ্রধানের উপস্থিতি থাকলেও সামগ্রিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো এখনো পুরুষপ্রধান।
সংবিধানের সমতার নীতি বাস্তবায়নের দাবি
পাকিস্তানের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ নারী ও শিশুর সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সমান আচরণ নিশ্চিত করার নীতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় নারীর অংশগ্রহণের বর্তমান চিত্র সেই সাংবিধানিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে নিবন্ধে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীর ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। কারণ দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হলে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগেও তাদের অন্তত অর্ধেক প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত—এমনটাই মত লেখকের।
পাকিস্তানের প্রতিটি তরুণীর সামনে কী ধরনের ভবিষ্যৎ তৈরি হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করছে রাষ্ট্র নারীর নেতৃত্ব, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাকে কতটা গুরুত্ব দেয় তার ওপর। নারী নেতৃত্বকে কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু সাফল্যের গল্প হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের স্বাভাবিক ও সমান অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
পাকিস্তানে নারী নেতৃত্বের অগ্রগতি যেমন ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, তেমনি বর্তমান বৈষম্য ও দমন-পীড়ন সেই অর্জনগুলোকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। নারীর ক্ষমতায়নকে বাস্তব রূপ দিতে হলে রাজনৈতিক ক্ষমতা, আইনি সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা—তিন ক্ষেত্রেই সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















