ঘুমকে আরামদায়ক করতে প্রায় তিন হাজার ডলারের বিশেষ গদি-ঢাকনা বানিয়ে আলোচনায় এসেছিল ‘এইট স্লিপ’। বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের ঘুমের সঙ্গী হিসেবে পরিচিত এই প্রযুক্তিপণ্য এবার আরও বড় স্বপ্ন দেখছে। বিলাসী ঘুমের সামগ্রী হিসেবে পরিচিতি পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন নিদ্রার মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যা শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের চিকিৎসা প্রযুক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।
প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মাত্তেও ফ্রানচেস্কেত্তি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়ার প্রক্রিয়া বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছে। ২০২৫ সাল থেকেই নিদ্রাজনিত শ্বাসকষ্ট শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তির অনুমোদন পাওয়ার জন্য কাজ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন চিকিৎসা গবেষণাও চলছে।
ধনীদের বিছানা থেকে চিকিৎসাক্ষেত্রে
‘এইট স্লিপ’-এর তৈরি বিশেষ গদি-ঢাকনার দাম প্রায় তিন হাজার ডলার। বিশ্বের অন্যতম ধনী উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক ও মার্ক জাকারবার্গের মতো ব্যক্তিরাও এটি ব্যবহার করেন বলে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। তবে এখন প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য আর কেবল ধনী ও তারকাদের কাছে পণ্য বিক্রি করা নয়।
প্রতিষ্ঠানটি চাইছে এমন একটি চিকিৎসা প্রযুক্তি তৈরি করতে, যার ব্যয় বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো বহন করবে। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত বিলাসপণ্য থেকে চিকিৎসার আওতাভুক্ত প্রযুক্তিতে পরিণত হওয়াই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।
বর্তমানে পণ্যটির কার্যকারিতা নিয়ে স্বাধীনভাবে প্রকাশিত গবেষণার সংখ্যা সীমিত। একটি স্বাধীন গবেষণা প্রকাশিত হলেও আরও কয়েকটি গবেষণার ফলাফল এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি। তবে নিদ্রাজনিত শ্বাসকষ্ট নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অর্থায়নে পরিচালিত কয়েকটি গবেষণা বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতেও প্রকাশিত হয়েছে।
কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি
এই যন্ত্রটি সাধারণ গদির ওপর বসানো হয়। এর সঙ্গে থাকা একটি নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ভেতরের নলের মাধ্যমে গরম বা ঠান্ডা পানি প্রবাহিত করে। ফলে বিছানার দুই পাশের তাপমাত্রা আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
যন্ত্রে থাকা বিভিন্ন সংবেদক ঘুমের সময় হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস ও শরীরের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে রাতভর তাপমাত্রা পরিবর্তন করে এবং ঘুমের একটি পরিমাপ তৈরি করে।
তবে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ও বিস্তারিত তথ্য পেতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১৯৯ থেকে ৩৯৯ ডলার পর্যন্ত অর্থ দিতে হয়। এই অর্থ না দিলে ব্যবহারকারীরা কেবল হাতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের সঙ্গে নতুন প্রতিযোগিতা
নিদ্রার মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের ঘড়ি ও আংটির মতো প্রযুক্তিপণ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেয়েছে। তবে ঝুঁকি শনাক্ত করা আর চিকিৎসাগতভাবে রোগ নির্ণয় করা এক বিষয় নয়।
‘এইট স্লিপ’ আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে চাইছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো, একজন মানুষের প্রতি ঘণ্টায় কতবার শ্বাস বন্ধ হচ্ছে, তার পরিমাণ নির্ধারণে সহায়তা করা। এ ধরনের ব্যবস্থা চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহারের উপযোগী হতে পারে।
এর পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চলতি আগস্টে একটি চিকিৎসা গবেষণাও শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সেখানে পরীক্ষা করা হচ্ছে, যন্ত্রটি নিদ্রাজনিত শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের অবস্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তন করে সমস্যাটি কমাতে পারে কি না।
সফল হলে এটি শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত শ্বাসযন্ত্রের বিকল্প হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

লক্ষ্য এখন বিমা প্রতিষ্ঠানের অর্থ
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহীর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো, মানুষ যেন নিজের পকেট থেকে হাজার হাজার ডলার খরচ করে এই পণ্য না কিনে চিকিৎসা বিমার আওতায় এটি পেতে পারে।
বর্তমানে বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে পণ্যটির জন্য স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত কিছু সঞ্চয় ও ব্যয় হিসাব থেকে অর্থ পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। তবে সত্যিকার অর্থে চিকিৎসা সরঞ্জাম হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, পণ্যটির দাম কমানোর বিষয়েও তারা কাজ করছে। তবে বর্তমান উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কাঠামোয় কীভাবে বড় ধরনের মূল্য কমানো সম্ভব হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গ্যারেজ থেকে দেড়শ কোটি ডলারের প্রতিষ্ঠান
এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে একটি গ্যারেজ থেকে। মাত্তেও ফ্রানচেস্কেত্তি, মাসিমো আন্দ্রেয়াসি বাস্সি ও আলেক্সান্দ্রা জাটারাইন মিলে প্রথম নমুনা তৈরি করেন। বিনিয়োগকারীদের পণ্য দেখাতে তারা এমনকি গ্যারেজেই আয়োজন করেছিলেন ঘুমের পোশাকের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের।
প্রথম দিকেই জনসাধারণের কাছ থেকে ১২ লাখ ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি। লক্ষ্য ছিল মাত্র এক লাখ ডলার। পণ্য বাজারে আসার আগেই প্রায় আট হাজার মানুষ অগ্রিম অর্ডার করেছিলেন।
এরপর একের পর এক বিনিয়োগ এসেছে। ২০১৮ সালে ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার, ২০২১ সালে ৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার এবং ২০২৫ সালে ১০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পায় প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৬ সালের মার্চে আরও ৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের পর প্রতিষ্ঠানটির মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৫০ কোটি ডলারে।
সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ৩১ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে।
বিলাসপণ্য নয়, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি হতে চায়
‘এইট স্লিপ’ এখন ৩৫টি দেশে পণ্য বিক্রি করছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, গত কয়েক বছরে তাদের ব্যবসা দ্রুত বেড়েছে এবং ২০২৫ সালেও তারা লাভ করেছে। পণ্যটির মোট বিক্রির পরিমাণও ৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জানিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৮৫ শতাংশ গ্রাহকের কাছেই ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের পরিধানযোগ্য স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি রয়েছে। ফলে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু স্মার্ট গদির বাজারে নয়; বরং ঘুম, শরীর ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণকারী প্রযুক্তির বৃহত্তর বাজারে।
প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা আলেক্সান্দ্রা জাটারাইনের ভাষায়, তারা এমন একটি বাজার তৈরি করতে চাইছেন, যার অস্তিত্ব এখনো আলাদাভাবে গড়ে ওঠেনি।
ঘুমের সমস্যার বিশাল বাজার
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ রাতে সাত ঘণ্টার কম ঘুমান। অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে দেশটির অর্থনীতিতে বছরে শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হয়।
এর মধ্যে নিদ্রাজনিত শ্বাসকষ্ট আরও বড় সমস্যা। অনেক মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হলেও সময়মতো তা শনাক্ত হয় না। ফলে এই রোগ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তির জন্য বিশাল বাজার তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
‘এইট স্লিপ’ সেই সুযোগকেই কাজে লাগাতে চাইছে। তবে বড় প্রশ্ন হলো, একটি বিলাসী ঘুমের প্রযুক্তিকে চিকিৎসা সরঞ্জামে রূপান্তর করা কতটা সফল হবে।
শুধু ঘুম নয়, ক্যানসার চিকিৎসাতেও নজর
প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুধু নিদ্রাজনিত শ্বাসকষ্টে সীমাবদ্ধ নয়। প্রধান নির্বাহী জানিয়েছেন, ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তির বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
কিছু রোগীর হরমোনভিত্তিক চিকিৎসার কারণে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক ক্ষমতা ব্যাহত হয়। এমন রোগীদের জন্য শরীরের তাপমাত্রা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিতে পারে।
একসময় ধনীদের আরামদায়ক ঘুমের জন্য তৈরি হওয়া একটি ব্যয়বহুল গদি-ঢাকনা এখন তাই চিকিৎসা প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে। নিয়ন্ত্রক অনুমোদন ও চিকিৎসা গবেষণায় সফলতা এলে ‘এইট স্লিপ’ হয়তো আর বিলাসী ঘুমের পণ্য হিসেবে পরিচিত থাকবে না; বরং ঘুম ও স্বাস্থ্যসেবার নতুন এক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।
ঘুমের আরাম থেকে রোগ শনাক্তকরণ, আর সেখান থেকে চিকিৎসা—এই পথেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হওয়ার স্বপ্ন দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।
ঘুমের প্রযুক্তি থেকে চিকিৎসা প্রযুক্তিতে রূপান্তরই এখন ‘এইট স্লিপ’-এর সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















