যুক্তরাজ্যে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে মেসোথেলিওমা নামের দুরারোগ্য ক্যানসারে মারা গেছেন ক্যারোলিন ব্রায়ান। তাঁর পরিবারের দাবি, কৈশোরে যে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন, সেখানেই অ্যাসবেস্টসের সংস্পর্শে এসে প্রাণঘাতী এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন তিনি। মায়ের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে এখন আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর মেয়ে ব্রুকলিন।
ক্যারোলিনের মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে পুরোনো বিদ্যালয় ভবনগুলোতে থাকা অ্যাসবেস্টস কতটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং দীর্ঘদিন পর এর প্রভাব কীভাবে মানুষের জীবনে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
অল্প বয়সেই থেমে গেল জীবন
ক্যারোলিনের বয়স যখন ৪৫, তখন তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে মেসোথেলিওমা—অ্যাসবেস্টসের আঁশ শরীরে প্রবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি দুরারোগ্য ক্যানসার।
প্রথম দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে আরও কয়েক বছর বেঁচে থাকার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু রোগ ধরা পড়ার মাত্র তিন মাস পরই ৪৬ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
ক্যারোলিনের মেয়ে ব্রুকলিন জানান, মায়ের এমন মৃত্যু তাঁদের পুরো পরিবারকে বিপর্যস্ত করে দেয়। মাত্র ২৩ বছর বয়সে তাঁকে ঘর চালানো, বিল পরিশোধ, রান্না ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো দায়িত্ব নিতে হয়। তাঁর ভাষায়, মাকে হারিয়ে তাঁকে যেন এক রাতের মধ্যেই বড় হয়ে যেতে হয়েছিল।

কোথা থেকে এসেছিল অ্যাসবেস্টসের সংস্পর্শ?
ক্যারোলিনের পেশাগত জীবনে এমন কোনো কাজ ছিল না, যেখানে নিয়মিত অ্যাসবেস্টসের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা থাকে। পরিবারও এমন কোনো অ্যাসবেস্টসযুক্ত বাড়িতে বসবাস করেনি বলে জানিয়েছে।
তাই অসুস্থ হওয়ার পর ক্যারোলিন নিজের অতীত খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। পরিবারের ধারণা, কার্ডিফের পুরোনো ফিটজালান বিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়ই তিনি অ্যাসবেস্টসের আঁশের সংস্পর্শে এসে থাকতে পারেন। পরিবারের আইনজীবীরা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নথি পরীক্ষা করে সেখানে অ্যাসবেস্টসের ব্যাপক ব্যবহারের তথ্য পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
ব্রুকলিনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর মা বিদ্যালয় ভবনের দুরবস্থা নিয়ে কথা বলতেন। ভাঙা ছাদের টাইলস, ধুলা ও নির্মাণসামগ্রীর ধ্বংসাবশেষের মতো বিষয়ও তিনি স্মরণ করেন। তবে তখন তাঁরা জানতেন না এসবের মধ্যে অ্যাসবেস্টস থাকতে পারে।
মৃত্যুর আগে ন্যায়বিচারের উদ্যোগ
মৃত্যুর আগে ক্যারোলিন একজন আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তাঁর পরিবারের ভাষ্য, তিনি শুধু নিজের জন্য ন্যায়বিচার চাননি; ভবিষ্যতে যেন অন্য কেউ একই পরিস্থিতির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন।
এখন তাঁর পরিবার কার্ডিফ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলা করেছে। মামলাটি ২০২৭ সালের শুরুতে শুনানির জন্য নির্ধারিত রয়েছে। তবে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার কারণে কর্তৃপক্ষ ক্যারোলিনের নির্দিষ্ট মামলা নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

বিদ্যালয়গুলোতে এখনো রয়েছে অ্যাসবেস্টস
যুক্তরাজ্যের বহু পুরোনো বিদ্যালয় ভবন নির্মাণে অ্যাসবেস্টস ব্যবহার করা হয়েছিল। এর স্বাস্থ্যঝুঁকি স্পষ্ট হওয়ার পর ১৯৯৯ সালে যুক্তরাজ্যে এটি নিষিদ্ধ করা হয়।
তবে নিষেধাজ্ঞার অর্থ এই নয় যে পুরোনো ভবনগুলো থেকে অ্যাসবেস্টস পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের বহু বিদ্যালয়ে এখনো অ্যাসবেস্টসযুক্ত নির্মাণসামগ্রী রয়েছে। এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাতাসে অতি সূক্ষ্ম আঁশ ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ওয়েলসের ২২টি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে ২০টির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৮১ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অ্যাসবেস্টসযুক্ত নির্মাণসামগ্রী রয়েছে।
কম বয়সীদের মধ্যেও বাড়ছে উদ্বেগ
মেসোথেলিওমা সাধারণত দীর্ঘ সময় পর প্রকাশ পায়। অ্যাসবেস্টসের একটি আঁশ ফুসফুসে আটকে যাওয়ার বহু দশক পরও এই রোগ দেখা দিতে পারে। যুক্তরাজ্যে প্রতিবছর এ রোগে প্রায় ২ হাজার ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়। সাধারণত বয়স্কদের মধ্যে এর প্রকোপ বেশি এবং ভারী শিল্প বা নির্মাণকাজের মতো পেশায় যুক্ত পুরুষদের ঝুঁকিও বেশি।
তবে রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক জুলিয়ান পেটোর মতে, সাম্প্রতিক কিছু তথ্য উদ্বেগ তৈরি করছে। ব্রিটেনে ৪০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে মেসোথেলিওমার ঘটনা গত কয়েক বছরে বছরে গড়ে আড়াইটি থেকে বেড়ে পাঁচটিতে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে নারী শিক্ষকদের মধ্যেও এই রোগের ঝুঁকি সামান্য হলেও বেড়েছে বলে তাঁর গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তিনি অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, এসব তথ্য এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যালয়ে অ্যাসবেস্টসের ব্যবস্থাপনা কীভাবে করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পুরোনো ভবন থেকে বড় পরিমাণ অ্যাসবেস্টস সরানোর সময় মানুষ আঁশের সংস্পর্শে এসেছে কি না, অথবা ভবনের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়প্রাপ্ত অ্যাসবেস্টস থেকে আঁশ ছড়িয়েছে কি না—এ নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
শিক্ষকদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে রোগের ঘটনা
ক্যারোলিনের ঘটনা একমাত্র নয়। লিন্ডা ল্যাংহেল্ট নামে অবসরপ্রাপ্ত এক বিজ্ঞান শিক্ষিকার পরিবারও মনে করে, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি অ্যাসবেস্টসের সংস্পর্শে এসে থাকতে পারেন। শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর তাঁর মেসোথেলিওমা শনাক্ত হয়। রোগটি শনাক্ত হওয়ার ১৮ মাস পর ৮২ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
আইনজীবী রিচার্ড গ্রিন জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এমন আরও নারী এবং তুলনামূলক কম বয়সী মানুষের মামলা তাঁদের কাছে আসছে, যারা কোথায় অ্যাসবেস্টসের সংস্পর্শে এসেছিলেন তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না।
নিরাপত্তার আশ্বাস কর্তৃপক্ষের

কার্ডিফ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের ভবনগুলোতে অ্যাসবেস্টস ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা রয়েছে। ভবনগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়, অ্যাসবেস্টসের নথি সংরক্ষণ ও পর্যালোচনা করা হয় এবং যেসব উপাদানে অ্যাসবেস্টস রয়েছে, সেগুলোর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ওয়েলস সরকারও জানিয়েছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও কর্মীদের নিরাপত্তা তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। পুরোনো ভবনগুলোকে নিরাপদ রাখার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সহায়তা ও দিকনির্দেশনা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে তারা।
ক্যারোলিনের পরিবারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কিশোর বয়সে বিদ্যালয়ে অ্যাসবেস্টসের সম্ভাব্য সংস্পর্শই কি কয়েক দশক পর তাঁর প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল? আদালতের শুনানিতে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে। আর ব্রুকলিনের কাছে এটি শুধু একটি আইনি লড়াই নয়; মায়ের অসময়ে চলে যাওয়ার কারণ জানার এবং ভবিষ্যতে অন্য পরিবারকে একই শোক থেকে রক্ষা করার চেষ্টা।
মেসোথেলিওমা, অ্যাসবেস্টসের ঝুঁকি, পুরোনো বিদ্যালয় ভবন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি—এই চারটি বিষয়ই এখন নতুন করে জননিরাপত্তার আলোচনায় উঠে এসেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















