১০:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
প্রদেশ নয়, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণই পাকিস্তানের প্রকৃত সংস্কার টাইটানিকের শতাধিক নিদর্শন নিলাম বন্ধ করলেন মার্কিন বিচারক আমদানি নীতিতে বড় পরিবর্তন, এলসি ছাড়াই সীমাহীন মূল্যের চুক্তিতে পণ্য আমদানির সুযোগ মহেশখালীর সাগরে নিউজিল্যান্ডের পরিবারের নৌকাডুবি, নিখোঁজ কিশোর চীনের জে-১০ সিই কিনছে বাংলাদেশ ডেঙ্গুতে আরও ৩ মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ৯০৭; মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮৮ বুধবার বাংলাদেশে পালিত হবে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী, দেশজুড়ে নানা আয়োজন ঢাকা-যশোর রুটে আবার ইউএস-বাংলার ফ্লাইট, ৯ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিদিন দুই ট্রিপ মেঘনা ব্যাংকের ৪০০ কোটি টাকার সাব-অর্ডিনেটেড বন্ড অনুমোদন, মূলধন শক্তিশালী হবে প্রিন্স হ্যারি–মেগানের নতুন ব্রিটেনযাত্রা, পেছনে পড়ে থাকবে আর্চির প্রিয় ‘মুরগির বাড়ি’

খনিজের গণ্ডি পেরিয়ে: নামিবিয়ার শিল্পায়নে পুঁজির নতুন পথ

একটি খনি চালু হওয়ার পরই বিনিয়োগের গল্প শেষ হয়ে যায়—এমন ধারণা এখন আর টেকসই নয়। বরং উৎপাদন শুরু হওয়ার পরই পুঁজির প্রয়োজন আরও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। খনির সম্প্রসারণ, উৎপাদন বৃদ্ধি কিংবা স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন, আবাসন, রেলপথ, শিল্প অবকাঠামো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতার মতো বিপুল বিনিয়োগের প্রশ্ন।

প্রচলিত ধারণা হলো, এসব অবকাঠামোর অর্থায়নও খনি কোম্পানিকেই করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি সম্পদের মালিকানা খনি কোম্পানির হাতে থাকা জরুরি নয়। বরং কোন সম্পদ সরাসরি খনির মূল ব্যবসার অংশ আর কোনটি সহায়ক অবকাঠামো—এই পার্থক্যটি স্পষ্ট করাই হতে পারে আরও কার্যকর পুঁজি ব্যবস্থাপনার ভিত্তি।

খনি পরিচালনা অবশ্যই মূল ব্যবসা। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, কিংবা শ্রমিকদের আবাসন—এসব ক্ষেত্রে সম্পদের মালিক হওয়ার চেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে সেবা পাওয়াই অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বহিরাগত পুঁজি এসব খাতে যুক্ত হলে খনি কোম্পানির ব্যালান্স শিটের ওপর চাপ কমে, ঝুঁকি ভাগ হয়ে যায় এবং মূল ব্যবসায় বিনিয়োগের সক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকে।

নামিবিয়ার জন্য এই প্রশ্নটি এখন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি তার বিপুল খনিজ সম্পদ থেকে আরও বেশি অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে চাইছে। শুধু খনিজ উত্তোলন ও রপ্তানি নয়, স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ, সরবরাহ শৃঙ্খলা শক্তিশালী করা এবং খনিজভিত্তিক শিল্পের বিস্তার—সবকিছুর জন্য বড় আকারের পুঁজি প্রয়োজন। তবে প্রতিটি প্রকল্পের ঝুঁকি ও বিনিয়োগের সময়সীমা এক নয়। তাই সব প্রকল্পকে একই অর্থায়ন কাঠামোর মধ্যে ফেলার চেষ্টা বরং অগ্রগতিকে ধীর করে দিতে পারে।

বিরল মাটির খনিজে বড় সম্ভাবনা

নামিবিয়ার ডিসপ্রোসিয়াম, টারবিয়াম, নিওডিমিয়াম ও ইট্রিয়ামের মতো বিরল মাটির খনিজ আন্তর্জাতিকভাবে ক্রমেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু এসব সম্পদের প্রকৃত মূল্য শুধু মাটির নিচ থেকে তুলে আনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খনিজ আলাদা করা, পরিশোধন করা এবং শিল্পে ব্যবহারযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দেশে তৈরি করতে পারলে অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজন বহুগুণ বাড়তে পারে।

এই ধরনের প্রকল্প সাধারণত ব্যয়বহুল, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দীর্ঘমেয়াদি। তাই সরকার, শিল্পখাত এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অংশীদারত্বের মাধ্যমে এগুলো গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ভারী শিল্পের কার্বন নিঃসরণ কমাতে সবুজ হাইড্রোজেন ব্যবহার করা গেলে এই শিল্পায়ন নামিবিয়ার জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্যকেও এগিয়ে নিতে পারে।

একই যুক্তি প্রযোজ্য ইউরেনিয়ামের মূল্য সংযোজন ও পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে অংশগ্রহণ, লিথিয়াম ও ব্যাটারি উপকরণ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং এসব শিল্পকে ঘিরে প্রয়োজনীয় উৎপাদন, পরিবহন ও দক্ষতা উন্নয়ন অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও।

শ্রমিকদের আবাসনও এই বৃহত্তর আলোচনার অংশ হওয়া উচিত। খনি সম্প্রসারণের সঙ্গে দক্ষ কর্মীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসনের প্রয়োজন বাড়ে। কর্মীদের ধরে রাখা, উৎপাদনশীলতা এবং নিরাপত্তার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অথচ আবাসন কোনো খনি কোম্পানির মূল ব্যবসা নয়। নির্মাণ পর্যায় বা দীর্ঘমেয়াদি কর্মীদের জন্য পরিকল্পিত আবাসন একটি দীর্ঘস্থায়ী আয়-উৎপাদনকারী সম্পদ হিসেবে আলাদা বিনিয়োগ কাঠামোর আওতায় আনা সম্ভব।Haib Copper Project: Namibia's Promising Porphyry Deposit

সব প্রকল্প একসঙ্গে নয়

খনিজের মূল্য সংযোজনের প্রতিটি প্রকল্প একই পর্যায়ে নেই। তাই বিনিয়োগযোগ্যতার ভিত্তিতে এগুলোকে আলাদা করা প্রয়োজন।

প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে সেই প্রকল্পগুলো, যাদের ইতোমধ্যে নিশ্চিত ক্রেতা, চুক্তিবদ্ধ ব্যবহারকারী বা স্বাক্ষরিত পণ্য ক্রয় চুক্তি রয়েছে। এগুলোই এখন দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজির অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। নিশ্চিত চাহিদা থাকলে বিনিয়োগের ঝুঁকি অনেক বেশি স্পষ্ট হয় এবং সরকার, প্রকল্প উন্নয়নকারী ও বিনিয়োগকারীর মধ্যে ঝুঁকি ভাগ করা সহজ হয়।

দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছে এমন প্রকল্প, যেগুলোর অর্থনৈতিক ও কারিগরি ভিত্তি শক্তিশালী, কিন্তু এখনো নিশ্চিত ক্রেতা নেই। এসব প্রকল্পকে বিনিয়োগযোগ্য পর্যায়ে নিতে সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রযুক্তিগত পরিকল্পনা, বাজার বিশ্লেষণ, ক্রয়চুক্তি এবং বাণিজ্যিক কাঠামো তৈরির কাজ আগে শেষ করতে হবে। এখানে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ প্রকল্প-প্রস্তুতি তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তৃতীয় শ্রেণিতে রয়েছে একাধিক প্রকল্পের জন্য ব্যবহৃত যৌথ অবকাঠামো—যেমন প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল কিংবা অন্যান্য সাধারণ সুবিধা। এসব অবকাঠামো চাহিদা তৈরি হওয়ার আগেই অনুমানের ভিত্তিতে নির্মাণ করা ঝুঁকিপূর্ণ। বরং নির্দিষ্ট প্রকল্প প্রস্তুত ও নিশ্চিত হওয়ার পর যখন পর্যাপ্ত শিল্পভিত্তি তৈরি হবে, তখন যৌথ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করা অধিক যুক্তিসঙ্গত।

ওয়ালভিস বে-র ফার্ম ৫৮ এলাকায় ভারী শিল্পের জন্য এমন যৌথ অবকাঠামোর সুযোগ রয়েছে। বাল্ক সেবা, সড়ক ও রেল যোগাযোগ সেখানে শিল্প আকর্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রয়োজনীয় কর-সুবিধা চূড়ান্ত করা জরুরি।

এই ক্রম—প্রথমে নিশ্চিত চাহিদার প্রকল্প, এরপর প্রস্তুতিপর্বে থাকা প্রকল্প, এবং সবশেষে পর্যাপ্ত শিল্পভিত্তি তৈরি হলে যৌথ অবকাঠামো—পুঁজিকে এমন জায়গায় নিয়ে যায় যেখানে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট এবং অংশীদারদের মধ্যে যথাযথভাবে বণ্টনযোগ্য।

অর্থায়নের আগে প্রয়োজন সঠিক কাঠামো

একটি প্রকল্পের আলোচনা শুধু ‘কত টাকা দরকার’—এই প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা উচিত নয়। আগে বুঝতে হবে প্রকল্পটির ব্যবসায়িক প্রয়োজন কী, ঝুঁকি কোথায় এবং বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার।

বড় প্রকল্প সাধারণত একক প্রতিষ্ঠান বা এক উৎসের অর্থায়নে সফল হয় না। সরকার নীতি, অনুমোদন ও সমন্বয়ের পরিবেশ তৈরি করতে পারে। খনি কোম্পানি সরবরাহ করে সম্পদ, পরিচালন দক্ষতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সম্ভাব্য বাজারের সংকেত। উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে উপযুক্ত ঝুঁকি গ্রহণ করতে পারে।

এর সঙ্গে দেশীয় পেনশন ও দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের অর্থও যুক্ত করা সম্ভব। তবে এ জন্য প্রকল্পের কাঠামো এমন হতে হবে যাতে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় ঝুঁকি-রিটার্ন কাঠামোর সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। নামিবিয়ার সম্পদ, জ্বালানি রূপান্তর এবং পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মিলন নতুন বেসরকারি ইকুইটি ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সুযোগও তৈরি করছে।

দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজির অংশগ্রহণ তাই কোনো গৌণ বিষয় নয়। সঠিক কাঠামো তৈরি করা গেলে এই পুঁজি দেশের শিল্পায়নের অংশীদার হতে পারে। আর তা না হলে দেশের শিল্পায়ন চোখের সামনে ঘটলেও দেশীয় সঞ্চয় তার বাইরে থেকে যেতে পারে।

খনির জীবন শেষ হলেও বিনিয়োগের দায়িত্ব শেষ নয়

দায়িত্বশীল খনি বিনিয়োগের অর্থ শুধু উৎপাদনের সময় পরিবেশগত ও সামাজিক মানদণ্ড মেনে চলা নয়। খনি বন্ধ হওয়ার পর কী হবে, সেই পরিকল্পনাও শুরু থেকেই বিনিয়োগ কাঠামোর অংশ হওয়া উচিত।

পরিবেশ পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ সংরক্ষণ, স্থানীয় উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি গড়ে তোলা এবং এমন অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা প্রয়োজন যা খনি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখতে পারে। একইভাবে কোনো খনির জন্য নির্মিত একক অবকাঠামো ভবিষ্যতে বৃহত্তর অঞ্চলের জনসাধারণের সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হলে তার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য আরও বাড়ে।

এ কারণেই খনি কোম্পানিগুলোর এমন বিনিয়োগ অংশীদার বেছে নেওয়া জরুরি, যারা দায়িত্বশীল বিনিয়োগ, পরিবেশ-সামাজিক-সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের বিষয়ে একই দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে।

নামিবিয়ার সাম্প্রতিক মাইনিং এক্সপোতে প্রেসিডেন্ট নেতুম্বো নান্দি-নদাইতওয়াহ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, খনি খাত কেবল আরেকটি অর্থনৈতিক খাত নয়। ষষ্ঠ জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার আটটি অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে এটিকে প্রথম স্থানে রাখা হয়েছে। ফলে খাতটির সাফল্য শুধু কত টন খনিজ উত্তোলন হলো বা কত অর্থ রপ্তানি আয় হলো—তা দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। কর্মসংস্থান, অবকাঠামো এবং খনি-সংলগ্ন জনগোষ্ঠীর জন্য ভাগাভাগি সমৃদ্ধিও সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত।

খনি একদিন শেষ হবে। কিন্তু সেই খনিকে ঘিরে তৈরি পুঁজি, অবকাঠামো, দক্ষতা ও স্থানীয় ব্যবসার সক্ষমতা যদি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়, তাহলে সম্পদ উত্তোলনের সুফল তার উৎপাদনকাল পেরিয়েও টিকে থাকতে পারে।

নামিবিয়ার খনিজ মূল্য সংযোজন নীতি যখন চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে, তখন মূল প্রশ্ন হবে শুধু কোন খনিজ উত্তোলন করা হবে তা নয়; বরং সেই খনিজ থেকে কতটা মূল্য দেশে রাখা যাবে। স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিল্পায়ন ও পরবর্তী ধাপের শিল্প সক্ষমতা গড়ে তুলতে হলে পুঁজিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে সরকার, খনি কোম্পানি, বিনিয়োগকারী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাস্তব অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্থানীয় শিল্পনীতির আলোচনায় স্থানীয় পুঁজিকেও জায়গা দিতে হবে। কারণ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে তৈরি ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির মালিকানা যদি দেশের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবেই খনিজ সম্পদ শুধু রপ্তানি আয়ের উৎস না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সম্পদে পরিণত হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রদেশ নয়, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণই পাকিস্তানের প্রকৃত সংস্কার

খনিজের গণ্ডি পেরিয়ে: নামিবিয়ার শিল্পায়নে পুঁজির নতুন পথ

০৭:২০:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

একটি খনি চালু হওয়ার পরই বিনিয়োগের গল্প শেষ হয়ে যায়—এমন ধারণা এখন আর টেকসই নয়। বরং উৎপাদন শুরু হওয়ার পরই পুঁজির প্রয়োজন আরও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। খনির সম্প্রসারণ, উৎপাদন বৃদ্ধি কিংবা স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন, আবাসন, রেলপথ, শিল্প অবকাঠামো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতার মতো বিপুল বিনিয়োগের প্রশ্ন।

প্রচলিত ধারণা হলো, এসব অবকাঠামোর অর্থায়নও খনি কোম্পানিকেই করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি সম্পদের মালিকানা খনি কোম্পানির হাতে থাকা জরুরি নয়। বরং কোন সম্পদ সরাসরি খনির মূল ব্যবসার অংশ আর কোনটি সহায়ক অবকাঠামো—এই পার্থক্যটি স্পষ্ট করাই হতে পারে আরও কার্যকর পুঁজি ব্যবস্থাপনার ভিত্তি।

খনি পরিচালনা অবশ্যই মূল ব্যবসা। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, কিংবা শ্রমিকদের আবাসন—এসব ক্ষেত্রে সম্পদের মালিক হওয়ার চেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে সেবা পাওয়াই অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বহিরাগত পুঁজি এসব খাতে যুক্ত হলে খনি কোম্পানির ব্যালান্স শিটের ওপর চাপ কমে, ঝুঁকি ভাগ হয়ে যায় এবং মূল ব্যবসায় বিনিয়োগের সক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকে।

নামিবিয়ার জন্য এই প্রশ্নটি এখন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি তার বিপুল খনিজ সম্পদ থেকে আরও বেশি অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে চাইছে। শুধু খনিজ উত্তোলন ও রপ্তানি নয়, স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ, সরবরাহ শৃঙ্খলা শক্তিশালী করা এবং খনিজভিত্তিক শিল্পের বিস্তার—সবকিছুর জন্য বড় আকারের পুঁজি প্রয়োজন। তবে প্রতিটি প্রকল্পের ঝুঁকি ও বিনিয়োগের সময়সীমা এক নয়। তাই সব প্রকল্পকে একই অর্থায়ন কাঠামোর মধ্যে ফেলার চেষ্টা বরং অগ্রগতিকে ধীর করে দিতে পারে।

বিরল মাটির খনিজে বড় সম্ভাবনা

নামিবিয়ার ডিসপ্রোসিয়াম, টারবিয়াম, নিওডিমিয়াম ও ইট্রিয়ামের মতো বিরল মাটির খনিজ আন্তর্জাতিকভাবে ক্রমেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু এসব সম্পদের প্রকৃত মূল্য শুধু মাটির নিচ থেকে তুলে আনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খনিজ আলাদা করা, পরিশোধন করা এবং শিল্পে ব্যবহারযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দেশে তৈরি করতে পারলে অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজন বহুগুণ বাড়তে পারে।

এই ধরনের প্রকল্প সাধারণত ব্যয়বহুল, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দীর্ঘমেয়াদি। তাই সরকার, শিল্পখাত এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অংশীদারত্বের মাধ্যমে এগুলো গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ভারী শিল্পের কার্বন নিঃসরণ কমাতে সবুজ হাইড্রোজেন ব্যবহার করা গেলে এই শিল্পায়ন নামিবিয়ার জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্যকেও এগিয়ে নিতে পারে।

একই যুক্তি প্রযোজ্য ইউরেনিয়ামের মূল্য সংযোজন ও পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে অংশগ্রহণ, লিথিয়াম ও ব্যাটারি উপকরণ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং এসব শিল্পকে ঘিরে প্রয়োজনীয় উৎপাদন, পরিবহন ও দক্ষতা উন্নয়ন অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও।

শ্রমিকদের আবাসনও এই বৃহত্তর আলোচনার অংশ হওয়া উচিত। খনি সম্প্রসারণের সঙ্গে দক্ষ কর্মীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসনের প্রয়োজন বাড়ে। কর্মীদের ধরে রাখা, উৎপাদনশীলতা এবং নিরাপত্তার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অথচ আবাসন কোনো খনি কোম্পানির মূল ব্যবসা নয়। নির্মাণ পর্যায় বা দীর্ঘমেয়াদি কর্মীদের জন্য পরিকল্পিত আবাসন একটি দীর্ঘস্থায়ী আয়-উৎপাদনকারী সম্পদ হিসেবে আলাদা বিনিয়োগ কাঠামোর আওতায় আনা সম্ভব।Haib Copper Project: Namibia's Promising Porphyry Deposit

সব প্রকল্প একসঙ্গে নয়

খনিজের মূল্য সংযোজনের প্রতিটি প্রকল্প একই পর্যায়ে নেই। তাই বিনিয়োগযোগ্যতার ভিত্তিতে এগুলোকে আলাদা করা প্রয়োজন।

প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে সেই প্রকল্পগুলো, যাদের ইতোমধ্যে নিশ্চিত ক্রেতা, চুক্তিবদ্ধ ব্যবহারকারী বা স্বাক্ষরিত পণ্য ক্রয় চুক্তি রয়েছে। এগুলোই এখন দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজির অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। নিশ্চিত চাহিদা থাকলে বিনিয়োগের ঝুঁকি অনেক বেশি স্পষ্ট হয় এবং সরকার, প্রকল্প উন্নয়নকারী ও বিনিয়োগকারীর মধ্যে ঝুঁকি ভাগ করা সহজ হয়।

দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছে এমন প্রকল্প, যেগুলোর অর্থনৈতিক ও কারিগরি ভিত্তি শক্তিশালী, কিন্তু এখনো নিশ্চিত ক্রেতা নেই। এসব প্রকল্পকে বিনিয়োগযোগ্য পর্যায়ে নিতে সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রযুক্তিগত পরিকল্পনা, বাজার বিশ্লেষণ, ক্রয়চুক্তি এবং বাণিজ্যিক কাঠামো তৈরির কাজ আগে শেষ করতে হবে। এখানে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ প্রকল্প-প্রস্তুতি তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তৃতীয় শ্রেণিতে রয়েছে একাধিক প্রকল্পের জন্য ব্যবহৃত যৌথ অবকাঠামো—যেমন প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল কিংবা অন্যান্য সাধারণ সুবিধা। এসব অবকাঠামো চাহিদা তৈরি হওয়ার আগেই অনুমানের ভিত্তিতে নির্মাণ করা ঝুঁকিপূর্ণ। বরং নির্দিষ্ট প্রকল্প প্রস্তুত ও নিশ্চিত হওয়ার পর যখন পর্যাপ্ত শিল্পভিত্তি তৈরি হবে, তখন যৌথ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করা অধিক যুক্তিসঙ্গত।

ওয়ালভিস বে-র ফার্ম ৫৮ এলাকায় ভারী শিল্পের জন্য এমন যৌথ অবকাঠামোর সুযোগ রয়েছে। বাল্ক সেবা, সড়ক ও রেল যোগাযোগ সেখানে শিল্প আকর্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রয়োজনীয় কর-সুবিধা চূড়ান্ত করা জরুরি।

এই ক্রম—প্রথমে নিশ্চিত চাহিদার প্রকল্প, এরপর প্রস্তুতিপর্বে থাকা প্রকল্প, এবং সবশেষে পর্যাপ্ত শিল্পভিত্তি তৈরি হলে যৌথ অবকাঠামো—পুঁজিকে এমন জায়গায় নিয়ে যায় যেখানে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট এবং অংশীদারদের মধ্যে যথাযথভাবে বণ্টনযোগ্য।

অর্থায়নের আগে প্রয়োজন সঠিক কাঠামো

একটি প্রকল্পের আলোচনা শুধু ‘কত টাকা দরকার’—এই প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা উচিত নয়। আগে বুঝতে হবে প্রকল্পটির ব্যবসায়িক প্রয়োজন কী, ঝুঁকি কোথায় এবং বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার।

বড় প্রকল্প সাধারণত একক প্রতিষ্ঠান বা এক উৎসের অর্থায়নে সফল হয় না। সরকার নীতি, অনুমোদন ও সমন্বয়ের পরিবেশ তৈরি করতে পারে। খনি কোম্পানি সরবরাহ করে সম্পদ, পরিচালন দক্ষতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সম্ভাব্য বাজারের সংকেত। উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে উপযুক্ত ঝুঁকি গ্রহণ করতে পারে।

এর সঙ্গে দেশীয় পেনশন ও দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের অর্থও যুক্ত করা সম্ভব। তবে এ জন্য প্রকল্পের কাঠামো এমন হতে হবে যাতে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় ঝুঁকি-রিটার্ন কাঠামোর সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। নামিবিয়ার সম্পদ, জ্বালানি রূপান্তর এবং পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মিলন নতুন বেসরকারি ইকুইটি ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সুযোগও তৈরি করছে।

দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজির অংশগ্রহণ তাই কোনো গৌণ বিষয় নয়। সঠিক কাঠামো তৈরি করা গেলে এই পুঁজি দেশের শিল্পায়নের অংশীদার হতে পারে। আর তা না হলে দেশের শিল্পায়ন চোখের সামনে ঘটলেও দেশীয় সঞ্চয় তার বাইরে থেকে যেতে পারে।

খনির জীবন শেষ হলেও বিনিয়োগের দায়িত্ব শেষ নয়

দায়িত্বশীল খনি বিনিয়োগের অর্থ শুধু উৎপাদনের সময় পরিবেশগত ও সামাজিক মানদণ্ড মেনে চলা নয়। খনি বন্ধ হওয়ার পর কী হবে, সেই পরিকল্পনাও শুরু থেকেই বিনিয়োগ কাঠামোর অংশ হওয়া উচিত।

পরিবেশ পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ সংরক্ষণ, স্থানীয় উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি গড়ে তোলা এবং এমন অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা প্রয়োজন যা খনি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখতে পারে। একইভাবে কোনো খনির জন্য নির্মিত একক অবকাঠামো ভবিষ্যতে বৃহত্তর অঞ্চলের জনসাধারণের সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হলে তার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য আরও বাড়ে।

এ কারণেই খনি কোম্পানিগুলোর এমন বিনিয়োগ অংশীদার বেছে নেওয়া জরুরি, যারা দায়িত্বশীল বিনিয়োগ, পরিবেশ-সামাজিক-সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের বিষয়ে একই দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে।

নামিবিয়ার সাম্প্রতিক মাইনিং এক্সপোতে প্রেসিডেন্ট নেতুম্বো নান্দি-নদাইতওয়াহ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, খনি খাত কেবল আরেকটি অর্থনৈতিক খাত নয়। ষষ্ঠ জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার আটটি অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে এটিকে প্রথম স্থানে রাখা হয়েছে। ফলে খাতটির সাফল্য শুধু কত টন খনিজ উত্তোলন হলো বা কত অর্থ রপ্তানি আয় হলো—তা দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। কর্মসংস্থান, অবকাঠামো এবং খনি-সংলগ্ন জনগোষ্ঠীর জন্য ভাগাভাগি সমৃদ্ধিও সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত।

খনি একদিন শেষ হবে। কিন্তু সেই খনিকে ঘিরে তৈরি পুঁজি, অবকাঠামো, দক্ষতা ও স্থানীয় ব্যবসার সক্ষমতা যদি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়, তাহলে সম্পদ উত্তোলনের সুফল তার উৎপাদনকাল পেরিয়েও টিকে থাকতে পারে।

নামিবিয়ার খনিজ মূল্য সংযোজন নীতি যখন চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে, তখন মূল প্রশ্ন হবে শুধু কোন খনিজ উত্তোলন করা হবে তা নয়; বরং সেই খনিজ থেকে কতটা মূল্য দেশে রাখা যাবে। স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিল্পায়ন ও পরবর্তী ধাপের শিল্প সক্ষমতা গড়ে তুলতে হলে পুঁজিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে সরকার, খনি কোম্পানি, বিনিয়োগকারী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাস্তব অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্থানীয় শিল্পনীতির আলোচনায় স্থানীয় পুঁজিকেও জায়গা দিতে হবে। কারণ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে তৈরি ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির মালিকানা যদি দেশের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবেই খনিজ সম্পদ শুধু রপ্তানি আয়ের উৎস না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সম্পদে পরিণত হবে।