যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রেস্তোরাঁ প্রচলিত টিপস বা বকশিশের ব্যবস্থা পুরোপুরি তুলে দিয়ে কর্মীদের বেশি নির্দিষ্ট বেতন দেওয়ার পথে হাঁটছে। তাদের যুক্তি, খাবারের দাম কিছুটা বেশি হলেও এতে কর্মীদের আয় স্থিতিশীল হয় এবং গ্রাহকও আগে থেকেই জানতে পারেন, শেষ পর্যন্ত কত টাকা দিতে হবে।
খাবারের দামেই যুক্ত হচ্ছে কর্মীদের বেতন
সান ফ্রান্সিসকোর একটি রেস্তোরাঁয় মদ পরিবেশনের দায়িত্বে থাকা ক্যারোলিন ক্রেটজার ঘণ্টায় ৪০ ডলার আয় করেন। শহরের বেশির ভাগ খাবার পরিবেশনকারী কর্মীর স্বাভাবিক মজুরির তুলনায় এটি প্রায় দ্বিগুণ। তবে এই রেস্তোরাঁয় একজন গ্রাহকের জন্য নির্ধারিত খাবারের দাম ১৪০ ডলার এবং এখানে কোনো বকশিশ নেওয়া হয় না।
রেস্তোরাঁটির নীতি হলো, মেনুতে যে দাম দেখা যায়, গ্রাহককে শেষ পর্যন্ত সেই দামই দিতে হবে। অতিরিক্ত বকশিশের প্রয়োজন নেই।
ক্রেটজারের মতে, এখন আর অপরিচিত মানুষের উদারতার ওপর নির্ভর করে মাসের খরচ চালাতে হয় না। প্রচলিত ব্যবস্থায় পরিবেশনকারীরা বকশিশ থেকে ভালো আয় করলেও অতিথিরা আসার আগে প্রস্তুতির সময় এবং অতিথিরা চলে যাওয়ার পর গুছিয়ে নেওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রেই তাদের ন্যূনতম মজুরিতেই কাজ করতে হয়।
রান্নাঘরের কর্মীদের আয়েও সমতা
ম্যাসাচুসেটসের নাইটশেড নুডল বার পাঁচ বছর আগে বকশিশহীন ব্যবস্থা চালু করে। রেস্তোরাঁটির মালিক ও রাঁধুনি র্যাচেল মিলারের প্রধান লক্ষ্য ছিল রান্নাঘরের কর্মীদের সঙ্গে পরিবেশনকারীদের আয়ের বৈষম্য কমানো।
তার ভাষায়, রান্নাঘরে যারা দীর্ঘ সময় শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করেন, তারা একই সময় কাজ করেও পরিবেশনকারীদের তুলনায় অনেক কম আয় করতেন। বকশিশের ক্ষেত্রে বৈষম্যের আরেকটি দিকও তিনি লক্ষ্য করেন। তার দাবি, শ্বেতাঙ্গ পুরুষ কর্মীরা তুলনামূলক বেশি বকশিশ পেলেও অন্য কর্মীরা কম পেতেন।
এই পরিস্থিতি বদলাতে রেস্তোরাঁটি খাবারের দাম বাড়িয়ে কর্মীদের বেশি বেতন দিতে শুরু করে। এখন সন্ধ্যা ছয়টার আগের সাত পদের খাবারের দাম শুরু হচ্ছে ১০২ ডলার থেকে, আর নয় পদের খাবারের দাম ১২৬ ডলার থেকে।
মিলারের মতে, অন্য একই ধরনের রেস্তোরাঁর তুলনায় তাদের খাবারের দাম বেশি হলেও এর মধ্যে কর্মীদের যথাযথ বেতন দেওয়ার পুরো খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গ্রাহকের কাছে বেশি দামই বড় সমস্যা
তবে বকশিশ তুলে দেওয়া সব রেস্তোরাঁর জন্য সফল হয়নি। ম্যাসাচুসেটসের তালুল্লা নামের একটি রেস্তোরাঁ ২০২০ সালে বকশিশ বন্ধ করেছিল। কর্মীদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করতে তারা খাবারের দাম ২৩ শতাংশ বাড়ায়।
কিন্তু কয়েক মাস পর তারা বুঝতে পারে, এই ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রেস্তোরাঁটি আবার বকশিশ চালু করে।

এর অন্যতম কারণ হলো করের হিসাব। বকশিশ রেস্তোরাঁর সরাসরি আয় হিসেবে গণ্য না হলেও খাবারের দাম বাড়ালে সেই বাড়তি অর্থ রেস্তোরাঁর রাজস্বের অংশ হয়। ফলে বিক্রয় করও বেড়ে যায়।
খাদ্য ও পানীয় ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম মাইকেল লিনের মতে, বকশিশহীন ব্যবস্থার বড় সমস্যা হলো গ্রাহকেরা খাবারের নতুন দামের হিসাব সহজে মানিয়ে নিতে পারেন না। আগে কম দাম দেখে পরে বকশিশ দেওয়ার বদলে এখন শুরুতেই বেশি দাম দিতে হওয়ায় তাদের কাছে বাইরে খেতে যাওয়ার খরচ বেশি মনে হয়। এতে গ্রাহক কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কেউ আবার বকশিশ না থাকায় স্বস্তি পাচ্ছেন
নিউইয়র্কের নিরামিষভোজী রেস্তোরাঁ ডার্ট ক্যান্ডি ২০১৫ সালেই বকশিশ বন্ধ করেছিল। মালিক ও প্রধান রাঁধুনি আমান্ডা কোহেনের উদ্দেশ্য ছিল সব কর্মীর আয়কে আরও সমতাভিত্তিক করা। বর্তমানে তার কর্মীরা ঘণ্টায় প্রায় ৩০ ডলার পান।
কোহেন জানান, অনেক গ্রাহক যখন বুঝতে পারেন যে খাবারের দামের ওপর অতিরিক্ত ২০ শতাংশ বকশিশ দিতে হবে না, তখন তারা বরং স্বস্তি প্রকাশ করেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার অকল্যান্ডে বকশিশহীন একটি রেস্তোরাঁয় কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই চলচ্চিত্র নির্মাতা ক্যাসিডি ভ্যান ডার ক্যাম্প এ বিষয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন। আগে তিনি ঘণ্টায় প্রায় ১০ ডলার মজুরি ও বকশিশ পেতেন। ব্যবস্থা বদলের পর তার আয় দাঁড়ায় ঘণ্টায় ২১ ডলারে।
তার কাছে সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল আয়ের নিশ্চয়তা। কোনো দিন কম বকশিশ পাওয়ার পর নিজের কাজ নিয়ে সন্দেহ করার প্রয়োজন হতো না।
বাড়ছে ‘বকশিশে ক্লান্তি’

তবে বকশিশ পুরোপুরি তুলে দেওয়ার পথে বড় বাধাও রয়েছে। অনেক পরিবেশনকারী কর্মী বকশিশ থেকে বেশি আয় করতে পারেন। ফলে বকশিশহীন রেস্তোরাঁর জন্য দক্ষ কর্মী আকর্ষণ ও ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত বকশিশ দেওয়ার চাপ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে বিরক্তি বাড়ছে। খাবার, কফি কিংবা বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি বকশিশ চাওয়ার প্রবণতাকে অনেকেই বিরক্তিকর মনে করছেন।
তবু বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই প্রবণতা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে খুব দ্রুত বকশিশের প্রচলন শেষ হয়ে যাবে না। কারণ বকশিশ তুলে দিলে যে অর্থনৈতিক অসুবিধা তৈরি হয়, তা অনেক রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সুবিধার চেয়ে বড়।
তবে নাইটশেড নুডল বারের মালিক মিলার নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুতপ্ত নন। তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলো কর্মীদের দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানে থাকা। রেস্তোরাঁ খাতে কর্মী বদলের হার বেশি হলেও বকশিশহীন ব্যবস্থা চালুর পরও তার অনেক কর্মী সেখানে থেকে গেছেন। তার মতে, এতে কর্মী ও গ্রাহক—দুই পক্ষই মূল্যবান সুবিধা পেয়েছেন।
মেনুতে দাম কিছুটা বেশি হলেও ভবিষ্যতে আরও রেস্তোরাঁ যদি বকশিশ বাদ দিয়ে সরাসরি কর্মীদের ন্যায্য মজুরি দেওয়ার পথে হাঁটে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের খাবার পরিবেশন খাতে প্রচলিত বেতন কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















