যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসা নিয়ে নতুন করে কড়াকড়ি শুরু হওয়া শুধু অভিবাসননীতির বিষয় নয়; এটি দক্ষ বিদেশি কর্মী, মার্কিন শ্রমবাজার এবং প্রযুক্তি শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। মার্কিন প্রশাসনের প্রস্তাবিত বিপুল ভিসা ফি আদালতে কতটা টিকবে, সেটি আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—এইচ-১বি ব্যবস্থা কি সত্যিই মেধাবী বিদেশিদের জন্য সুযোগ তৈরি করছে, নাকি এটি ধীরে ধীরে সস্তা শ্রম ব্যবহারের একটি কাঠামোয় পরিণত হয়েছে?
ভারতের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে দিল্লির পক্ষ থেকে এই ভিসা ব্যবস্থার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের প্রতিবাদ করাই স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হয়তো ভিন্ন অবস্থান নেওয়ার দাবি রাখে। কারণ, বর্তমান এইচ-১বি কাঠামো ভারতীয় পেশাজীবীদের জন্য যতটা সুযোগ তৈরি করেছে, ততটাই তাদের একটি অনিশ্চিত ও নিয়োগকর্তানির্ভর ব্যবস্থার মধ্যে আটকে রেখেছে।
দক্ষ অভিবাসনের নামে শ্রমবাজারের বৈষম্য
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় শক্তি তার অভিবাসনব্যবস্থা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, গবেষক, চিকিৎসক ও উদ্যোক্তাদের আকর্ষণ করে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে সুবিধা পেয়েছে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত বহু পেশাজীবী মার্কিন কোম্পানি গড়ে তুলেছেন, গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এবং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
![]()
তবে এসব সাফল্যের মূল কারণ এইচ-১বি ভিসা—এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং বহু ভারতীয় মেধাবী পেশাজীবী এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই নিজেদের সাফল্যের পথ তৈরি করেছেন।
এইচ-১বি ভিসার মূল উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রে যেসব বিশেষায়িত দক্ষতার প্রকৃত ঘাটতি রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে বিদেশি কর্মী আনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এর একটি অংশ শ্রম ব্যয়ের পার্থক্য কাজে লাগানোর ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। কিছু নিয়োগকারী ও মধ্যস্থতাকারী অতিরঞ্জিত জীবনবৃত্তান্ত, কৃত্রিম অভিজ্ঞতা কিংবা এমন দক্ষতার দাবি ব্যবহার করেছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্মীর প্রকৃত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এখানে শুধু বিদেশি কর্মীদের দায়ী করলে পুরো সমস্যাটি বোঝা যাবে না। বড় মার্কিন কোম্পানিগুলোও এই ব্যবস্থায় সুবিধা পায়। কোনো কর্মীর যুক্তরাষ্ট্রে থাকার বৈধতা যদি মূলত নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভর করে, তাহলে তার দর-কষাকষির ক্ষমতা কমে যায়। চাকরি পরিবর্তন, বেতন বৃদ্ধির দাবি কিংবা নতুন সুযোগ গ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই অভিবাসন-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা তাকে সতর্ক থাকতে বাধ্য করে।
ভারতীয় কর্মীদের জন্য দীর্ঘ অনিশ্চয়তা
ভারতীয় পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে সংকট আরও গভীর হয়েছে গ্রিন কার্ডের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং দেশভিত্তিক সীমাবদ্ধতার কারণে। স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পেতে অনেককে বছরের পর বছর একই চাকরির সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়।
এ অবস্থায় একজন দক্ষ কর্মী শুধু তার পেশাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারেন না। চাকরি হারানোর আশঙ্কা তার অভিবাসন-অবস্থার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়। চাকরি চলে গেলে সীমিত সময়ের মধ্যে নতুন নিয়োগকর্তা খুঁজে পাওয়া, নতুবা যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এর ফলে কর্মীর পেশাগত স্বাধীনতা স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত হয়।
এখানে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তারা সাধারণত আরও বেশি এইচ-১বি ভিসার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয়, কিন্তু একই কর্মীদের দ্রুত স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেওয়ার মতো সংস্কারের জন্য একই মাত্রায় চাপ সৃষ্টি করে না। অথচ দক্ষ অভিবাসনের যৌক্তিক উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বিদেশি প্রতিভা কেবল অস্থায়ী ও কম ব্যয়ের শ্রমশক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হবে না।
ক্ষোভের ভার পড়ছে মার্কিন কর্মীদের ওপর
এইচ-১বি বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মার্কিন কর্মীদের অসন্তোষ। বহু বছর ধরে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করা অভিজ্ঞ কর্মী যখন চাকরি হারান, তখন তার প্রভাব কেবল মাসিক আয়ের ওপর পড়ে না। বাড়ির ঋণ, সন্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ, স্বাস্থ্যবীমা এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা—সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
প্রযুক্তি খাতে অভিজ্ঞ ও বেশি বেতন পাওয়া কর্মীদের জায়গায় তরুণ ও তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল কর্মী নিয়োগের প্রবণতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। চাকরি হারানোর ক্ষোভ তাই অনেক সময় বিদেশি কর্মীদের দিকেও চলে যায়। সবচেয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন ছাঁটাই হওয়া কর্মীকেই তার জায়গায় নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিকে কাজ শেখাতে হয়।
এই ক্ষোভের কিছু বাস্তব ভিত্তি থাকলেও এর দায় পুরো ভারতীয় সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো অন্যায়। চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, অধ্যাপক, গবেষক, উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিবিদসহ অসংখ্য ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তবু ভিসাব্যবস্থার অপব্যবহারের কারণে তাদের জাতিগত পরিচয়, উচ্চারণ, খাবার কিংবা সংস্কৃতি নিয়ে বিদ্রূপ ও বিরূপতা তৈরি হতে পারে।
একটি ত্রুটিপূর্ণ শ্রমব্যবস্থার দায় তখন গিয়ে পড়ে এমন মানুষের ওপর, যারা নিজেরা সেই ব্যবস্থার অপব্যবহার করেননি।
ভারতের কি এইচ-১বির পক্ষে থাকা উচিত?
ভারতের জন্য তাই এই প্রশ্নটি নতুন করে বিবেচনা করার সময় এসেছে। এইচ-১বি ভিসা কমে গেলে ভারতীয় প্রযুক্তি খাত বড় ধরনের সংকটে পড়বে—এমন আশঙ্কা এখন আগের মতো শক্তিশালী নয়। বড় ভারতীয় আইটি প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় কর্মী নিয়োগ, ভারত থেকে কাজ পরিচালনা এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেলিভারি সেন্টার ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের ব্যবসায়িক মডেল বদলেছে।
সাম্প্রতিক তথ্যও দেখাচ্ছে, বড় ভারতীয় আইটি কোম্পানিগুলোর এইচ-১বি অনুমোদনের ওপর নির্ভরতা কমেছে। ফলে এই ভিসা ব্যবস্থা বন্ধ হলে কিছু প্রকল্পে ব্যয় বাড়তে পারে এবং কয়েকটি ব্যবসায়িক কার্যক্রমে সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে। কিন্তু ভারতীয় প্রযুক্তি শিল্পের জন্য এটিকে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখার কারণ সীমিত।
কারণ প্রযুক্তি খাত নিজেই দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
এআই বদলে দিচ্ছে কর্মসংস্থানের হিসাব
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন অনেক কাজ দ্রুত স্বয়ংক্রিয় করে ফেলছে, যেগুলোর ওপর প্রচলিত আউটসোর্সিং মডেল গড়ে উঠেছিল। সফটওয়্যার পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ, ডকুমেন্টেশন থেকে শুরু করে প্রোগ্রামিংয়ের বিভিন্ন পর্যায় পর্যন্ত এখন আগের তুলনায় কম জনবল দিয়ে সম্পন্ন করা সম্ভব।
এর অর্থ হলো, ভারতে কোনো প্রকল্প পরিচালনায় কম প্রকৌশলী প্রয়োজন হলে একই প্রযুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রেও সেই প্রকল্পের জন্য কম প্রকৌশলী প্রয়োজন হতে পারে। আগে যে কাজের জন্য একশ জন প্রকৌশলী দরকার হতো, এখন হয়তো ত্রিশজনই যথেষ্ট। বাকি কর্মসংস্থান ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাবে—এমন নয়; সেই কাজের একটি বড় অংশ হয়তো আর কোনো মানুষের প্রয়োজনই করবে না।
এ কারণেই এইচ-১বি ভিসা বাতিল হলে আমেরিকানদের হারানো সব চাকরি ফিরে আসবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং তখন মার্কিন রাজনীতিকে বিদেশি কর্মীদের দায়ী করার পরিবর্তে অটোমেশন, করপোরেট নিয়োগনীতি এবং অভিজ্ঞ কর্মীদের প্রতি বৈষম্যের মতো কঠিন প্রশ্ন মোকাবিলা করতে হবে।
দক্ষ অভিবাসনের নতুন কাঠামো দরকার
যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন এমন একটি অভিবাসনব্যবস্থা, যেখানে প্রকৃত দক্ষতার ঘাটতি থাকলেই বিদেশি প্রতিভা আনা হবে এবং তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে রাখা হবে না। একজন দক্ষ কর্মীকে শুধু কম খরচের শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা যেমন মার্কিন শ্রমবাজারের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি বিদেশি কর্মীর প্রতিও অন্যায্য।
ভারতেরও এমন একটি ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই, যা তার নাগরিকদের দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখে এবং একই সঙ্গে তাদের সাফল্যের জন্য সামাজিক বিরূপতার ঝুঁকি বাড়ায়। ভারতীয় পেশাজীবীদের প্রকৃত শক্তি তাদের দক্ষতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতায়—একটি নির্দিষ্ট ভিসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতায় নয়।
এইচ-১বি ব্যবস্থার অবসান তাই ভারতীয়দের জন্য শুধু ক্ষতির গল্প নাও হতে পারে। বরং এটি যদি এমন একটি নতুন অভিবাসনব্যবস্থার পথ খুলে দেয়, যেখানে প্রকৃত মেধাকে মূল্য দেওয়া হবে, কর্মীরা চাকরি পরিবর্তনের স্বাধীনতা পাবেন এবং ভবিষ্যৎ গড়ার অধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে পারবেন, তাহলে সেই পরিবর্তনকে ভয় পাওয়ার চেয়ে স্বাগত জানানোর কারণই বেশি।
বিবেক ওয়াধওয়া 



















