০১:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
পশ্চিম সাহারায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের মেয়াদ আরও এক বছর, ক্ষুব্ধ আলজেরিয়া পাকিস্তানে শোকের মাতম, অভিবাসীবাহী নৌকা ডুবে নিখোঁজ ৪০ জনের বেশি মারাদোনার মৃত্যুর মামলায় বাবার চিকিৎসা পরীক্ষার রিপোর্ট, আদালতে চাঞ্চল্য ফ্র্যাঙ্ক বিয়ার্ডের মৃত্যুর পর প্রথম কনসার্টে মঞ্চে জেডজেড টপ জ্বালানি সংকটের ক্ষত এখনো শুকায়নি, ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাশ্রয়ী বিমান সংস্থাগুলো অভিবাসী শিশুদের সহায়তায় অনুদানের আহ্বান, কেসি মাসগ্রেভসকে বয়কটের ডাক ইরান কি নেতানিয়াহুর ছেলেকে হত্যার চেষ্টা করেছিল? ইরানের সামনে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় কী কী বিকল্প, বাড়তে পারে উপসাগরীয় উত্তেজনা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শূন্য, উল্টো বাড়ছে নতুন আগমন ও শিবিরের অপরাধ মুম্বাইয়ে খাবারের নিরাপত্তায় তুকারাম মুণ্ধের ঝড়, একের পর এক অভিযানে কাঁপছে রেস্তোরাঁ ব্যবসা

মানবসদৃশ রোবটের আড়ালে চীনে নীরবে এগিয়ে চলছে শিল্প-রোবটের বিপ্লব

চীনে মানবসদৃশ রোবটের প্রদর্শনী এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়। তবে মঞ্চের আলো, দৌড় কিংবা কুস্তির বাইরেও দেশটির কারখানাগুলোতে আরও বড় এক পরিবর্তন নীরবে এগিয়ে চলছে। মানুষকে সহায়তা করার পাশাপাশি শিল্পকারখানার একঘেয়ে, কঠিন ও বিরামহীন কাজ ক্রমেই নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে রোবট।

চীনের হাংঝৌ প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের একটি শ্রেণিকক্ষে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী রোবট পরিচালনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নানা বিষয় শিখছে। শিক্ষক চেন তিয়ানইউ তাঁদের বোঝাচ্ছেন কীভাবে একটি রোবটকে নির্দিষ্ট বস্তু তুলে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিতে হয়। কেউ রোবটের জন্য নির্দেশনা তৈরি করছে, কেউ চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী যন্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে।

চেনের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটের যুগে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন না করলে ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে অনেক মানুষ পিছিয়ে পড়তে পারেন।

কারখানায় ইতোমধ্যে কাজ করছে ২০ লাখের বেশি রোবট

চীনের কারখানাগুলোতে এখন ২০ লাখের বেশি রোবট কাজ করছে। সংখ্যার দিক থেকে দেশটি বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে এগিয়ে। শুধু নিজেদের কারখানাতেই নয়, চীন বিশ্ববাজারেও বিপুল পরিমাণ শিল্প রোবট সরবরাহ করছে। বিশ্বের অর্ধেকের বেশি শিল্প রোবট এখন চীনে তৈরি হচ্ছে।

Students learning robotics at the Hangzhou Technician Institute.

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ছেংদুর একটি কারখানায় একই ছাদের নিচে কাজ করছে মানুষ ও যন্ত্র। মাঝবয়সী কর্মীরা রোবটের যন্ত্রাংশে স্ক্রু লাগানো, ছিদ্র করা ও পালিশ করার কাজ করছেন। অন্যদিকে কয়েকজন তরুণ প্রকৌশলী এমন একটি নতুন রোবট তৈরির চেষ্টা করছেন, যা ভবিষ্যতে অন্য রোবট তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রকৌশলী পাং কাইয়ের নেতৃত্বে তৈরি হওয়া নতুন যন্ত্রটি এখনো খুব সীমিত কাজ করতে পারে। যেমন নির্দিষ্ট চিহ্ন শনাক্ত করা বা কয়েকটি সহজ পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ সম্পন্ন করা। তবে নির্মাতাদের আশা, সময়ের সঙ্গে এর সক্ষমতা অনেক বাড়বে।

প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩০০ কর্মী নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিল্পকারখানার জন্য রোবটের বাহু তৈরি করছে। এসব যন্ত্র গাড়ি, বৈদ্যুতিক পণ্য কিংবা বায়ুবিদ্যুৎ সরঞ্জাম তৈরির কাজে ব্যবহার করা যায়। নির্মাতাদের দাবি, একটি রোবটের বাহুকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা সম্ভব, যাতে কারখানার ৯০ শতাংশের বেশি পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ সম্পন্ন করা যায়।

শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় রোবটের ওপর ভরসা

চীনের রোবট বিপ্লবের পেছনে শুধু প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, জনসংখ্যাগত বাস্তবতাও বড় কারণ। দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে চীনের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষের বয়স ৬০ বছরের ওপরে হবে।

আগামী এক দশকে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ছয় কোটি কমে যেতে পারে বলেও বিভিন্ন হিসাব রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় শ্রমিকের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চীন আশা করছে, ব্যাপক স্বয়ংক্রিয়ীকরণ সেই ঘাটতি পূরণে সহায়তা করবে। কিন্তু পরিবর্তনের গতি নিয়েও রয়েছে বড় প্রশ্ন। দেশটির উৎপাদন খাতে এখনো প্রায় ১২ কোটি মানুষ কাজ করেন। কারখানায় যন্ত্রের ব্যবহার খুব দ্রুত বাড়লে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়তে পারে।

Pang Kai wearing a blue shirt with a robot standing behind him

গাড়ি তৈরিতেও মানুষের জায়গা নিচ্ছে যন্ত্র

হাংঝৌয়ের একটি গাড়ি কারখানায় উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি ধাপেই রোবটের ব্যবহার দেখা যায়। গাড়ির যন্ত্রাংশ জোড়া লাগানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়ায় যন্ত্র মানুষের সঙ্গে পাশাপাশি কাজ করছে।

কারখানার কিছু অংশে স্বয়ংক্রিয়ীকরণের মাত্রা প্রায় শতভাগে পৌঁছেছে। তবে উৎপাদন লাইনের শেষ ধাপে এখনো মানুষের উপস্থিতি রয়েছে। নতুন গাড়িগুলো পরীক্ষা করে দেখছেন কর্মীরা।

কারখানার একজন কর্মকর্তা মনে করেন, ভবিষ্যতে এসব কর্মীর প্রয়োজনও কমে যেতে পারে। তাঁর মতে, এই পরিবর্তন খুব বেশি দূরের বিষয় নয়।

তবে যন্ত্রেরও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। দিনে ২৪ ঘণ্টা কাজ করার সক্ষমতা থাকলেও নিয়মিত পরীক্ষা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মানুষ প্রয়োজন হয়। ফলে অদূর ভবিষ্যতে পুরোপুরি মানবশূন্য কারখানা তৈরি হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

রোবট তৈরির জন্যও তৈরি হচ্ছে নতুন প্রজন্ম

চীন শুধু রোবট তৈরির কারখানা বাড়াচ্ছে না, একই সঙ্গে এমন একটি কর্মী বাহিনী গড়ে তুলছে যারা রোবটের সঙ্গে কাজ করতে পারবে।

হাংঝৌয়ের মতো কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে কিশোর বয়স থেকেই শিক্ষার্থীদের যন্ত্রপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট পরিচালনা ও উন্নত শিল্পপ্রযুক্তির শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। কোথাও আবার গাড়ির ইঞ্জিন ও উড়োজাহাজ প্রযুক্তি নিয়ে আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রশিক্ষকদের দাবি, এসব শিক্ষার্থীর চাহিদা এত বেশি যে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই নিয়োগের আগ্রহ দেখায়। চীনের উচ্চ যুব বেকারত্বের মধ্যেও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনকারীরা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে।

শিক্ষক চেন তিয়ানইউর মতে, প্রযুক্তির পরিবর্তন ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বরং পরিবর্তনের মধ্যেই নতুন কর্মসংস্থানের জায়গা খুঁজে নিতে হবে।

রোবটের শরীর তৈরিতে চীনের সুবিধা

রোবট তৈরির ক্ষেত্রে চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশাল উৎপাদন অবকাঠামো। মোটর, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, গিয়ার, সংবেদকসহ রোবট তৈরির প্রয়োজনীয় প্রায় সব উপাদান দেশটির বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সহজেই পাওয়া যায়।

Machines inside the Leapmotor factory.

ফলে একটি রোবট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহে চীনা নির্মাতাদের সময় তুলনামূলকভাবে কম লাগে। বিশেষ করে শেনচেনের মতো প্রযুক্তিকেন্দ্রিক শহরগুলোতে রোবট নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

তবে একটি জায়গায় এখনো যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে রয়েছে—রোবটের ‘মস্তিষ্ক’ তৈরিতে। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে যন্ত্রকে চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজ করার সক্ষমতা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থান রয়েছে।

চীনের বিভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান অবশ্য দ্রুত এগিয়ে আসছে। উন্মুক্ত প্রযুক্তি ভাগাভাগির প্রবণতার কারণে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত ব্যবধান কমিয়ে আনছে।

ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নয়

বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা কোন দেশের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবচেয়ে শক্তিশালী—শুধু তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং সেই বুদ্ধিমত্তাকে কে কত দ্রুত কোটি কোটি বাস্তব যন্ত্রের মধ্যে কাজে লাগাতে পারে, সেটিই হয়ে উঠতে পারে মূল প্রতিযোগিতা।

চীন এই জায়গাতেই বড় বিনিয়োগ করছে। কারণ দেশটির রয়েছে বিশাল শিল্পভিত্তি, বিপুল উৎপাদন ক্ষমতা এবং রোবট তৈরির প্রয়োজনীয় সরবরাহব্যবস্থা।

A young female worker examining a machine at the Leapmotor factory.

তবে অর্থনীতির অন্য সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে। আবাসন খাতের সংকট, স্থানীয় সরকারের বিপুল ঋণ এবং মানুষের কম ভোগব্যয় চীনের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। রোবট ও স্বয়ংক্রিয়ীকরণের বিপ্লব এসব সমস্যার কতটা সমাধান করতে পারবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

সমৃদ্ধি নাকি কর্মসংস্থানের সংকট?

চীনের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই প্রযুক্তিগত নয়, সামাজিক। রোবট যদি উৎপাদন বাড়ায়, খরচ কমায় এবং অর্থনীতিকে আরও দক্ষ করে তোলে, তার সুফল কি সাধারণ শ্রমিকদের কাছেও পৌঁছাবে? নাকি উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের কাজ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে?

চেন তিয়ানইউর শিক্ষার্থীরাও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করে। কিন্তু তাঁর নিজেরও নিশ্চিত উত্তর নেই। প্রযুক্তি এত দ্রুত বদলাচ্ছে যে আগামী দিনের কর্মক্ষেত্র কেমন হবে, তা অনুমান করাও কঠিন।

তবু তাঁর বার্তা একটাই—পরিবর্তনের সামনে দাঁড়িয়ে থেমে থাকার সুযোগ নেই। ভবিষ্যৎ কী নিয়ে আসবে, তা জানতে হলে প্রযুক্তির সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।

চীনের মানবসদৃশ রোবট হয়তো বিশ্বের নজর কাড়ছে, কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তনটি ঘটছে আরও নীরবে—কারখানার ভেতরে, প্রশিক্ষণকেন্দ্রে এবং এমন এক শ্রমবাজারে, যেখানে মানুষ ও যন্ত্রের সম্পর্ক আগামী দশকের অর্থনীতির চেহারা নির্ধারণ করতে পারে।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

পশ্চিম সাহারায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের মেয়াদ আরও এক বছর, ক্ষুব্ধ আলজেরিয়া

মানবসদৃশ রোবটের আড়ালে চীনে নীরবে এগিয়ে চলছে শিল্প-রোবটের বিপ্লব

১২:৪১:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

চীনে মানবসদৃশ রোবটের প্রদর্শনী এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়। তবে মঞ্চের আলো, দৌড় কিংবা কুস্তির বাইরেও দেশটির কারখানাগুলোতে আরও বড় এক পরিবর্তন নীরবে এগিয়ে চলছে। মানুষকে সহায়তা করার পাশাপাশি শিল্পকারখানার একঘেয়ে, কঠিন ও বিরামহীন কাজ ক্রমেই নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে রোবট।

চীনের হাংঝৌ প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের একটি শ্রেণিকক্ষে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী রোবট পরিচালনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নানা বিষয় শিখছে। শিক্ষক চেন তিয়ানইউ তাঁদের বোঝাচ্ছেন কীভাবে একটি রোবটকে নির্দিষ্ট বস্তু তুলে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিতে হয়। কেউ রোবটের জন্য নির্দেশনা তৈরি করছে, কেউ চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী যন্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে।

চেনের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটের যুগে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন না করলে ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে অনেক মানুষ পিছিয়ে পড়তে পারেন।

কারখানায় ইতোমধ্যে কাজ করছে ২০ লাখের বেশি রোবট

চীনের কারখানাগুলোতে এখন ২০ লাখের বেশি রোবট কাজ করছে। সংখ্যার দিক থেকে দেশটি বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে এগিয়ে। শুধু নিজেদের কারখানাতেই নয়, চীন বিশ্ববাজারেও বিপুল পরিমাণ শিল্প রোবট সরবরাহ করছে। বিশ্বের অর্ধেকের বেশি শিল্প রোবট এখন চীনে তৈরি হচ্ছে।

Students learning robotics at the Hangzhou Technician Institute.

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ছেংদুর একটি কারখানায় একই ছাদের নিচে কাজ করছে মানুষ ও যন্ত্র। মাঝবয়সী কর্মীরা রোবটের যন্ত্রাংশে স্ক্রু লাগানো, ছিদ্র করা ও পালিশ করার কাজ করছেন। অন্যদিকে কয়েকজন তরুণ প্রকৌশলী এমন একটি নতুন রোবট তৈরির চেষ্টা করছেন, যা ভবিষ্যতে অন্য রোবট তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রকৌশলী পাং কাইয়ের নেতৃত্বে তৈরি হওয়া নতুন যন্ত্রটি এখনো খুব সীমিত কাজ করতে পারে। যেমন নির্দিষ্ট চিহ্ন শনাক্ত করা বা কয়েকটি সহজ পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ সম্পন্ন করা। তবে নির্মাতাদের আশা, সময়ের সঙ্গে এর সক্ষমতা অনেক বাড়বে।

প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩০০ কর্মী নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিল্পকারখানার জন্য রোবটের বাহু তৈরি করছে। এসব যন্ত্র গাড়ি, বৈদ্যুতিক পণ্য কিংবা বায়ুবিদ্যুৎ সরঞ্জাম তৈরির কাজে ব্যবহার করা যায়। নির্মাতাদের দাবি, একটি রোবটের বাহুকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা সম্ভব, যাতে কারখানার ৯০ শতাংশের বেশি পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ সম্পন্ন করা যায়।

শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় রোবটের ওপর ভরসা

চীনের রোবট বিপ্লবের পেছনে শুধু প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, জনসংখ্যাগত বাস্তবতাও বড় কারণ। দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে চীনের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষের বয়স ৬০ বছরের ওপরে হবে।

আগামী এক দশকে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ছয় কোটি কমে যেতে পারে বলেও বিভিন্ন হিসাব রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় শ্রমিকের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চীন আশা করছে, ব্যাপক স্বয়ংক্রিয়ীকরণ সেই ঘাটতি পূরণে সহায়তা করবে। কিন্তু পরিবর্তনের গতি নিয়েও রয়েছে বড় প্রশ্ন। দেশটির উৎপাদন খাতে এখনো প্রায় ১২ কোটি মানুষ কাজ করেন। কারখানায় যন্ত্রের ব্যবহার খুব দ্রুত বাড়লে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়তে পারে।

Pang Kai wearing a blue shirt with a robot standing behind him

গাড়ি তৈরিতেও মানুষের জায়গা নিচ্ছে যন্ত্র

হাংঝৌয়ের একটি গাড়ি কারখানায় উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি ধাপেই রোবটের ব্যবহার দেখা যায়। গাড়ির যন্ত্রাংশ জোড়া লাগানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়ায় যন্ত্র মানুষের সঙ্গে পাশাপাশি কাজ করছে।

কারখানার কিছু অংশে স্বয়ংক্রিয়ীকরণের মাত্রা প্রায় শতভাগে পৌঁছেছে। তবে উৎপাদন লাইনের শেষ ধাপে এখনো মানুষের উপস্থিতি রয়েছে। নতুন গাড়িগুলো পরীক্ষা করে দেখছেন কর্মীরা।

কারখানার একজন কর্মকর্তা মনে করেন, ভবিষ্যতে এসব কর্মীর প্রয়োজনও কমে যেতে পারে। তাঁর মতে, এই পরিবর্তন খুব বেশি দূরের বিষয় নয়।

তবে যন্ত্রেরও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। দিনে ২৪ ঘণ্টা কাজ করার সক্ষমতা থাকলেও নিয়মিত পরীক্ষা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মানুষ প্রয়োজন হয়। ফলে অদূর ভবিষ্যতে পুরোপুরি মানবশূন্য কারখানা তৈরি হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

রোবট তৈরির জন্যও তৈরি হচ্ছে নতুন প্রজন্ম

চীন শুধু রোবট তৈরির কারখানা বাড়াচ্ছে না, একই সঙ্গে এমন একটি কর্মী বাহিনী গড়ে তুলছে যারা রোবটের সঙ্গে কাজ করতে পারবে।

হাংঝৌয়ের মতো কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে কিশোর বয়স থেকেই শিক্ষার্থীদের যন্ত্রপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট পরিচালনা ও উন্নত শিল্পপ্রযুক্তির শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। কোথাও আবার গাড়ির ইঞ্জিন ও উড়োজাহাজ প্রযুক্তি নিয়ে আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রশিক্ষকদের দাবি, এসব শিক্ষার্থীর চাহিদা এত বেশি যে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই নিয়োগের আগ্রহ দেখায়। চীনের উচ্চ যুব বেকারত্বের মধ্যেও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনকারীরা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে।

শিক্ষক চেন তিয়ানইউর মতে, প্রযুক্তির পরিবর্তন ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বরং পরিবর্তনের মধ্যেই নতুন কর্মসংস্থানের জায়গা খুঁজে নিতে হবে।

রোবটের শরীর তৈরিতে চীনের সুবিধা

রোবট তৈরির ক্ষেত্রে চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশাল উৎপাদন অবকাঠামো। মোটর, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, গিয়ার, সংবেদকসহ রোবট তৈরির প্রয়োজনীয় প্রায় সব উপাদান দেশটির বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সহজেই পাওয়া যায়।

Machines inside the Leapmotor factory.

ফলে একটি রোবট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহে চীনা নির্মাতাদের সময় তুলনামূলকভাবে কম লাগে। বিশেষ করে শেনচেনের মতো প্রযুক্তিকেন্দ্রিক শহরগুলোতে রোবট নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

তবে একটি জায়গায় এখনো যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে রয়েছে—রোবটের ‘মস্তিষ্ক’ তৈরিতে। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে যন্ত্রকে চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজ করার সক্ষমতা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থান রয়েছে।

চীনের বিভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান অবশ্য দ্রুত এগিয়ে আসছে। উন্মুক্ত প্রযুক্তি ভাগাভাগির প্রবণতার কারণে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত ব্যবধান কমিয়ে আনছে।

ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নয়

বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা কোন দেশের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবচেয়ে শক্তিশালী—শুধু তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং সেই বুদ্ধিমত্তাকে কে কত দ্রুত কোটি কোটি বাস্তব যন্ত্রের মধ্যে কাজে লাগাতে পারে, সেটিই হয়ে উঠতে পারে মূল প্রতিযোগিতা।

চীন এই জায়গাতেই বড় বিনিয়োগ করছে। কারণ দেশটির রয়েছে বিশাল শিল্পভিত্তি, বিপুল উৎপাদন ক্ষমতা এবং রোবট তৈরির প্রয়োজনীয় সরবরাহব্যবস্থা।

A young female worker examining a machine at the Leapmotor factory.

তবে অর্থনীতির অন্য সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে। আবাসন খাতের সংকট, স্থানীয় সরকারের বিপুল ঋণ এবং মানুষের কম ভোগব্যয় চীনের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। রোবট ও স্বয়ংক্রিয়ীকরণের বিপ্লব এসব সমস্যার কতটা সমাধান করতে পারবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

সমৃদ্ধি নাকি কর্মসংস্থানের সংকট?

চীনের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই প্রযুক্তিগত নয়, সামাজিক। রোবট যদি উৎপাদন বাড়ায়, খরচ কমায় এবং অর্থনীতিকে আরও দক্ষ করে তোলে, তার সুফল কি সাধারণ শ্রমিকদের কাছেও পৌঁছাবে? নাকি উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের কাজ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে?

চেন তিয়ানইউর শিক্ষার্থীরাও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করে। কিন্তু তাঁর নিজেরও নিশ্চিত উত্তর নেই। প্রযুক্তি এত দ্রুত বদলাচ্ছে যে আগামী দিনের কর্মক্ষেত্র কেমন হবে, তা অনুমান করাও কঠিন।

তবু তাঁর বার্তা একটাই—পরিবর্তনের সামনে দাঁড়িয়ে থেমে থাকার সুযোগ নেই। ভবিষ্যৎ কী নিয়ে আসবে, তা জানতে হলে প্রযুক্তির সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।

চীনের মানবসদৃশ রোবট হয়তো বিশ্বের নজর কাড়ছে, কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তনটি ঘটছে আরও নীরবে—কারখানার ভেতরে, প্রশিক্ষণকেন্দ্রে এবং এমন এক শ্রমবাজারে, যেখানে মানুষ ও যন্ত্রের সম্পর্ক আগামী দশকের অর্থনীতির চেহারা নির্ধারণ করতে পারে।