অনেকের কাছেই কোনো কাজ শুরু করাটাই সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে মনোযোগ ধরে রাখা, সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা কিংবা একঘেয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে মন যেন বারবার অন্যদিকে চলে যায়। এডিএইচডি থাকা ব্যক্তিদের জন্য এমন সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে। তবে অন্য একজন মানুষের উপস্থিতিই কখনও কখনও কাজ শুরু ও শেষ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করতে পারে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘বডি ডাবলিং’।
অন্যের উপস্থিতিই যখন অনুপ্রেরণা
এডিএইচডি প্রশিক্ষক রবিন নর্ডমেয়ার সপ্তাহে একদিন অন্য কয়েকজন প্রশিক্ষকের সঙ্গে অনলাইনে যুক্ত হয়ে নিজের কাজ করেন। তাঁরা একই কাজ করেন না, এমনকি পরস্পরের সঙ্গে কথাও বলতে হয় না। শুধু অন্যরা কাজ করছে—এই উপস্থিতিটুকুই তাঁকে নিজের অসমাপ্ত বা একঘেয়ে কাজগুলো শেষ করতে উৎসাহ দেয়।
বডি ডাবলিং মূলত এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে কেউ নিজের কাজ করার সময় পাশে অন্য একজনকে রাখেন। সেই ব্যক্তি একই কাজ করতে পারেন, আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজও করতে পারেন। উদ্দেশ্য হলো উপস্থিতির মাধ্যমে কাজের প্রতি মনোযোগ ও দায়বদ্ধতা বাড়ানো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিএইচডির ক্ষেত্রে মনের বিচরণ এবং কাজ থেকে সহজেই সরে যাওয়ার প্রবণতা থাকায় অন্য একজনের উপস্থিতি এক ধরনের বাহ্যিক অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করতে পারে।
কেন এই পদ্ধতি কাজ করতে পারে
এডিএইচডি এমন একটি স্নায়ুবিক বিকাশজনিত অবস্থা, যার সঙ্গে পরিকল্পনা করা, মনোযোগ ধরে রাখা, নির্দেশনা মনে রাখা, সময় ব্যবস্থাপনা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের মতো নির্বাহী দক্ষতার সমস্যা জড়িত থাকতে পারে।
কোনো কাজের প্রতি নিজের আগ্রহ কম থাকলে সেটি শুরু করার জন্য ভেতর থেকে যথেষ্ট তাগিদ নাও আসতে পারে। বডি ডাবলিং সেখানে বাহ্যিক একটি কাঠামো তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা হলো, মানুষ সামাজিক প্রাণী হওয়ায় অন্য কারও ওপর দায়বদ্ধতা তৈরি হলে কাজ করার আগ্রহ বাড়তে পারে। নিজের জন্য কোনো কাজ করতে অনীহা থাকলেও অন্য কেউ অপেক্ষা করছে বা তার ওপর নির্ভর করছে—এমন অনুভূতি কাজটি শুরু করার শক্তি জোগাতে পারে।
তবে বডি ডাবলিং নিয়ে সরাসরি গবেষণা এখনও খুব বিস্তৃত নয়। কিন্তু এডিএইচডি মোকাবিলায় বাহ্যিক অনুপ্রেরণা ও কাঠামো ব্যবহারের ধারণাটি দীর্ঘদিন ধরেই স্বীকৃত।

কীভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করবেন
বডি ডাবলিং শুধু অফিসের কাজের ক্ষেত্রে নয়। পড়াশোনা, ঘরের কাজ, কাগজপত্র গোছানো, ব্যায়াম কিংবা দীর্ঘদিন ধরে ফেলে রাখা যেকোনো কাজেই এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে সঙ্গী নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। এমন কাউকে বেছে নেওয়া ভালো, যিনি আপনার কাজ শেষ করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবেন এবং অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বা অন্য কোনো কারণে আপনাকে বিভ্রান্ত করবেন না। এমন একজন মানুষ বেশি উপকারী, যার সঙ্গে আপনি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন এবং প্রয়োজনে যিনি উৎসাহ দিতে পারেন।
কাজের সময় গল্প বা আড্ডা শুরু হয়ে গেলে মূল উদ্দেশ্য নষ্ট হতে পারে। তাই আলাপের বিষয় থাকলে সেটি কাজের বিরতি কিংবা কাজ শেষ হওয়ার পরের জন্য রেখে দেওয়া ভালো।
কাউকে বডি ডাবল হতে বলতেও অস্বস্তি লাগতে পারে। কিন্তু বিষয়টি সরাসরি বলা যায়। যেমন, আপনি বলতে পারেন, ‘আমি শুনেছি, পাশে কেউ থাকলে কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়ে। তুমি কি আমার কাজ করার সময় কিছুক্ষণ পাশে থাকবে? তুমিও চাইলে নিজের কোনো কাজ করতে পারো।’
দুজনের কাজের বিনিময়েও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। যেমন, একজন শনিবার অন্যজনকে ঘর গোছাতে সাহায্য করলেন, আর অন্যজন রবিবার প্রথমজনকে তার কাজের জায়গা গোছাতে সাহায্য করলেন।
নিয়মিত সময় নির্ধারণ করে বডি ডাবলিং করা যায়। আবার যখনই কোনো কঠিন কাজ সামনে আসে, তখনও কাউকে পাশে থাকার অনুরোধ করা যেতে পারে।
ভার্চুয়াল বডি ডাবলিংও হতে পারে
বাস্তবে পাশে থাকার মতো বন্ধু বা সহকর্মী না থাকলেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্ভব। অনলাইনে কেউ কাজ করার সময় সরাসরি সম্প্রচার করেন, যাতে অন্যরাও সেই উপস্থিতিকে কাজে মনোযোগ ধরে রাখার উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
অনলাইনে কাজের সঙ্গী খোঁজার বিভিন্ন মাধ্যমও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্যামেরা চালু রাখতে বলা হয়, যাতে দুজনই দেখতে পারেন যে অন্যজন নিজের কাজে বসে আছেন। তবে ক্যামেরায় নিজেকে দেখাতে অস্বস্তি হলে কথোপকথনের মাধ্যমেও দায়বদ্ধতা তৈরি করা সম্ভব।
কফি শপ বা পাঠাগারও হতে পারে ‘বডি ডাবল’
আশপাশে অন্য মানুষ কাজ করছে—এমন পরিবেশও অনেকের জন্য একই ধরনের সহায়তা তৈরি করে। এ কারণেই কেউ কেউ কফির দোকান, পাঠাগার কিংবা যৌথ কর্মস্থলে বসে বাড়ির তুলনায় বেশি মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারেন।
সেখানে কেউ সরাসরি আপনার কাজের তদারকি না করলেও অন্যদের কাজ করতে দেখার বিষয়টি নিজের মধ্যেও কাজের পরিবেশ তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যেক মানুষ একইভাবে চিন্তা বা কাজ করেন না। কারও একা থাকলে মনোযোগ বাড়ে, আবার কারও জন্য আশপাশে অন্য মানুষের উপস্থিতিই কাজের কাঠামো ও মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করে। তাই নিজের জন্য কোন পদ্ধতিটি কার্যকর, তা পরীক্ষা করে খুঁজে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















