যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অপরাধ দমনের নামে গড়ে উঠেছে এমন এক নজরদারি ব্যবস্থা, যা মানুষের চলাফেরার দীর্ঘ ইতিহাসও অনুসরণ করতে পারে। এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে ফ্লক সেফটি নামের একটি দ্রুত বেড়ে ওঠা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। অপরাধী শনাক্ত করতে পুলিশের কাছে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠলেও প্রতিষ্ঠানটির ক্যামেরা নেটওয়ার্ক নিয়ে এখন নাগরিক অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্যের মালিকানা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গুলির ঘটনায় দুইজন নিহত ও আটজন আহত হওয়ার পর তদন্তকারীদের হাতে ছিল খুব সামান্য তথ্য। সন্দেহভাজন ব্যক্তি সম্পর্কে নির্দিষ্ট পরিচয় জানা ছিল না। শুধু জানা ছিল, তিনি একটি ধূসর রঙের নিসান গাড়িতে চলাচল করেছিলেন, যার নম্বরপ্লেট ছিল ফ্লোরিডার।
এই সামান্য তথ্যই তদন্তকারীদের জন্য বড় সূত্র হয়ে ওঠে। প্রভিডেন্স পুলিশের সদস্যরা ৭০টির বেশি ফ্লক ক্যামেরার তথ্য অনুসন্ধান করে দেখতে পান, ওই গাড়িটি ডিসেম্বরের প্রথম দিন থেকে ১৪ বার ওই ক্যামেরাগুলোর সামনে দিয়ে গেছে। সেখান থেকে গাড়িটির নম্বরপ্লেট শনাক্ত করা হয় এবং জানা যায়, এটি ভাড়া নেওয়া গাড়ি। পরে তদন্তকারীরা গাড়িটির সূত্র ধরে নিউ হ্যাম্পশায়ারের একটি গুদামঘর পর্যন্ত পৌঁছান।
অপরাধ তদন্তে প্রযুক্তিটির এমন সাফল্যই ফ্লকের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। কিন্তু একই প্রযুক্তি যে ব্যক্তিগত জীবনে ভয়াবহ হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করতে পারে, তার উদাহরণও কম নয়।
স্ত্রীর গাড়ি অনুসরণে ৭০০ বারের বেশি অনুসন্ধান
ফ্লক ব্যবস্থার অপব্যবহারের একটি ঘটনায় ফ্লোরিডার এক পুলিশ কর্মকর্তা নিজের বিচ্ছিন্ন থাকা স্ত্রীর গাড়ির গতিবিধি নজরদারি করেন। পুলিশের দাপ্তরিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার ব্যবহার করে তিনি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ওই গাড়ি সম্পর্কে ৭০০ বারের বেশি অননুমোদিত অনুসন্ধান চালান। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ধরনের ঘটনা এখন বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কমছে। বিভিন্ন তদন্তে এমন বহু অভিযোগ সামনে এসেছে, যেখানে পুলিশ সদস্যরা সাবেক বা বর্তমান সঙ্গী, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা অন্য ব্যক্তির গতিবিধি অনুসরণ করতে নজরদারি ক্যামেরার তথ্য ব্যবহার করেছেন।

কীভাবে কাজ করে ফ্লকের নজরদারি ব্যবস্থা
ফ্লকের সৌরশক্তিচালিত ক্যামেরাগুলো শুধু গাড়ির নম্বরপ্লেটের ছবি তোলে না। একটি গাড়ি ক্যামেরার সামনে দিয়ে গেলে তার নির্মাতা, ধরন, রং এবং অন্যান্য শনাক্তযোগ্য বৈশিষ্ট্যও নথিভুক্ত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ৪৯টি অঙ্গরাজ্যের পাঁচ হাজারের বেশি এলাকায় এই ক্যামেরা ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে একটি গাড়ি কোথায়, কখন এবং কতবার চলাচল করেছে—তার একটি দীর্ঘমেয়াদি চিত্র তৈরি করা সম্ভব।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পুলিশ কর্মকর্তারা সাধারণ ভাষায় গাড়ির বর্ণনা দিয়েও অনুসন্ধান চালাতে পারেন। যেমন গাড়ির রং, গাড়ির ধরন কিংবা গাড়িতে থাকা কোনো বিশেষ চিহ্নের বর্ণনা দিয়ে একসঙ্গে বহু এলাকার তথ্য খোঁজা সম্ভব।
ফলে কোনো ব্যক্তির নির্দিষ্ট একটি স্থানে যাওয়ার তথ্যের বদলে তার চলাচলের ধারাবাহিক নকশাই তৈরি হয়ে যেতে পারে।
তথ্য ৩০ দিন থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে সময় অনেক বেশি হতে পারে
ফ্লক সাধারণভাবে বলছে, গ্রাহকদের তথ্য ৩০ দিন পর মুছে ফেলা হয়। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি আরও কম সময়, অর্থাৎ সাত দিনের সংরক্ষণকালকে আদর্শ হিসেবে সুপারিশ করেছে।
তবে আসল সময় নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তির ওপর। লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগের একটি চুক্তি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সেখানে তথ্য পাঁচ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে।
অর্থাৎ প্রকাশ্যে বলা সাধারণ ৩০ দিনের সংরক্ষণ নীতির সঙ্গে কোনো কোনো বাস্তব চুক্তির মধ্যে বিশাল পার্থক্য থাকতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওই চুক্তিতে ফ্লকের তথ্য ব্যবহারের অধিকার সম্পর্কেও বিস্তৃত ভাষা রয়েছে। এমনকি কিছু তথ্য প্রযুক্তি উন্নয়ন ও যন্ত্রভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রশিক্ষণেও ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছিল।
এ কারণেই গোপনীয়তা রক্ষাকারীরা প্রশ্ন তুলছেন, তথ্যের মালিকানা যদি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হয়, তাহলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি সেই তথ্য কতটা সময় ধরে রাখতে পারবে এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারবে?
৩৬ অঙ্গরাজ্যে ক্যামেরার বিরুদ্ধে ক্ষোভ

ফ্লকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এখন শুধু সভা-সমাবেশ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। অন্তত ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে মানুষ এসব ক্যামেরা ভাঙচুর বা নষ্ট করেছে।
নিউইয়র্কে বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে ক্যামেরা কেটে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় ক্যামেরায় রং ছোড়া হয়েছে। আইডাহোতে একটি ট্রাক দিয়ে ক্যামেরায় ধাক্কা দেওয়া হয়েছে। ফ্লোরিডায় এক ব্যক্তি ক্যামেরার দৃষ্টিপথ আটকে রাখতে খুঁটির ওপর কার্ডবোর্ড ধরে চেয়ারে বসে থাকার অভিনব প্রতিবাদও করেছেন।
কোথাও কোথাও স্থানীয় বাসিন্দারা নগর পরিষদের সভায় ব্যাপক প্রতিবাদ জানিয়ে চুক্তি বাতিলের দাবি তুলেছেন।
২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ২৮টি অঙ্গরাজ্যে অন্তত ৮২টি ফ্লক চুক্তি বাতিল হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই বাতিল হয়েছে ৩৯টি চুক্তি।
তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী গ্যারেট ল্যাংলি দাবি করেছেন, এতে ব্যবসায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে না। তার ভাষ্য, নতুন গ্রাহক যুক্ত হওয়ার হার চুক্তি বাতিলের হারের তুলনায় অনেক বেশি।
নয় বছরে ৮৩০ কোটি ডলারের মূল্য
অপরাধ দমনের প্রযুক্তি হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও ফ্লক এখন বিশাল বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি নয় বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এর মূল্যায়ন প্রায় ৮৩০ কোটি ডলার।
প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি খাতের বড় কয়েকটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ফ্লক মোট ১২০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে বলে জানানো হয়। একই সময়ে এর বার্ষিক পুনরাবৃত্ত আয় ৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়।
প্রথম দিকে আবাসিক এলাকার মালিক সমিতিগুলো ছিল ফ্লকের বড় গ্রাহক। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোই প্রধান গ্রাহকে পরিণত হয়।
এখন শুধু নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ নয়, ভিডিও নজরদারি, গুলির শব্দ শনাক্তকরণ, চালকবিহীন উড়োজাহাজ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অনুসন্ধান ব্যবস্থাতেও প্রতিষ্ঠানটি বিস্তৃত হয়েছে।
আইন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে বড় প্রশ্ন
গোপনীয়তা রক্ষাকারীদের মূল প্রশ্ন হলো—জনসমক্ষে চলাচল করা একটি গাড়ির নম্বরপ্লেট দেখা এবং সেই গাড়ির মাসের পর মাস চলাচলের ইতিহাস সংরক্ষণ করা কি একই বিষয়?
একটি ক্যামেরা হয়তো দেখল, একটি গাড়ি সকাল ১০টায় একটি রাস্তা দিয়ে গেল। কিন্তু হাজার হাজার ক্যামেরার তথ্য একত্র করলে একই গাড়ির প্রতিদিনের চলাচলের পূর্ণ চিত্র তৈরি করা সম্ভব।
কোথায় কেউ রাত কাটায়, কোথায় কাজ করে, কোথায় চিকিৎসা নিতে যায়, কোথায় বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে দেখা করে—এসব তথ্যও ধারাবাহিকভাবে অনুমান করা যেতে পারে।
গোপনীয়তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই প্রযুক্তিটির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। কারণ এটি শুধু একটি মুহূর্তের অবস্থান জানায় না; একজন মানুষের জীবনযাত্রার গতিপথ পুনর্গঠন করার সুযোগ তৈরি করে।
এক শহরের নিয়ম কি অন্য শহরে কার্যকর?
আরেকটি বড় সমস্যা হলো আন্তঃএলাকাভিত্তিক তথ্য ভাগাভাগি। কোনো একটি শহর যদি তার তথ্য ৩০ দিন রাখে, অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা সংস্থা সেই তথ্যের অনুলিপি নিয়ে গেলে একই সীমা সব সময় প্রযোজ্য নাও হতে পারে।
ফলে বিভিন্ন এলাকার তথ্য একত্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের চলাচলের একটি বিশাল অনুসন্ধানযোগ্য ঐতিহাসিক ভাণ্ডার তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এমন একটি ঘটনায় টেক্সাসের এক শেরিফের সহকারী দেশজুড়ে ফ্লক ক্যামেরার তথ্য অনুসন্ধান করেছিলেন এমন এক নারীকে খুঁজতে, যিনি গর্ভপাত করিয়েছেন বলে সন্দেহ করা হয়েছিল।
আরেক ঘটনায় উইসকনসিনের পুলিশ একটি গাড়ির বারবার মিশিগানে যাওয়ার তথ্যকে ভিত্তি করে গাড়িটির বিরুদ্ধে মাদক-সংক্রান্ত সন্দেহ তৈরি করে তল্লাশির পথ তৈরি করেছিল।
চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী নাগরিকদের অযৌক্তিক তল্লাশি ও জব্দের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু প্রযুক্তির এই নতুন যুগে সেই সুরক্ষা কতটা কার্যকর—তা নিয়ে আইনি বিতর্ক বাড়ছে।
আদালত এর আগে বলেছে, জনসাধারণের রাস্তায় চলাচলকারী চালকের গোপনীয়তার প্রত্যাশা সীমিত। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের অবস্থান-তথ্য একত্র করে কারও দৈনন্দিন জীবন পুনর্গঠন করা হলে সেটিকে শুধু একটি গাড়ির প্রকাশ্য চলাচল হিসেবে দেখা যায় কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
গোপনীয়তা বিশেষজ্ঞদের যুক্তি, পুলিশ যদি কোনো ব্যক্তির অবস্থান-তথ্য সরাসরি সংগ্রহ করতে আদালতের অনুমতি নিতে বাধ্য হয়, তাহলে বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একই ধরনের তথ্য কেনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের আইনি সুরক্ষা থাকা উচিত।
এই প্রশ্নের সমাধান এখনো পুরোপুরি হয়নি।
অপরাধ দমন নাকি সর্বব্যাপী নজরদারি?
ফ্লকের প্রযুক্তি যে অপরাধ তদন্তে কার্যকর, তার বাস্তব উদাহরণ রয়েছে। নিখোঁজ শিশু খুঁজে বের করা, চুরি যাওয়া গাড়ি উদ্ধার, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কিংবা সহিংস অপরাধের সূত্র খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে এসব ক্যামেরা পুলিশের হাতে এমন তথ্য দিতে পারে, যা অন্যভাবে পাওয়া কঠিন।
কিন্তু একই প্রযুক্তি যদি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, অযৌক্তিক অনুসন্ধান কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের নজরদারিতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে এর ঝুঁকিও ব্যাপক।
এ কারণেই ফ্লক এখন শুধু একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপত্তা বনাম ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পুরোনো দ্বন্দ্বকে নতুন মাত্রায় নিয়ে আসা একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।
একদিকে পুলিশ বলছে, অপরাধী ধরতে এমন প্রযুক্তি অপরিহার্য। অন্যদিকে নাগরিক অধিকারকর্মীরা বলছেন, অপরাধ দমনের নামে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত নয়, যেখানে একজন সাধারণ নাগরিকের প্রতিদিনের চলাফেরাও অদৃশ্যভাবে নথিভুক্ত হয়ে থাকে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ফ্লক ক্যামেরা থাকবে কি থাকবে না—তা নয়। প্রশ্ন হলো, নিরাপদ সমাজ গড়তে একজন মানুষের স্বাধীনভাবে চলাফেরার কতটুকু তথ্য রাষ্ট্র, পুলিশ কিংবা বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া গ্রহণযোগ্য।
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, ফ্লক ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে, নাকি অতিরিক্ত নজরদারির প্রতীক হিসেবে মানুষের প্রতিরোধের মুখে পড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















