স্বজনের মৃত্যুর পর পরিবার সাধারণত জানতে চায়—কীভাবে, কখন এবং কেন এমন মৃত্যু হলো। কিন্তু অস্বাভাবিক বা আকস্মিক মৃত্যুর তদন্তে যে আদালত পরিবারের কাছে সত্য উদ্ঘাটনের জায়গা হওয়ার কথা, সেটিই অনেক সময় তাদের জন্য হয়ে উঠছে বিভ্রান্তিকর, দীর্ঘ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার মতো এক অভিজ্ঞতা।
ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে অস্বাভাবিক, আকস্মিক বা হেফাজতে মৃত্যুর তদন্তে দায়িত্ব পালন করে মৃত্যুতদন্ত আদালত। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা, বিশেষজ্ঞের সংকট, অর্থের অভাব এবং শুনানিতে ক্রমবর্ধমান বিরোধিতামূলক পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেক পরিবার বলছে, স্বজনকে হারানোর পর সত্য জানার পথটিও তাদের জন্য আরেকটি লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
ড্যানিয়েল লিন্ডসের পরিবারের দীর্ঘ লড়াই
২০২৩ সালে ৪১ বছর বয়সে মারা যান ড্যানিয়েল লিন্ডসে। তিনি মানসিক বিকাশজনিত প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বসবাস করতেন এবং তাঁর টাইপ-১ ডায়াবেটিসও ছিল। সারেতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যত্ন নেওয়ার জন্য বিশেষায়িত একটি আবাসিক কেন্দ্রে থাকতেন তিনি।
ড্যানিয়েলের মৃত্যু ছিল অপ্রত্যাশিত। তাই তাঁর মৃত্যুর তদন্ত শুরু হয়। তাঁর আত্মীয় সারাহ একজন হত্যাকাণ্ড তদন্তকারী হিসেবে আদালতের পরিবেশে অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাসে প্রথম শুনানিতে গিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সারাহর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর মনে হয়েছিল যেন তিনিই বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। শুনানির পরিবেশ তাঁর প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি কঠোর ও বৈরী মনে হয়েছিল।
ড্যানিয়েলের পরিবার প্রথমে ধারণা করেছিল, হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়েই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু ময়নাতদন্তের পর জানা যায়, বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ড্যানিয়েলের খাদ্যনালিতে আগে থেকে শনাক্ত না হওয়া অগ্রসর পর্যায়ের ক্যানসার ছিল। শেষ পর্যন্ত গলায় খাবার আটকে শ্বাসরোধের ঘটনাই তাঁর মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসে।
ময়নাতদন্তেও বড় সংকট

প্রতি বছর ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় এক লাখ ৪৮ হাজার মৃত্যুর ঘটনা মৃত্যুতদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে জানানো হয়। এর প্রায় এক-চতুর্থাংশের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক তদন্ত অনুষ্ঠিত হয়।
কিন্তু এসব তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ময়নাতদন্তেও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের সংকট। মৃত্যুতদন্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশে প্রায় ৫১ শতাংশ মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত করা হলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে অনেক জায়গায় এর জন্য এক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
ময়নাতদন্ত করার মতো বিশেষজ্ঞের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় কম। নতুন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি হওয়ার হারও পর্যাপ্ত নয়। তার ওপর মৃত্যুতদন্তের জন্য একটি ময়নাতদন্তের মৌলিক পারিশ্রমিক এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ৯৬ দশমিক ৮০ পাউন্ডেই আটকে আছে।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, কাজের প্রকৃত সময় বিবেচনায় নিলে এই পারিশ্রমিক অনেক ক্ষেত্রে ন্যূনতম মজুরির চেয়েও কম দাঁড়ায়। কারণ শুধু মৃতদেহ পরীক্ষা করলেই কাজ শেষ হয় না। হাসপাতালের নথি পড়া, চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণও এর অংশ।
কমছে বিশেষজ্ঞ, বাড়ছে বিকল্প পদ্ধতি
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতির কারণে কিছু এলাকায় কম্পিউটারভিত্তিক ত্রিমাত্রিক দেহ পরীক্ষা ব্যবহার করা হচ্ছে। শক্তিশালী রশ্মির মাধ্যমে মৃতদেহের ত্রিমাত্রিক ছবি তৈরি করে হাড় ভাঙা বা শরীরের ভেতরের রক্তক্ষরণের মতো বিষয় শনাক্ত করা যায়।
ইহুদি ও মুসলিম পরিবারগুলোর কাছেও এই পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য, কারণ এতে মৃতদেহ কাটাছেঁড়া করতে হয় না।
তবে সব ধরনের মৃত্যুর কারণ শনাক্ত করতে এই পদ্ধতি যথেষ্ট নয়। দুর্ঘটনায় আঘাতজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হলেও ফুসফুসে রক্ত জমাট বাঁধার মতো কিছু জটিল মৃত্যুর কারণ শনাক্ত করতে এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদ্ধতিতে প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হলেও বাকি জটিল ঘটনাগুলোর জন্য প্রশিক্ষিত ময়নাতদন্ত বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন থেকেই যায়।
তদন্তের শুনানিতে কেন বাড়ছে বিরোধ?
মৃত্যুতদন্তের উদ্দেশ্য মূলত দোষী নির্ধারণ করা নয়, বরং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য বের করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক তদন্ত এখন ক্রমেই বিরোধপূর্ণ আইনি লড়াইয়ের রূপ নিচ্ছে।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রতি বছর প্রায় ৩৬ হাজার তদন্ত অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে অল্পসংখ্যক পরিবারই আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পায়। ফলে অধিকাংশ পরিবারকে নিজেদের পক্ষ নিজেরাই উপস্থাপন করতে হয়।
অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠানে মানুষ বেশি মারা যান, যেমন সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বা কারাগার, তাদের অনেক সময় রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে আইনজীবী থাকে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোরও আইনজীবী নিয়োগের সামর্থ্য থাকে।
ফলে শোকাহত পরিবার একদিকে স্বজনের মৃত্যুতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, অন্যদিকে শক্তিশালী আইনি দলের মুখোমুখি হয়ে পড়ে।
ড্যানিয়েলের পরিবারও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। প্রথম শুনানিতে তাঁর যত্ন নেওয়া প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আইনজীবীদের উপস্থিতি দেখে পরিবারটি নিজেদের প্রশ্নের উত্তর পেতে আলাদা আইনি সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করে।

তদন্তে উঠে আসে নতুন তথ্য
ড্যানিয়েলের মৃত্যুর তদন্ত দ্বিতীয় দিনে গিয়ে থেমে যায়। কারণ সাবেক এক পরিচর্যাকারী আদালতে জানান, ড্যানিয়েলের অতিরিক্ত বমি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন।
এই বার্তার কথা তদন্তকারী কর্মকর্তা আগে জানতেন না। ফলে নতুন তথ্যের ভিত্তিতে আরও তদন্ত প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে দ্বিতীয় দফার তদন্ত শুরু হয়। এক মাস পর তদন্তের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এতে ড্যানিয়েলের যত্ন নেওয়া প্রতিষ্ঠানের কিছু ভুলের কথা উল্লেখ করা হলেও সেগুলো তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল না বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।
শেষ পর্যন্ত সম্ভাব্যতার ভারসাম্যের ভিত্তিতে বলা হয়, আগে শনাক্ত না হওয়া খাদ্যনালির ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত খাবার আটকে যাওয়ার ঘটনাতেই ড্যানিয়েলের মৃত্যু হয়েছে।
তবে তাঁর পরিবার মনে করে, যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে যে ব্যর্থতাগুলো সামনে এসেছে, সিদ্ধান্তে সেগুলোর গুরুত্ব যথেষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
অর্থের অভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ
মৃত্যুতদন্ত ব্যবস্থার সংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন আইনজীবী, চিকিৎসক ও আইনপ্রণেতারা।
সাবেক প্রধান মৃত্যুতদন্ত কর্মকর্তা একসময় সতর্ক করেছিলেন, এই ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনের তুলনায় ভয়াবহভাবে কম অর্থ ও জনবল নিয়ে চলছে। তাঁর মতে, অর্থের ঘাটতি একপর্যায়ে আইনের শাসনের জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
আইনপ্রণেতারাও সরকারের কাছে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু অর্থের সংকটের কথা দেখিয়ে সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা হয়।
বর্তমানে মানুষের আয়ু বাড়ায় মৃত্যুর ঘটনাগুলোও আগের তুলনায় বেশি জটিল হয়ে উঠছে। অথচ একই সময়ে তদন্ত ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবল বাড়ছে না—এমন অভিযোগই সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে।
মৃত্যুর ঘটনা থেকে কি শিক্ষা নেওয়া হচ্ছে?
মৃত্যুতদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে একই ধরনের মৃত্যু ঠেকানোর সুযোগ তৈরি করা। এ জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা মনে করলে ভবিষ্যৎ মৃত্যু প্রতিরোধের প্রতিবেদন দিতে পারেন।
২০১৩ সালে এই ব্যবস্থা চালুর পর প্রায় সাড়ে ছয় হাজার এমন প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সুপারিশ বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করার সরাসরি ক্ষমতা তাদের নেই।
একজন গবেষক মনে করেন, এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ অনেক সুপারিশ অগ্রাহ্য হয়ে যাচ্ছে। তাঁর উদ্যোগে তৈরি একটি তথ্যভান্ডার একই ধরনের মৃত্যুর ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করছে।
সরকারও জানিয়েছে, ভবিষ্যৎ মৃত্যু প্রতিরোধের প্রতিবেদন ব্যবস্থার তদারকি আরও শক্তিশালী করার উপায় বিবেচনা করা হচ্ছে।

‘আমরা তো এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একবারই যাই’
মৃত্যুতদন্ত ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো শুধু অর্থ, জনবল বা দীর্ঘসূত্রতা নয়—শোকাহত পরিবারের প্রতি ব্যবহারের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত খোঁজ নেন। আবার কেউ কেউ প্রথম দিনের পর তাদের সঙ্গে খুব কমই যোগাযোগ করেন। ড্যানিয়েলের পরিবারও অভিযোগ করেছে, তদন্তের পুরো প্রক্রিয়ায় ড্যানিয়েল যেন ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গিয়েছিলেন।
প্রধান মৃত্যুতদন্ত কর্মকর্তা অবশ্য পরিবারগুলোকে উদ্বেগ থাকলে তা সরাসরি জানাতে বলেছেন। তাঁর মতে, তদন্তকারীরাও মানুষ এবং মানুষের উদ্বেগের প্রতি তাদের সাড়া দেওয়া উচিত।
ড্যানিয়েলের ঘটনা দেখিয়েছে, একটি মৃত্যুর সত্য জানতে গিয়ে একটি পরিবারকে কখনো কখনো বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। এর মধ্যে তাদের শুনতে হয় নতুন তথ্য, মোকাবিলা করতে হয় আইনি জটিলতা এবং বারবার ফিরে যেতে হয় প্রিয়জনের মৃত্যুর স্মৃতির কাছে।
মৃত্যুতদন্ত কর্মকর্তা প্রতিদিন এমন ঘটনা দেখেন। কিন্তু একটি পরিবার তার জীবনে এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সাধারণত একবারই যায়। তাই শোকাহত মানুষের কাছে এই ব্যবস্থাকে আরও মানবিক, দ্রুত ও কার্যকর করে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা শুধু আইনি প্রক্রিয়ার অংশ নয়; অনেক পরিবারের কাছে এটি প্রিয়জনের প্রতি শেষ দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের মৃত্যু ঠেকানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
মৃত্যুতদন্ত ব্যবস্থার এই সংকট তাই কেবল আদালতের সমস্যা নয়। এটি শোকাহত মানুষের ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ প্রাণহানি ঠেকানোর প্রশ্নের সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।
শোকাহত পরিবারগুলোর জন্য সত্য জানার পথ যেন আরেকটি শাস্তিতে পরিণত না হয়—এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।
আকস্মিক মৃত্যুর তদন্ত ব্যবস্থা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট ও শোকাহত পরিবারের আইনি লড়াই নিয়ে এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ব্রিটেনের মৃত্যুতদন্ত ব্যবস্থার গভীর সংকট।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















