গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোয় ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশটিতে চলমান ইবোলা প্রাদুর্ভাব ‘সূচকীয় হারে’ বাড়ছে এবং গত তিন মাসে এ রোগে ২ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকের মৃত্যু হয়েছে মাত্র গত ২০ দিনে।
জাতিসংঘের কর্মকর্তা জুলিয়েন হারনেইস শুক্রবার জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বর্তমানে ইবোলা সংক্রমণের কেন্দ্রস্থল বুনিয়ায় রয়েছেন। তার ভাষ্য, পরিস্থিতি এত দ্রুত অবনতি হচ্ছে যে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে চলমান উদ্যোগও এর গতির সঙ্গে তাল মিলাতে পারছে না।
ফ্রান্সের চেয়েও বড় এলাকায় সংক্রমণ
হারনেইস জানান, ইবোলা সংক্রমণ এখন ব্যাপক এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্ত অঞ্চলটির আয়তন ফ্রান্সের চেয়েও বড় হয়ে গেছে। তার মতে, ভাইরাসের বিস্তার ইবোলা মোকাবিলার কার্যক্রমের তুলনায় দ্রুততর ও বিস্তৃত হচ্ছে।
ডিআর কঙ্গোর এটি ১৭তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব। ধারণা করা হচ্ছে, ১৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করার কয়েক সপ্তাহ আগেই ভাইরাসটির সংক্রমণ শুরু হয়েছিল।
দেশটির উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়েছে। এসব অঞ্চলে সরকারি উপস্থিতি দুর্বল, স্বাস্থ্য অবকাঠামো সীমিত এবং দীর্ঘদিন ধরে বহু সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা রয়েছে।
ছয় প্রদেশে সংক্রমণ, উগান্ডাতেও ছড়িয়েছিল
এখন পর্যন্ত ডিআর কঙ্গোর ছয়টি প্রদেশে ইবোলা সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দক্ষিণ সুদানের সীমান্তবর্তী এলাকাও রয়েছে। প্রতিবেশী উগান্ডাতেও ভাইরাসটি ছড়িয়েছিল। দেশটিতে ২০ জন আক্রান্ত হওয়ার পর দুজনের মৃত্যু হয়। তবে গত মাসে উগান্ডা নিজেকে ইবোলামুক্ত ঘোষণা করেছে।
টিকা ও চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তা
বর্তমান সংক্রমণের জন্য দায়ী বান্দিবুগিও ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো অনুমোদিত কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে এ নিয়ে কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ডিআর কঙ্গোকে এরভেবো টিকার ৭০ হাজার ডোজ দেওয়া হবে। এই টিকা ইবোলার তুলনামূলকভাবে বেশি পরিচিত জাইরীয় ধরনটির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টিকা বিশেষজ্ঞরা চলতি মাসের শুরুতে এরভেবোর পূর্ণাঙ্গ মানবপর্যায়ের পরীক্ষা চালানোর সুপারিশ করেছেন। এর উদ্দেশ্য হলো, বান্দিবুগিও ধরনটির বিরুদ্ধেও টিকাটি সুরক্ষা দিতে পারে কি না, তা যাচাই করা। প্রাণীর ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় কিছু সুরক্ষার সম্ভাবনা দেখা গেলেও মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা এখনো নিশ্চিত নয়।
নিরাপত্তাহীনতা ও স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যুও বড় বাধা
ইবোলা মোকাবিলায় নিরাপত্তাহীনতা ও দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হারনেইস জানান, প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে প্রায় ১৬০ জন স্বাস্থ্যকর্মী ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সসহ সম্মুখসারির কর্মীদের ওপর বারবার হামলার ঘটনাও ঘটছে।
এর পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর থাকায় ইবোলা মোকাবিলায় নিয়োজিত কর্মীদের বেতন পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর সক্ষমতা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে বলে জানান হারনেইস।
আরও জনবল ও আন্তর্জাতিক সহায়তা দ্রুত বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, পূর্বাঞ্চলের দুর্গম এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত কর্মী ও সম্পদ পৌঁছানো গেলে কয়েক মাসের মধ্যে সংক্রমণের গতি কমিয়ে তা নিয়ন্ত্রণের দিকে নেওয়া সম্ভব। অন্যথায় মহামারি আরও প্রাণঘাতী হয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















