পৃথিবীর মহাসাগরগুলোতে আবারও তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের সঙ্গে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো পরিস্থিতি মিলিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছেছে।
রেকর্ড ভাঙল সমুদ্রের তাপমাত্রা
ইউরোপীয় কোপার্নিকাস জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মেরু অঞ্চল বাদে বিশ্বের সমুদ্রগুলোর গড় পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা শনিবার ২১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। এর আগে সর্বোচ্চ ২১ দশমিক ০৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল ২০২৪ সালের মার্চ মাসে তিনটি পৃথক দিনে।
তবে এবারের রেকর্ডের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো সময়কাল। সাধারণত বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের তাপমাত্রা মার্চ বা এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে। অথচ আগস্টেই এবার সেই রেকর্ড ভেঙে গেছে।
পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে উত্তর গোলার্ধের তুলনায় সমুদ্রের বিস্তৃতি বেশি। ফলে বৈশ্বিক গড় সমুদ্রের তাপমাত্রায় দক্ষিণ গোলার্ধের প্রভাবও বেশি।

এল নিনো আরও শক্তিশালী হচ্ছে
প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিক উষ্ণ পানি ভূপৃষ্ঠে উঠে আসার প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত পরিস্থিতিকে এল নিনো বলা হয়। এর প্রভাবে বিশাল একটি অঞ্চলের পানি উষ্ণ হয়ে ওঠায় বিশ্বব্যাপী গড় তাপমাত্রাও সাধারণত বেড়ে যায়।
বর্তমান এল নিনো পরিস্থিতি এখনো চূড়ান্ত শক্তিতে পৌঁছায়নি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বছরের শেষ দিকে, বিশেষ করে বড়দিনের সময় পর্যন্ত এটি আরও শক্তিশালী হতে পারে। এমনকি কয়েক শতাব্দীর মধ্যে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গবেষকদের মতে, এল নিনোর চূড়ান্ত পর্যায় আসার আগেই সমুদ্রের তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে যাওয়া এর সম্ভাব্য শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। পরিস্থিতি একই থাকলে আগামী বছরের মার্চ বা এপ্রিলে সমুদ্রের তাপমাত্রার রেকর্ড আবারও ভেঙে যেতে পারে।
শুধু প্রশান্ত মহাসাগর নয়, উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র
এল নিনোর মূল প্রভাব প্রশান্ত মহাসাগরে হলেও পৃথিবীর অন্যান্য সমুদ্রও অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের আশপাশের সমুদ্রেও দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণতার পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
ইংলিশ চ্যানেলের পশ্চিম অংশে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রায় ধারাবাহিকভাবে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ চলছে। জুলাই মাসে সেখানে পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
গবেষকদের মতে, এত বিস্তৃত অঞ্চলে একই সঙ্গে সমুদ্রের অস্বাভাবিক উষ্ণতা মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের স্পষ্ট প্রমাণ।
বিপদের মুখে সামুদ্রিক প্রাণী ও উপকূলীয় অঞ্চল
![]()
মানুষের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ফলে আটকে পড়া অতিরিক্ত তাপের ৯০ শতাংশেরও বেশি মহাসাগর শোষণ করে। ফলে পৃথিবীর অতিরিক্ত উষ্ণতার বড় একটি অংশ সমুদ্রের ভেতর জমা হচ্ছে।
উষ্ণ সমুদ্র ঝড়কে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। উষ্ণ পানি ঝড়কে অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও শক্তি জোগায়। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকায় স্থলভাগের তাপপ্রবাহও তীব্র হতে পারে, কারণ উষ্ণ সমুদ্র থেকে শীতল বাতাস পাওয়ার সুযোগ কমে যায়।
সমুদ্রের পানি উষ্ণ হলে তা আরও বেশি জায়গা দখল করে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ে এবং উপকূলীয় এলাকায় বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
অতিরিক্ত সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ প্রবালপ্রাচীরসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক আবাসস্থলের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। ঘন ঘন সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ সামুদ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন-জীবিকাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
সামনে আরও উষ্ণ সমুদ্রের আশঙ্কা
বর্তমান পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণতার সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনো একসঙ্গে কাজ করছে। ফলে আগামী কয়েক মাসে সমুদ্রের তাপমাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজ্ঞানীদের কাছে আগস্ট মাসেই বৈশ্বিক সমুদ্রের তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে যাওয়া তাই কেবল একটি নতুন পরিসংখ্যান নয়; বরং পৃথিবীর সামুদ্রিক পরিবেশ যে দ্রুত বাড়তে থাকা উষ্ণতার চাপে রয়েছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।
সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও শক্তিশালী এল নিনো—দুইয়ের মিলিত প্রভাবে আগামী বছর বিশ্বজুড়ে আরও তীব্র আবহাওয়াগত পরিবর্তনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















