বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীর ও মনের সক্ষমতা কীভাবে বদলাচ্ছে, তা বোঝার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্ব পাচ্ছে ‘ইনট্রিনসিক ক্যাপাসিটি’। মানুষের শক্তি, চলাফেরা, ইন্দ্রিয়ের সক্ষমতা, চিন্তাশক্তি, মানসিক সুস্থতা ও সামগ্রিক প্রাণশক্তিকে একসঙ্গে বিবেচনা করে বার্ধক্যের প্রভাব বোঝার এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে দীর্ঘায়ু গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
২০১৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য উদ্যোগের অংশ হিসেবে ‘ইনট্রিনসিক ক্যাপাসিটি’ ধারণাটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংজ্ঞায়িত করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো শুধু রোগ শনাক্ত করার পরিবর্তে একজন মানুষের দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা কতটা বজায় আছে, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া।
কীভাবে মাপা হয় ইনট্রিনসিক ক্যাপাসিটি
এই সক্ষমতা নির্ধারণে পাঁচটি প্রধান বিষয় বিবেচনা করা হয়—জ্ঞানীয় সক্ষমতা, চলাফেরা ও শারীরিক শক্তি, দৃষ্টি ও শ্রবণসহ ইন্দ্রিয়ের কার্যক্ষমতা, মানসিক সুস্থতা এবং প্রাণশক্তি বা শারীরিক চাপ সামলে ওঠার সামগ্রিক ক্ষমতা।
এর কিছু পরীক্ষা ইতোমধ্যেই বয়স্কদের স্বাস্থ্য মূল্যায়নে ব্যবহৃত হয়। যেমন হাতের মুঠোর শক্তি এবং হাঁটার গতি পরিমাপ। গবেষণায় দেখা গেছে, ইনট্রিনসিক ক্যাপাসিটির সঙ্গে বয়স্ক মানুষের অক্ষমতা ও মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা একবারের স্কোরে নয়, বরং সময়ের সঙ্গে একজন মানুষের সক্ষমতার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে। সক্ষমতা কমতে শুরু করলে তা আগেভাগে শনাক্ত করে জীবনযাপন বা চিকিৎসায় পরিবর্তন আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বয়সের আগেই পরিবর্তন শনাক্তের চেষ্টা
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তি দেখতে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং কোনো বড় রোগে আক্রান্ত না হলেও তার সক্ষমতার সূক্ষ্ম পরিবর্তন ধরা সম্ভব হতে পারে। এতে পরবর্তী জীবনে বড় ধরনের শারীরিক বা মানসিক অবনতির অনেক আগে সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করে হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে তরুণদের ক্ষেত্রে বর্তমান অনেক পরীক্ষা খুব বেশি কার্যকর নয়। কারণ সুস্থ ও তরুণ অধিকাংশ মানুষ এসব পরীক্ষায় প্রায় পূর্ণ নম্বর পান। তাই সব বয়সে পরিবর্তন শনাক্ত করা যায়—এমন নতুন মাপকাঠি খুঁজছেন গবেষকেরা।
দীর্ঘায়ুর ওষুধ অনুমোদনেও হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ
ফ্রান্সে বয়স্কদের নিয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক গবেষণায় নিয়মিত প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে ইনট্রিনসিক ক্যাপাসিটি মূল্যায়ন করা হচ্ছে। স্কোরের ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরামর্শ। সক্ষমতা কমে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত জেরিয়াট্রিক নার্সের কাছে পাঠানো হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোতেও ইনট্রিনসিক ক্যাপাসিটি নিয়ে প্রথম মার্কিন গবেষণা শুরু হয়েছে। তবে এখনো নিশ্চিত নয়, এভাবে আগেভাগে হস্তক্ষেপ করলে মানুষের আয়ু বাড়বে কি না।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের অধীন এআরপিএ-এইচও ইনট্রিনসিক ক্যাপাসিটি নিয়ে একটি গবেষণা কর্মসূচিতে অর্থায়ন করছে। লক্ষ্য হলো এমন একটি নির্ভরযোগ্য সূচক তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে বার্ধক্য ধীর করার ওষুধের কার্যকারিতা মূল্যায়নে ব্যবহার করা যেতে পারে।
দীর্ঘায়ু বাড়ানোর ওষুধ অনুমোদনের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো মানুষের আয়ু সত্যিই বাড়ছে কি না জানতে কয়েক দশক ধরে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো প্রয়োজন হতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা বার্ধক্যের এমন বিকল্প সূচক খুঁজছেন, যা তুলনামূলক কম সময়ে পরিবর্তন পরিমাপ করতে পারে।
গবেষকেরা এখন পরীক্ষা করছেন, ইনট্রিনসিক ক্যাপাসিটি মানুষের অনুভূত স্বাস্থ্য, দৈনন্দিন কার্যক্ষমতা কিংবা আয়ুর সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত এবং ব্যায়ামের মতো জীবনযাপন পরিবর্তন বা সম্ভাব্য দীর্ঘায়ু-সহায়ক ওষুধের মাধ্যমে এটি উন্নত করা যায় কি না। সফল হলে বার্ধক্য লক্ষ্য করে তৈরি ওষুধের কার্যকারিতা যাচাইয়ের নতুন পথ খুলে যেতে পারে।
তবে গবেষকেরাই সতর্ক করে বলছেন, এই পদ্ধতি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি।
‘ইনট্রিনসিক ক্যাপাসিটি’ শুধু একটি স্বাস্থ্য স্কোর নয়; বরং রোগ দেখা দেওয়ার আগেই মানুষের শরীর ও মনের সক্ষমতায় পরিবর্তন শনাক্ত করার সম্ভাব্য একটি বৈজ্ঞানিক কাঠামো। গবেষণা সফল হলে ভবিষ্যতে সুস্থ বার্ধক্য এবং দীর্ঘায়ু চিকিৎসার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















