যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজারে নীরবে একটি বড় পরিবর্তন ঘটছে। স্থায়ী চাকরির পাশাপাশি অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক ও প্রকল্পভিত্তিক কাজ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে তরুণ কর্মীদের মধ্যে এই ধরনের কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নিয়োগদাতারাও স্থায়ী কর্মী নিয়োগের বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মী নেওয়ার দিকে ঝুঁকছেন।
সম্প্রতি প্রকাশিত জুলাই মাসের কর্মসংস্থান প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বেসরকারি খাতে চাকরি কমার বিষয়টি বেশি আলোচনায় এলেও এর আড়ালে অস্থায়ী কর্মসংস্থানের একটি ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরে তিন শতাধিক খাতের মধ্যে অস্থায়ী কর্মী সরবরাহ খাত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। বছরের প্রতিটি মাসেই এ খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে। শুধু জুলাই মাসেই যোগ হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০টি চাকরি।
চলতি বছরে তৈরি হওয়া প্রতি ১০টি নতুন চাকরির মধ্যে প্রায় একটি অস্থায়ী পদ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা কেবল অস্থায়ী কর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা বাড়ার ঘটনা নয়; বরং কর্মী ও নিয়োগদাতা—উভয়ের কাজ সম্পর্কে ধারণা বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত।
তরুণদের কাছে অস্থায়ী কাজের আকর্ষণ বাড়ছে
অনিশ্চিত চাকরির বাজারে তরুণদের কাছে চুক্তিভিত্তিক কাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হয়ে উঠছে। ২০২৩ সালের এক সরকারি পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছিল, ২৪ বছরের কম বয়সী কর্মীরা মধ্যবয়সী কর্মীদের তুলনায় প্রায় চার গুণ এবং বয়স্ক কর্মীদের তুলনায় ছয় গুণ বেশি চুক্তিভিত্তিক বা অনিশ্চিত কর্মসংস্থানে যুক্ত ছিলেন।
২০২৫ সালের একটি জরিপেও দেখা যায়, অস্থায়ী কর্মীদের প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ছিল ১৮ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে।
তরুণদের কাছে এই কাজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো স্বাধীনতা। একজন কর্মী একই সময়ে একাধিক প্রকল্পে কাজ করতে পারেন কিংবা পূর্ণকালীন চাকরির পাশাপাশি অতিরিক্ত কাজ নিতে পারেন। ফলে জীবিকা ও ভবিষ্যতের জন্য একক নিয়োগদাতার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় না।
এ প্রজন্মের অনেক কর্মী দীর্ঘমেয়াদি চাকরির অনিশ্চিত প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে নিজের সময়, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত সুস্থতা বিসর্জন দিতে আগের প্রজন্মের মতো আগ্রহী নন। ফলে কাজের ক্ষেত্রে নমনীয়তা তাদের কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নিয়োগদাতারাও চাইছেন নমনীয় কর্মী কাঠামো
শুধু কর্মীদের পছন্দ বদলায়নি, নিয়োগদাতাদের চাহিদাতেও পরিবর্তন এসেছে। মূল্যস্ফীতি, ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বড় কর্মী বাহিনী ধরে রাখার ঝুঁকি কমাতে চাইছে।
প্রকল্পভিত্তিক নিয়োগ তাদের সেই সুযোগ দিচ্ছে। ব্যবসার পরিস্থিতি ভালো থাকলে কর্মী বাড়ানো এবং চাহিদা কমে গেলে দ্রুত কর্মী সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে।
নির্মাণ, পরিবহন, পেশাগত সেবা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অস্থায়ী কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। এর অর্থ এই নয় যে এসব খাত হঠাৎ করে চুক্তিভিত্তিক কাজকে স্থায়ী কর্মসংস্থানের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করেছে। বরং পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত কর্মী কাঠামো সামঞ্জস্য করার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো এই ব্যবস্থা ব্যবহার করছে।
স্থায়িত্বের বদলে নমনীয়তা
কর্মী ও নিয়োগদাতা—দুই পক্ষের পছন্দের এই পরিবর্তন চাকরির প্রচলিত ধারণাকেই বদলে দিচ্ছে।
নিয়োগদাতারা স্থায়ী কর্মীবাহিনীর স্থিতিশীলতার বদলে প্রয়োজনে দ্রুত পরিবর্তন করার ক্ষমতাকে বেশি মূল্য দিচ্ছেন। অন্যদিকে তরুণ কর্মীরা ঐতিহ্যবাহী দীর্ঘমেয়াদি কর্মজীবনের নিশ্চয়তার বদলে নিজের কাজের ধরন, সময় এবং সুযোগের ওপর বেশি নিয়ন্ত্রণ চাইছেন।
অর্থাৎ চাকরির নিরাপত্তার সংজ্ঞাটিও বদলে যাচ্ছে। আগে যেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন চাকরি করাকেই নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখা হতো, সেখানে ভবিষ্যতে বিভিন্ন কাজ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহজে চলাচলের সক্ষমতাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে বাড়ছে ঝুঁকিও
এই পরিবর্তনের কিছু বড় ঝুঁকিও রয়েছে। কর্মীরা যদি একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্বাধীনভাবে কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন, তাহলে ভালো কর্মী ধরে রাখতে নিয়োগদাতাদের আরও বেশি প্রতিযোগিতা করতে হবে।
কর্মীদের ধরে রাখার জন্য শুধু বেতন যথেষ্ট নাও হতে পারে। প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশ, সুযোগ-সুবিধা এবং কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তা না হলে দক্ষ কর্মী হারানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ধরে রাখার ধারাবাহিকতাও ব্যাহত হতে পারে।
অন্যদিকে অবসর গ্রহণের হার বাড়া এবং অভিবাসন কমে যাওয়ার কারণে যোগ্য কর্মীর সংখ্যাও সংকুচিত হতে পারে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দক্ষ কর্মী ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
কর্মীদেরও নিতে হবে নতুন দায়িত্ব
অস্থায়ী কাজের স্বাধীনতার সঙ্গে কর্মীদের ওপর নতুন দায়িত্বও তৈরি হচ্ছে। প্রতিটি স্বল্পমেয়াদি কাজকে ভবিষ্যতের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। একটি প্রকল্প শেষ হওয়ার পর পরবর্তী কাজ পাওয়ার জন্য দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত পরিচিতি ক্রমাগত উন্নত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি দক্ষতা সনদ, বেকারত্বকালীন আর্থিক সহায়তা এবং চাকরি পরিবর্তনের সময়ও বহাল থাকে এমন সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব ব্যবস্থা থাকলে চুক্তি শেষ হওয়া বা অর্থনৈতিক মন্দার সময় কর্মীদের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
ভবিষ্যতের নিরাপত্তার নতুন সংজ্ঞা
অস্থায়ী কর্মসংস্থানে সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি তাই কেবল একটি খাতের পুনরুদ্ধার নয়। এটি শ্রমবাজারের বৃহত্তর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নিয়োগদাতা ও তরুণ কর্মী—উভয়েই ক্রমশ বুঝতে পারছেন, অনিশ্চিত অর্থনীতিতে স্থায়িত্ব সব সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।
ভবিষ্যতের কর্মজগতে হয়তো কোনো প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘদিনের চাকরির নিশ্চয়তা দিতে পারবে না। কর্মীরাও হয়তো একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পুরো কর্মজীবন কাটানোর প্রত্যাশা করবেন না। বরং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে মূল্যবান নিরাপত্তা।
এই পরিবর্তনের ফলে কর্মজীবন আরও স্বাধীন ও নমনীয় হতে পারে। তবে একই সঙ্গে কর্মী ও নিয়োগদাতা—দুই পক্ষকেই নিজেদের দায়িত্ব নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। স্থায়ী চাকরির নিশ্চয়তা যখন ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে, তখন পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই হয়তো আগামী দিনের চাকরির বাজারে সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















