০১:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
পশ্চিম সাহারায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের মেয়াদ আরও এক বছর, ক্ষুব্ধ আলজেরিয়া পাকিস্তানে শোকের মাতম, অভিবাসীবাহী নৌকা ডুবে নিখোঁজ ৪০ জনের বেশি মারাদোনার মৃত্যুর মামলায় বাবার চিকিৎসা পরীক্ষার রিপোর্ট, আদালতে চাঞ্চল্য ফ্র্যাঙ্ক বিয়ার্ডের মৃত্যুর পর প্রথম কনসার্টে মঞ্চে জেডজেড টপ জ্বালানি সংকটের ক্ষত এখনো শুকায়নি, ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাশ্রয়ী বিমান সংস্থাগুলো অভিবাসী শিশুদের সহায়তায় অনুদানের আহ্বান, কেসি মাসগ্রেভসকে বয়কটের ডাক ইরান কি নেতানিয়াহুর ছেলেকে হত্যার চেষ্টা করেছিল? ইরানের সামনে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় কী কী বিকল্প, বাড়তে পারে উপসাগরীয় উত্তেজনা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শূন্য, উল্টো বাড়ছে নতুন আগমন ও শিবিরের অপরাধ মুম্বাইয়ে খাবারের নিরাপত্তায় তুকারাম মুণ্ধের ঝড়, একের পর এক অভিযানে কাঁপছে রেস্তোরাঁ ব্যবসা

বিজ্ঞাপনদাতা থেকে কৌশলবিদ—নতুন ভূমিকায় কতটা প্রস্তুত নির্মাতারা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দুনিয়ায় যারা এতদিন মূলত বিনোদন, জীবনধারা কিংবা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অনুসারী তৈরি করেছেন, তারাই এখন ধীরে ধীরে ব্র্যান্ডের বিপণন কৌশলের অংশ হয়ে উঠছেন। শুধু পণ্যের প্রচার নয়, কোন পণ্য তৈরি হবে, কীভাবে তা মানুষের কাছে পৌঁছাবে, এমনকি বিপণন পরিকল্পনা কী হওয়া উচিত—এসব সিদ্ধান্তেও তাদের মতামত চাওয়া হচ্ছে।

ফ্রান্সের কান শহরে প্রতিবছর আয়োজিত বিশ্বের অন্যতম বড় বিজ্ঞাপন ও বিপণন সম্মেলনে এ পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একসময় যেখানে মূলত বিজ্ঞাপন ও বিপণন জগতের নির্বাহীদের আনাগোনা ছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নির্মাতাদের উপস্থিতি দ্রুত বেড়েছে। চলতি বছর তারা আলোচনাসভা, মধ্যাহ্নভোজ, নৈশভোজ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শুধু অতিথি হিসেবেই ছিলেন না; ব্যবসায়িক বৈঠকেও অংশ নিয়েছেন।

প্রচারক থেকে পরামর্শক

নির্মাতাদের ভূমিকা এখন আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। আগে কোনো ব্র্যান্ড তাদের তৈরি করা প্রচারণা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করত। এখন অনেক প্রতিষ্ঠান তাদেরকে প্রচারণার শুরুতেই যুক্ত করছে।

বিপণন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন নির্মাতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার নিজস্ব দর্শকগোষ্ঠীকে বোঝার ক্ষমতা। কোন ভাষা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য, কোন ধরনের বিষয় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কোন উপস্থাপনা কৃত্রিম মনে হয়—এসব বিষয়ে তারা সরাসরি প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা পান।

ফলে সম্পর্কটি এখন শুধু ‘আমাদের জন্য একটি প্রচারণামূলক ভিডিও বানান’—এ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং ‘কী ধরনের বিষয় তৈরি করা উচিত’—সেই সিদ্ধান্তেও নির্মাতাদের যুক্ত করা হচ্ছে।

অনেক নির্মাতা নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা, পণ্য তৈরি ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের অভিজ্ঞতা অর্জন করায় প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদেরকে কেবল প্রচারমাধ্যম হিসেবে দেখছে না। তাদের কেউ কেউ এখন বিপণন কৌশল, পণ্যের অবস্থান নির্ধারণ, অংশীদার নির্বাচন এবং বাজার সম্প্রসারণ নিয়েও পরামর্শ দিচ্ছেন।

8 Types of Digital Marketing Explained: SEO, PPC, Social Media & More

দর্শকের কাছাকাছি থাকার সুবিধা

নির্মাতাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তাদের দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত বাজার গবেষণায় যে পরিবর্তন ধরা পড়তে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে, একজন জনপ্রিয় নির্মাতা তা তার মন্তব্যঘর, সরাসরি যোগাযোগ কিংবা প্রতিদিনের প্রতিক্রিয়া থেকেই দ্রুত বুঝে ফেলতে পারেন।

তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচারণা তৈরি হয়ে যাওয়ার পর শুধু সেটি বাস্তবায়নের সময় নির্মাতাকে যুক্ত করা যথেষ্ট নয়। পরিকল্পনার শুরুতেই তাদের মতামত নেওয়া হলে এমন অনেক ভুল এড়ানো সম্ভব, যা পরে বড় অর্থ ব্যয়ে সংশোধন করতে হয়।

একজন নির্মাতা বুঝতে পারেন কোন বার্তা তার দর্শকের কাছে স্বাভাবিক মনে হবে আর কোনটি বিজ্ঞাপনের মতো কৃত্রিম শোনাবে। তিনি একই সঙ্গে ভাষা, রুচি ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সূক্ষ্ম ইঙ্গিতও দ্রুত ধরতে পারেন।

তবে এই দক্ষতা আর পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়িক কৌশল এক জিনিস নয়।

জনপ্রিয় হলেই কৌশলবিদ হওয়া যায় না

এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন বিতর্ক। কোনো নির্মাতার বিপুল অনুসারী থাকা মানেই তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করতে পারবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই।

নিজের দর্শক কী চায়, তা জানা এক বিষয়। কিন্তু একটি পুরো বাজার কোন পণ্য চাইছে, একটি শ্রেণির ভোক্তার প্রয়োজন কী, বাজেট কোথায় ব্যয় করা উচিত কিংবা দীর্ঘমেয়াদে একটি ব্র্যান্ড কীভাবে বেড়ে উঠবে—এসব বোঝা সম্পূর্ণ ভিন্ন দক্ষতা।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, স্বতঃস্ফূর্ত ভালো ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি নিজে নিজে পূর্ণাঙ্গ কৌশল হয়ে যায় না। একজন নির্মাতার সাংস্কৃতিক বোধ ও দর্শক-সম্পর্ককে ব্যবসায়িক ফলাফলে রূপ দিতে হলে আরও অনেক দক্ষতার প্রয়োজন।

এ কারণেই সব নির্মাতাকে একই ধরনের দায়িত্ব দেওয়ার বিরোধিতা করছেন বিপণন বিশেষজ্ঞরা। কেউ নিজের পণ্য ও ব্যবসা গড়ে তুলতে আগ্রহী, আবার কেউ কেবল নিজের সৃজনশীলতার জায়গায় থাকতে চান। প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত তাদের শক্তি ও আগ্রহ বুঝে দায়িত্ব দেওয়া।

কান সম্মেলনে অস্বস্তির চিত্র

নতুন দায়িত্বের এই পরিবর্তন কান শহরের বিজ্ঞাপন সম্মেলনেও চোখে পড়েছে। অনেক নির্মাতা সেখানে গিয়ে নিজেদের কিছুটা অপরিচিত কিংবা অভিভূত মনে করার কথা জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর দায় নির্মাতাদের ওপর চাপানো ঠিক নয়। তারা এতদিন বিজ্ঞাপন শিল্পের প্রচলিত ভাষা, রীতি কিংবা অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে কাজ করেননি। বরং সেই জগতের বাইরে থাকার কারণেই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যবান।

তবে কোনো নির্মাতাকে ব্যবসায়িক সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানালে তাকে ব্যবসায়িক অংশীদারের মতো প্রস্তুত করাও আয়োজকদের দায়িত্ব। শুধু ছবি তোলা কিংবা প্রচারণার অংশ হিসেবে তাদের ডেকে এনে আলোচনার প্রকৃত সুযোগ না দিলে সেই অংশগ্রহণ অর্থহীন হয়ে পড়ে।

বাড়তি দায়িত্বের মূল্য কে দেবে?

নির্মাতাদের নতুন ভূমিকার সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—অতিরিক্ত কাজের জন্য অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হবে কি না।

অনেক নির্মাতা সৃজনশীল প্রক্রিয়ার অংশ হতে আগ্রহী। এমনকি কেউ কেউ আলাদা পারিশ্রমিক ছাড়াই নিজেদের মতামত দিতে রাজি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এ ধরনের প্রবণতা ভবিষ্যতে ভুল নজির তৈরি করতে পারে।

A Guide to The Creator Economy (+ Benefits for Brands)

কোনো পণ্যের প্রচারণায় অংশ নেওয়া আর প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে পরামর্শ দেওয়া এক নয়। দর্শকদের আচরণ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া, পণ্যের পরিকল্পনায় মতামত দেওয়া কিংবা সামগ্রিক বিপণন কৌশল নির্ধারণে ভূমিকা রাখা—এসব অতিরিক্ত দায়িত্ব।

তাই দায়িত্ব বাড়লে পারিশ্রমিক, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার অধিকারও বাড়া উচিত। নির্মাতাকে চুপিসারে প্রচারক থেকে কৌশলবিদে পরিণত করে দেওয়া কোনোভাবেই ন্যায্য নয়।

নতুন ধরনের অংশীদারত্বের পথে

এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠান ও নির্মাতাদের মধ্যে আরও গভীর ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। শুধু নির্দিষ্ট প্রচারণার জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বদলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব, এমনকি প্রতিষ্ঠানের মালিকানার অংশ দেওয়ার ব্যবস্থাও বাড়তে পারে।

ইতোমধ্যে কিছু সৌন্দর্যপণ্য প্রতিষ্ঠান নির্মাতাদের মালিকানার অংশীদার হিসেবে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে নির্মাতারা শুধু কোনো পণ্যের প্রচার করবেন না, বরং পণ্যটির সাফল্যের সঙ্গে তাদের নিজস্ব আর্থিক স্বার্থও যুক্ত থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নির্মাতা অর্থনীতির পরবর্তী ধাপের ইঙ্গিত হতে পারে।

নিয়ন্ত্রণ দিতে হবে নির্মাতাদের

নতুন এই ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলোরও মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। নির্মাতাকে যদি কৌশল নির্ধারণে যুক্ত করা হয়, তাহলে তাকে সৃজনশীল স্বাধীনতাও দিতে হবে।

কারণ একজন নির্মাতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার নিজস্ব কণ্ঠ ও দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক। প্রতিষ্ঠান যদি তাকে কঠোরভাবে নির্ধারিত বক্তব্যে আটকে রাখে, তাহলে সেই নির্মাতাকে ব্যবহারের মূল সুবিধাটিই নষ্ট হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্মাতারা যখন গল্প বলার নিয়ন্ত্রণ পান, তখন প্রচারণা আরও স্বাভাবিক, মানবিক ও মৌলিক হয়ে ওঠে। তবে এর জন্য প্রতিষ্ঠানকে সত্যিকার অর্থেই তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নির্মাতাদের তাই ভবিষ্যৎ এখন শুধু প্রচারণার পর্দায় সীমাবদ্ধ নয়। তারা ক্রমেই ব্যবসায়িক আলোচনার টেবিলেও জায়গা করে নিচ্ছেন। কিন্তু এই নতুন ভূমিকায় সফল হতে হলে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ব্যবসায়িক জ্ঞান, কৌশলগত দক্ষতা এবং দায়িত্বের যথাযথ মূল্যায়ন—তিনটিই প্রয়োজন হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নির্মাতাদের নতুন ব্যবসায়িক ভূমিকা এখন বিজ্ঞাপন জগতের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রচারক থেকে কৌশলবিদে রূপান্তরের এই যাত্রা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কতটা স্বাধীনতা, তথ্য ও ন্যায্য পারিশ্রমিক দেয় তার ওপর।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

পশ্চিম সাহারায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের মেয়াদ আরও এক বছর, ক্ষুব্ধ আলজেরিয়া

বিজ্ঞাপনদাতা থেকে কৌশলবিদ—নতুন ভূমিকায় কতটা প্রস্তুত নির্মাতারা?

১১:৪৬:৫০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দুনিয়ায় যারা এতদিন মূলত বিনোদন, জীবনধারা কিংবা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অনুসারী তৈরি করেছেন, তারাই এখন ধীরে ধীরে ব্র্যান্ডের বিপণন কৌশলের অংশ হয়ে উঠছেন। শুধু পণ্যের প্রচার নয়, কোন পণ্য তৈরি হবে, কীভাবে তা মানুষের কাছে পৌঁছাবে, এমনকি বিপণন পরিকল্পনা কী হওয়া উচিত—এসব সিদ্ধান্তেও তাদের মতামত চাওয়া হচ্ছে।

ফ্রান্সের কান শহরে প্রতিবছর আয়োজিত বিশ্বের অন্যতম বড় বিজ্ঞাপন ও বিপণন সম্মেলনে এ পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একসময় যেখানে মূলত বিজ্ঞাপন ও বিপণন জগতের নির্বাহীদের আনাগোনা ছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নির্মাতাদের উপস্থিতি দ্রুত বেড়েছে। চলতি বছর তারা আলোচনাসভা, মধ্যাহ্নভোজ, নৈশভোজ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শুধু অতিথি হিসেবেই ছিলেন না; ব্যবসায়িক বৈঠকেও অংশ নিয়েছেন।

প্রচারক থেকে পরামর্শক

নির্মাতাদের ভূমিকা এখন আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। আগে কোনো ব্র্যান্ড তাদের তৈরি করা প্রচারণা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করত। এখন অনেক প্রতিষ্ঠান তাদেরকে প্রচারণার শুরুতেই যুক্ত করছে।

বিপণন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন নির্মাতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার নিজস্ব দর্শকগোষ্ঠীকে বোঝার ক্ষমতা। কোন ভাষা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য, কোন ধরনের বিষয় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কোন উপস্থাপনা কৃত্রিম মনে হয়—এসব বিষয়ে তারা সরাসরি প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা পান।

ফলে সম্পর্কটি এখন শুধু ‘আমাদের জন্য একটি প্রচারণামূলক ভিডিও বানান’—এ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং ‘কী ধরনের বিষয় তৈরি করা উচিত’—সেই সিদ্ধান্তেও নির্মাতাদের যুক্ত করা হচ্ছে।

অনেক নির্মাতা নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা, পণ্য তৈরি ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের অভিজ্ঞতা অর্জন করায় প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদেরকে কেবল প্রচারমাধ্যম হিসেবে দেখছে না। তাদের কেউ কেউ এখন বিপণন কৌশল, পণ্যের অবস্থান নির্ধারণ, অংশীদার নির্বাচন এবং বাজার সম্প্রসারণ নিয়েও পরামর্শ দিচ্ছেন।

8 Types of Digital Marketing Explained: SEO, PPC, Social Media & More

দর্শকের কাছাকাছি থাকার সুবিধা

নির্মাতাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তাদের দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত বাজার গবেষণায় যে পরিবর্তন ধরা পড়তে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে, একজন জনপ্রিয় নির্মাতা তা তার মন্তব্যঘর, সরাসরি যোগাযোগ কিংবা প্রতিদিনের প্রতিক্রিয়া থেকেই দ্রুত বুঝে ফেলতে পারেন।

তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচারণা তৈরি হয়ে যাওয়ার পর শুধু সেটি বাস্তবায়নের সময় নির্মাতাকে যুক্ত করা যথেষ্ট নয়। পরিকল্পনার শুরুতেই তাদের মতামত নেওয়া হলে এমন অনেক ভুল এড়ানো সম্ভব, যা পরে বড় অর্থ ব্যয়ে সংশোধন করতে হয়।

একজন নির্মাতা বুঝতে পারেন কোন বার্তা তার দর্শকের কাছে স্বাভাবিক মনে হবে আর কোনটি বিজ্ঞাপনের মতো কৃত্রিম শোনাবে। তিনি একই সঙ্গে ভাষা, রুচি ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সূক্ষ্ম ইঙ্গিতও দ্রুত ধরতে পারেন।

তবে এই দক্ষতা আর পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়িক কৌশল এক জিনিস নয়।

জনপ্রিয় হলেই কৌশলবিদ হওয়া যায় না

এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন বিতর্ক। কোনো নির্মাতার বিপুল অনুসারী থাকা মানেই তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করতে পারবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই।

নিজের দর্শক কী চায়, তা জানা এক বিষয়। কিন্তু একটি পুরো বাজার কোন পণ্য চাইছে, একটি শ্রেণির ভোক্তার প্রয়োজন কী, বাজেট কোথায় ব্যয় করা উচিত কিংবা দীর্ঘমেয়াদে একটি ব্র্যান্ড কীভাবে বেড়ে উঠবে—এসব বোঝা সম্পূর্ণ ভিন্ন দক্ষতা।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, স্বতঃস্ফূর্ত ভালো ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি নিজে নিজে পূর্ণাঙ্গ কৌশল হয়ে যায় না। একজন নির্মাতার সাংস্কৃতিক বোধ ও দর্শক-সম্পর্ককে ব্যবসায়িক ফলাফলে রূপ দিতে হলে আরও অনেক দক্ষতার প্রয়োজন।

এ কারণেই সব নির্মাতাকে একই ধরনের দায়িত্ব দেওয়ার বিরোধিতা করছেন বিপণন বিশেষজ্ঞরা। কেউ নিজের পণ্য ও ব্যবসা গড়ে তুলতে আগ্রহী, আবার কেউ কেবল নিজের সৃজনশীলতার জায়গায় থাকতে চান। প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত তাদের শক্তি ও আগ্রহ বুঝে দায়িত্ব দেওয়া।

কান সম্মেলনে অস্বস্তির চিত্র

নতুন দায়িত্বের এই পরিবর্তন কান শহরের বিজ্ঞাপন সম্মেলনেও চোখে পড়েছে। অনেক নির্মাতা সেখানে গিয়ে নিজেদের কিছুটা অপরিচিত কিংবা অভিভূত মনে করার কথা জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর দায় নির্মাতাদের ওপর চাপানো ঠিক নয়। তারা এতদিন বিজ্ঞাপন শিল্পের প্রচলিত ভাষা, রীতি কিংবা অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে কাজ করেননি। বরং সেই জগতের বাইরে থাকার কারণেই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যবান।

তবে কোনো নির্মাতাকে ব্যবসায়িক সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানালে তাকে ব্যবসায়িক অংশীদারের মতো প্রস্তুত করাও আয়োজকদের দায়িত্ব। শুধু ছবি তোলা কিংবা প্রচারণার অংশ হিসেবে তাদের ডেকে এনে আলোচনার প্রকৃত সুযোগ না দিলে সেই অংশগ্রহণ অর্থহীন হয়ে পড়ে।

বাড়তি দায়িত্বের মূল্য কে দেবে?

নির্মাতাদের নতুন ভূমিকার সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—অতিরিক্ত কাজের জন্য অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হবে কি না।

অনেক নির্মাতা সৃজনশীল প্রক্রিয়ার অংশ হতে আগ্রহী। এমনকি কেউ কেউ আলাদা পারিশ্রমিক ছাড়াই নিজেদের মতামত দিতে রাজি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এ ধরনের প্রবণতা ভবিষ্যতে ভুল নজির তৈরি করতে পারে।

A Guide to The Creator Economy (+ Benefits for Brands)

কোনো পণ্যের প্রচারণায় অংশ নেওয়া আর প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে পরামর্শ দেওয়া এক নয়। দর্শকদের আচরণ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া, পণ্যের পরিকল্পনায় মতামত দেওয়া কিংবা সামগ্রিক বিপণন কৌশল নির্ধারণে ভূমিকা রাখা—এসব অতিরিক্ত দায়িত্ব।

তাই দায়িত্ব বাড়লে পারিশ্রমিক, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার অধিকারও বাড়া উচিত। নির্মাতাকে চুপিসারে প্রচারক থেকে কৌশলবিদে পরিণত করে দেওয়া কোনোভাবেই ন্যায্য নয়।

নতুন ধরনের অংশীদারত্বের পথে

এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠান ও নির্মাতাদের মধ্যে আরও গভীর ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। শুধু নির্দিষ্ট প্রচারণার জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বদলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব, এমনকি প্রতিষ্ঠানের মালিকানার অংশ দেওয়ার ব্যবস্থাও বাড়তে পারে।

ইতোমধ্যে কিছু সৌন্দর্যপণ্য প্রতিষ্ঠান নির্মাতাদের মালিকানার অংশীদার হিসেবে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে নির্মাতারা শুধু কোনো পণ্যের প্রচার করবেন না, বরং পণ্যটির সাফল্যের সঙ্গে তাদের নিজস্ব আর্থিক স্বার্থও যুক্ত থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নির্মাতা অর্থনীতির পরবর্তী ধাপের ইঙ্গিত হতে পারে।

নিয়ন্ত্রণ দিতে হবে নির্মাতাদের

নতুন এই ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলোরও মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। নির্মাতাকে যদি কৌশল নির্ধারণে যুক্ত করা হয়, তাহলে তাকে সৃজনশীল স্বাধীনতাও দিতে হবে।

কারণ একজন নির্মাতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার নিজস্ব কণ্ঠ ও দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক। প্রতিষ্ঠান যদি তাকে কঠোরভাবে নির্ধারিত বক্তব্যে আটকে রাখে, তাহলে সেই নির্মাতাকে ব্যবহারের মূল সুবিধাটিই নষ্ট হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্মাতারা যখন গল্প বলার নিয়ন্ত্রণ পান, তখন প্রচারণা আরও স্বাভাবিক, মানবিক ও মৌলিক হয়ে ওঠে। তবে এর জন্য প্রতিষ্ঠানকে সত্যিকার অর্থেই তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নির্মাতাদের তাই ভবিষ্যৎ এখন শুধু প্রচারণার পর্দায় সীমাবদ্ধ নয়। তারা ক্রমেই ব্যবসায়িক আলোচনার টেবিলেও জায়গা করে নিচ্ছেন। কিন্তু এই নতুন ভূমিকায় সফল হতে হলে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ব্যবসায়িক জ্ঞান, কৌশলগত দক্ষতা এবং দায়িত্বের যথাযথ মূল্যায়ন—তিনটিই প্রয়োজন হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নির্মাতাদের নতুন ব্যবসায়িক ভূমিকা এখন বিজ্ঞাপন জগতের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রচারক থেকে কৌশলবিদে রূপান্তরের এই যাত্রা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কতটা স্বাধীনতা, তথ্য ও ন্যায্য পারিশ্রমিক দেয় তার ওপর।