ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ সিনেমাটি নিয়ে বিতর্কের বড় অংশ জুড়ে আছে এর অভিনয়শিল্পী নির্বাচন কিংবা প্রাচীন কাহিনির ঐতিহাসিক যথার্থতা। কিন্তু এসব বিতর্কের চেয়ে আমার কাছে সিনেমাটি যে বড় প্রশ্নটি সামনে আনে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো—মানবিকতা, সমতা ও সহমর্মিতার মূল্যবোধকে ধারণ করতে গিয়ে আধুনিক উদারনৈতিক সমাজ কি তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সাহস এবং বড় কিছু অর্জনের আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে ফেলছে?
এই প্রশ্নটি নতুন নয়। বরং আজকের রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আলোচনায় এটি নতুন ভাষায় ফিরে এসেছে।
হোমারের ওডিসিউস এমন এক পৃথিবীর বীর, যেখানে বিজয়ই ছিল সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি। বুদ্ধি, কৌশল, সাহস এবং প্রয়োজনে প্রতারণা—সবকিছুই একজন নায়কের গৌরবের অংশ হতে পারত। ট্রয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ট্রোজান ঘোড়ার কৌশল ওডিসিউসের সেই দক্ষতারই প্রতীক।
কিন্তু আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি একই ঘটনাকে অন্যভাবে দেখে। আমরা এখন যুদ্ধের বিজয়ের পাশাপাশি তার ধ্বংসও দেখি। কৌশলের সাফল্যের সঙ্গে প্রতারণার নৈতিক মূল্যও বিবেচনা করি। একজন বিজয়ী যোদ্ধার মধ্যে শুধু গৌরব নয়, অপরাধবোধ ও অনুশোচনাও দেখতে পাই।
আমার কাছে এই পরিবর্তনটি পশ্চিমা সভ্যতার দীর্ঘ নৈতিক যাত্রার একটি প্রতীক।
শক্তির নৈতিকতা থেকে মানবমর্যাদার দিকে
খ্রিস্টধর্মের বিস্তারের সঙ্গে পশ্চিমা সমাজে ধীরে ধীরে এমন একটি নৈতিক ধারণা শক্তিশালী হয়, যেখানে কেবল শক্তিশালী মানুষের জয় নয়, দুর্বল মানুষের মর্যাদাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরে আলোকায়ন যুগ এই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করে ব্যক্তি-স্বাধীনতা, সমান অধিকার এবং সর্বজনীন মানবমর্যাদার ভিত্তি তৈরি করে।
এটি মানবসভ্যতার একটি অসাধারণ অর্জন।
একসময় যারা দাস, ভূমিদাস, বিদেশি, নারী কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ হিসেবে বিবেচিত হতো, তাদের অধিকারের পরিধি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে। আধুনিক উদারনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি হলো—কে পূর্ণ মানবমর্যাদার অধিকারী, সেই বৃত্তকে ক্রমাগত বড় করা।
কিন্তু আজ এই অর্জনকেই কেউ কেউ দুর্বলতার কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন।
জনপ্রিয়তাবাদী ডানপন্থার একটি অংশ এবং প্রযুক্তি জগতের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি মনে করেন, পশ্চিমা সমাজ সহমর্মিতা ও সমতার প্রতি এত বেশি মনোযোগী হয়েছে যে তার পুরোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও শক্তির কিছুটা হারিয়ে গেছে। তাদের দৃষ্টিতে শক্তিশালী হওয়া, প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া এবং জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
এই সমালোচনার সবটুকু অগ্রাহ্য করা সহজ। কিন্তু তা করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া হয়।
আমরা কি এতটাই মানবিক হয়ে গেছি যে অসাধারণ কিছু করার ইচ্ছাই হারিয়ে ফেলছি?
নিটশের প্রশ্ন আজও ফিরে আসে
ফ্রিডরিখ নিটশে বহু আগে খ্রিস্টীয় সমতা ও নৈতিকতার সমালোচনা করেছিলেন। তার আশঙ্কা ছিল, সবাইকে সমান মর্যাদা দেওয়ার নীতি মানুষের অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস এবং অসাধারণ হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষাকে দুর্বল করতে পারে।
আজ প্রযুক্তি জগতের কিছু নতুন চিন্তাবিদের বক্তব্যে সেই প্রশ্নেরই আধুনিক সংস্করণ দেখা যায়।
এখানে আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার। কারণ সভ্যতার বড় অর্জনগুলো শুধু সহমর্মিতা থেকে জন্ম নেয়নি। পিরামিড, গথিক ক্যাথেড্রাল, সমুদ্রযাত্রা, শিল্পবিপ্লব—এসবের পেছনে ছিল বিপুল উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আত্মবিশ্বাস, ঝুঁকি এবং ত্যাগের মানসিকতা।
মানুষ শুধু নিরাপদ ও আরামদায়ক জীবন চায় না। মানুষ এমন কিছু তৈরি করতেও চায়, যা আগে ছিল না। একটি দেশও শুধু স্থিতিশীল থাকতে চায় না; সে বড় হতে চায়, নতুন কিছু অর্জন করতে চায়, বিশ্বে প্রভাব রাখতে চায়।

এই আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করা রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক।
জাতীয় মহানুভবতার প্রতিশ্রুতি কেন মানুষের কাছে আকর্ষণীয়, তা বোঝার জন্য শুধু রাজনৈতিক নীতির দিকে তাকালেই হবে না। এর মধ্যে আছে একটি আবেগ—আমরা আবার বড় কিছু করতে চাই, আমরা আবার নির্মাণ করতে চাই, আমরা আবার জয়ী হতে চাই।
প্রশ্ন হলো, সেই জয় কেমন হবে?
শ্রেষ্ঠত্বের জন্য মানবিকতা বিসর্জন নয়
আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় ভুল পছন্দটি হলো—মনে করা যে মহান হতে হলে নির্মম হতে হবে এবং মানবিক হতে হলে উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন হতে হবে।
ইতিহাস এই ধারণাকে সমর্থন করে না।
উনিশ ও বিশ শতকের পশ্চিমা উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলো একই সঙ্গে উচ্চাভিলাষী এবং মানবিক ছিল। তারা মহাদেশজুড়ে রেলপথ তৈরি করেছে, শিল্পায়ন ঘটিয়েছে, দাসপ্রথা বিলোপ করেছে, পারমাণবিক প্রযুক্তি তৈরি করেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ ও জাপান পুনর্গঠনে ভূমিকা রেখেছে এবং মানুষকে চাঁদে পাঠিয়েছে।
আমেরিকার ইতিহাসে এই দ্বৈত সাফল্য আরও স্পষ্ট। দেশটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়েছে, বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ করেছে, কমিউনিজমের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে এবং একই সঙ্গে দাসপ্রথা ও বর্ণবৈষম্যের উত্তরাধিকার ভাঙার চেষ্টা করেছে।
অর্থাৎ উদারনীতি কখনোই উচ্চাকাঙ্ক্ষার শত্রু ছিল না।
বরং এর সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্করণ মানুষকে একই সঙ্গে দুটি কাজ করতে শিখিয়েছে—অন্য মানুষের মর্যাদা স্বীকার করা এবং নিজের সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা করা।
আমাদের জয়কে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে
সমস্যা ‘জয়’ শব্দটিতে নয়। সমস্যা হলো, আমরা জয় বলতে কী বুঝি।
যদি জয় মানে হয় অন্যকে পরাজিত করা, দুর্বলকে দমন করা কিংবা যেকোনো মূল্যে নিজের স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করা, তাহলে সেই ধারণা উদারনীতির সঙ্গে সংঘর্ষে যাবে।
কিন্তু জয় যদি হয় নতুন কিছু সৃষ্টি করা, বিজ্ঞানকে এগিয়ে নেওয়া, দারিদ্র্য কমানো, মানুষের জীবন উন্নত করা এবং একই সঙ্গে অন্যের অধিকারকে সম্মান করা—তাহলে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও মানবিকতা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
এই ভারসাম্যই আধুনিক উদারনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এআই হয়তো আমাদের সময়ের সবচেয়ে রূপান্তরকারী প্রযুক্তিগুলোর একটি হয়ে উঠবে। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বিজ্ঞান, যুদ্ধ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর এর প্রভাব গভীর হতে পারে।
এই প্রযুক্তি আমাদের অসাধারণ ক্ষমতা দেবে। কিন্তু ক্ষমতা যত বাড়বে, তার নৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনও তত বাড়বে।
আমরা যদি এআইকে শুধু প্রতিযোগিতা, মুনাফা কিংবা আধিপত্যের হাতিয়ার হিসেবে দেখি, তাহলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মানবিক অগ্রগতির সমার্থক হবে না। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, এই নতুন শক্তি এমন একটি নৈতিক কাঠামোর মধ্যে বিকশিত হচ্ছে, যেখানে মানুষের মর্যাদা ও সমান অধিকার মৌলিক অবস্থানে থাকে।
উদারনীতির সামনে তাই আত্মসমর্পণের কোনো কারণ নেই। মানুষের সমান মর্যাদায় বিশ্বাস করা দুর্বলতা নয়। আবার বড় কিছু নির্মাণের আকাঙ্ক্ষাও অমানবিকতার সমার্থক নয়।
আমাদের ওডিসিউসের পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন এমন এক উদারনৈতিক ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা, যেখানে মানবিকতা সাহসকে দুর্বল করে না এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানবমর্যাদাকে পদদলিত করে না।
শেষ পর্যন্ত একটি সভ্যতার আসল পরীক্ষা শুধু সে কতটা শক্তিশালী, তা নয়; সে তার শক্তি দিয়ে কী করতে চায়, সেটিও। সত্যিকারের মহান সমাজ সেই সমাজ, যে একই সঙ্গে বড় স্বপ্ন দেখতে পারে এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে।
ফারিদ জাকারিয়া 



















