পাকিস্তানের পরবর্তী বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা দেশের সীমানার বাইরে কোথাও শুরু হতে পারে, কিন্তু তার অভিঘাত সরাসরি পৌঁছে যেতে পারে সাধারণ মানুষের সংসার, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং এমনিতেই দুর্বল বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানে। হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী কোনো অচলাবস্থা তৈরি হলে দেশটির আমদানি ব্যয় আনুমানিক ৪.৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতি এমন এক অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে, যা এখনো বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় শক্তিশালী করা এবং আবারও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কঠোর সমন্বয়ের প্রয়োজন এড়ানোর চেষ্টা করছে।
জ্বালানির সংকট কখনো শুধু জ্বালানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, তার প্রভাব পড়ে খাদ্য ও শিল্পপণ্যের দামে, ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বাড়ে এবং কর্মজীবী পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমে। পাকিস্তান বহু বছর ধরে এমন সংকট দেখা দেওয়ার পর তার মোকাবিলা করেছে; কিন্তু ঝুঁকির উৎস কমানোর মতো একটি স্থিতিস্থাপক জ্বালানি কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে আমদানি করা এবং অস্থির দামের জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর প্রবৃদ্ধি নির্ভরশীল থাকলে প্রকৃত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিনই থেকে যাবে।
এখন প্রয়োজন একই সঙ্গে দুটি কাজ করা। যেসব জ্বালানি অদূর ভবিষ্যতে আমদানি করতেই হবে, সেগুলোর সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ করা এবং একই সময়ে দেশীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব এমন শক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো।
আমদানির ঝুঁকি কমানো জরুরি, কিন্তু সেটিই চূড়ান্ত সমাধান নয়
স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে তেল আমদানির সম্ভাবনা পাকিস্তান ইতোমধ্যে বিবেচনা করেছে। এমন বিকল্প পথ তৈরি হলে কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে অস্থিরতা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক সরবরাহ ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব।
তবে এটিকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ এতে নির্ভরশীলতার অবসান ঘটে না, কেবল নির্ভরশীলতার পথ বদলে যায়। আমদানি করা জ্বালানি যদি একইভাবে অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ভিত্তি হয়ে থাকে, তাহলে নতুন রুটও কোনো একসময় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাজারের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়তে পারে।
এই জায়গাতেই নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরের গুরুত্ব সামনে আসে।
সবুজ করিডরকে কেবল বিদ্যুৎ প্রকল্পে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না
CPEC 2.0-এর প্রস্তাবিত Green Corridor পাকিস্তানের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে যদি শিল্পায়ন, কৃষি, খনিজসম্পদ উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সহযোগিতার সঙ্গে সমন্বিত করা যায়, তাহলে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের পরবর্তী পর্যায়টি আগের তুলনায় অনেক বেশি টেকসই হতে পারে।
তবে CPEC-এর প্রথম পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। আমদানি করা জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ কাঠামো যে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, কয়লার ব্যবহার তার একটি উদাহরণ। মাত্র সাত বছরে পাকিস্তানের বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার অংশ প্রায় ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ২০ শতাংশ হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং ভবিষ্যতে কয়লাভিত্তিক সম্পদ অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
এমন সময়ে একই ধরনের মডেল আরও সম্প্রসারণ করলে অর্থনীতির দুর্বলতা কমার বদলে বাড়তে পারে। বরং পাকিস্তানের বিপুল সৌর ও বায়ু শক্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো প্রয়োজন, বিশেষ করে সিন্ধু ও বেলুচিস্তানের মতো অঞ্চলে। শিল্পাঞ্চলগুলোও এমনভাবে পরিকল্পনা করা যেতে পারে, যাতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ তাদের মূল শক্তির উৎস হয়ে ওঠে।
এর সম্ভাব্য সুফল শুধু বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমলে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমতে পারে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক মূল্য অস্থিরতা থেকে কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারে এবং অর্থনীতির বহিরাগত ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা বাড়তে পারে।
কিন্তু শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই এই পরিবর্তন সম্ভব হবে না।

শিল্পাঞ্চলের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা
CPEC-এর প্রথম পর্যায়ে নির্ধারিত নয়টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে মাত্র চারটি—খাইবার পাখতুনখোয়ার রশাকাই, পাঞ্জাবের আল্লামা ইকবাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি, সিন্ধুর ধাবেজি এবং বেলুচিস্তানের বোস্তান—পরিকল্পনার গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব উন্নয়নের পর্যায়ে যেতে পেরেছে। সেগুলোর অগ্রগতিও এখনো আংশিক। বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিষেবার ঘাটতি, জমির মালিকানা নিয়ে অনিশ্চয়তা, অনুমোদনের জটিলতা, বিদ্যুৎ বিতরণের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগকারী ও উন্নয়নকারীদের বিরোধ নিষ্পত্তির অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল পরিবহন ও সঞ্চালন অবকাঠামো এবং চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য পর্যাপ্তভাবে নির্ধারিত খাতভিত্তিক বিনিয়োগ প্রস্তাবের অভাব। শুধু করছাড় বা আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়, যদি একজন বিনিয়োগকারীকে বহু প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
তাই নতুন প্রকল্প ঘোষণার আগে বিদ্যমান বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে বাস্তব অর্থে বিনিয়োগের উপযোগী করে তোলা জরুরি। এক জানালার মাধ্যমে অনুমোদন, বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব স্পষ্ট করা, কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, নিরাপত্তা প্রোটোকল সহজ ও পূর্বানুমানযোগ্য করা এবং জমি ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এই ভিত্তি তৈরি হলে নবায়নযোগ্য শক্তি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে প্রতিযোগিতামূলক সবুজ শিল্পকেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। তার আগে সৌর বা বায়ু বিদ্যুতের অবকাঠামো যোগ করা কেবল অসম্পূর্ণ শিল্পভিত্তির ওপর আরেকটি স্তর তৈরি করার মতো হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রেও থাকতে হবে পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসা
জ্বালানি নিরাপত্তার আলোচনাকে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। কারণ বিদ্যুতের উচ্চ ও পরিবর্তনশীল ব্যয়ের চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় পরিবার এবং ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে।
পাকিস্তানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের দ্রুত বিস্তার ইতোমধ্যে দেখিয়েছে যে মানুষ যখন ব্যয়বহুল গ্রিড বিদ্যুতের বিকল্প পায়, তখন তারা দ্রুত সেই সুযোগ গ্রহণ করে। এটি কেবল বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রবণতা নয়; এটি পরিবারভিত্তিক জ্বালানি নিরাপত্তারও একটি সূচনা।
ছাদে সৌর প্যানেল থাকলে গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রয়োজন কমে, বাড়তে থাকা ট্যারিফের প্রভাব সীমিত হয় এবং সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব। কিন্তু গ্রিডের সীমাবদ্ধতা বাড়ার পাশাপাশি নেট মিটারিংয়ের প্রচলিত কাঠামো পরিবর্তিত হলে শুধু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন যথেষ্ট হবে না।
পরবর্তী ধাপ হতে হবে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ।

সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি একসঙ্গে ব্যবহারের সুযোগ
সৌরবিদ্যুৎ-ভিত্তিক হাইব্রিড ব্যবস্থা, যেখানে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজও থাকবে, পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকে দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে ব্যবহারের সুযোগ দিতে পারে। এতে গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রয়োজন কমবে ঠিক সেই সময়, যখন বিদ্যুতের ব্যয় ও চাহিদা দুটোই বেশি থাকে।
এখানে পাকিস্তানের জন্য ব্যাটারি প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ব্যাটারি বাজারে যেসব প্রযুক্তি বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, তার বাইরে সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ভবিষ্যতে স্থির বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থায় তুলনামূলক কম ব্যয় এবং ভালো তাপীয় স্থিতিশীলতার বিকল্প হতে পারে। পাকিস্তানের দীর্ঘ ও প্রচণ্ড গরমের মৌসুম বিবেচনায় এই বৈশিষ্ট্য বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
দেশীয় সম্পদও এ ক্ষেত্রে একটি সম্ভাব্য ভিত্তি তৈরি করে। পাকিস্তানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শিলা-লবণের মজুত রয়েছে, যার মধ্যে খেওড়া অঞ্চলের উচ্চমানের লবণ বিশেষভাবে পরিচিত। এই সম্পদ থেকে ব্যাটারি-গ্রেড সোডিয়াম যৌগ উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলা গেলে ভবিষ্যতের সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি শিল্পের একটি দেশীয় উপাদানভিত্তি তৈরি হতে পারে।
তবে কাঁচা লবণ থেকে সরাসরি সম্পূর্ণ ব্যাটারি উৎপাদনের স্বপ্ন দেখা বাস্তবসম্মত নয়। এর জন্য বিশেষায়িত রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্যাথোড ও অ্যানোড উপকরণ, সেল উৎপাদন, ইলেকট্রনিক্স এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত ধাপে ধাপে সক্ষমতা তৈরি করা।
প্রথমে ব্যাটারি সংযোজন, পরীক্ষাগার ও মান নির্ধারণ ব্যবস্থা, পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা এবং কারিগরি দক্ষতা গড়ে তোলা যেতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে উপাদান ও রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থানীয় পর্যায়ে আনার চেষ্টা করা সম্ভব।

একই নীতি সৌর প্যানেল ও অন্যান্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা দরকার। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে শিল্পনীতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর শুধু আমদানি করা জ্বালানির বিকল্প তৈরি করবে না; এটি নতুন উৎপাদন সক্ষমতা, স্থানীয় সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ রপ্তানির সুযোগও তৈরি করতে পারে।
জ্বালানি রূপান্তর আসলে অর্থনৈতিক কৌশল
পাকিস্তানের জ্বালানি রূপান্তরকে শুধু জলবায়ু নীতির অংশ হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ অর্থনৈতিক গুরুত্ব ধরা পড়বে না। এটি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা ও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার কৌশল।
স্বল্পমেয়াদে যে জ্বালানি আমদানি করতেই হবে, তার জন্য বিকল্প সরবরাহ পথ তৈরি করতে হবে। পরিবার ও ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে ব্যাটারি সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। মধ্যমেয়াদে CPEC-এর Green Corridor-কে কার্যকর করতে হলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে হবে। আর দীর্ঘমেয়াদে ব্যাটারি, সৌর প্রযুক্তি এবং অন্যান্য পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
বহির্বিশ্বের জ্বালানি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল অর্থনীতি এমন সব সংকটের কাছে দুর্বল থাকবে, যার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু শক্তির উৎসে বৈচিত্র্য, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকেন্দ্রীকরণ এবং দেশীয় পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি শিল্প গড়ে তুলতে পারলে সেই নির্ভরতার কাঠামো বদলানো সম্ভব।
নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর তাই কেবল পরিবেশ রক্ষার প্রকল্প নয়। সঠিক নীতি, বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সঙ্গে এটি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম সক্ষমতা শক্তিশালী করার অন্যতম পথ হয়ে উঠতে পারে।
আরফা ইজাজ 


















