কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইনির্ভর সাইবার হামলার ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। প্রযুক্তি খাতের নেতারা সতর্ক করে বলছেন, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। সাধারণ মানুষও এই ঝুঁকির বাইরে নয়। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির ফলে ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে চালানো প্রতারণা এখন আগের চেয়ে আরও নিখুঁত, ব্যক্তিগতকেন্দ্রিক এবং শনাক্ত করা কঠিন হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে সঙ্গে নিয়ে ওপেনএআই একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেছে। সেখানে বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি ও সরকারগুলোকে সাইবার প্রতিরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
চিঠিতে সতর্ক করা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও হামলা চালানো হতে পারে। হাসপাতাল, পানি শোধনাগার এমনকি ইন্টারনেট ব্যবস্থাও এর লক্ষ্য হতে পারে।
কেন এই সতর্কতা এত গুরুত্বপূর্ণ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বড় ভাষাভিত্তিক মডেলগুলোর সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার হামলার ধরনও বদলে যাচ্ছে। সম্প্রতি প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের পরীক্ষায় এমন পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মডেলগুলো পরীক্ষামূলক পরিবেশের বাইরে গিয়ে সাইবার আক্রমণের মতো কর্মকাণ্ড চালিয়েছে।

তবে এবার বিষয়টি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রযুক্তি নিয়ে সতর্কতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং শতাধিক প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত আহ্বান থেকে বোঝা যাচ্ছে, হুমকিটিকে তারা আরও বিস্তৃত ও গুরুতর হিসেবে দেখছে।
বোস্টন কলেজ আইন বিদ্যালয়ের সাইবার নিরাপত্তা, ঝুঁকি ও শাসনবিষয়ক এক বিশেষজ্ঞের মতে, এটি নিছক বিপণনের কৌশল নয়; বরং সংশ্লিষ্ট মহলে সত্যিকারের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সাইবার নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি প্রতারণামূলক বার্তা ও ফোনকল
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাইবার হামলার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ালেও প্রতারণার মূল কৌশল অনেক ক্ষেত্রে একই রয়ে গেছে। প্রতারকেরা পরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে মানুষকে অর্থ, ব্যক্তিগত তথ্য বা গুরুত্বপূর্ণ হিসাবের তথ্য দিতে প্রলুব্ধ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসব প্রতারণাকে আরও দ্রুত, কম খরচে এবং ব্যক্তিভেদে সাজিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব করছে। ফলে অপরাধী চক্রগুলো একই ধরনের প্রতারণা বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে পারছে।
২০২৫ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট ইন্টারনেট অপরাধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত সংস্থার কাছে ২২ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়ে। এসব ঘটনায় প্রতিবেদিত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৮৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি।
এর মধ্যে একটি পরিচিত কৌশল হলো পরিবারের সদস্যকে লক্ষ্য করে প্রতারণা। কোনো মা-বাবা বা দাদা-দাদির কাছে ফোন করে প্রতারক নিজেকে তাদের সন্তান বা নাতি-নাতনি হিসেবে পরিচয় দিতে পারে। এরপর জরুরি বিপদের কথা বলে দ্রুত অর্থ পাঠানোর অনুরোধ করা হয়।
এ ধরনের কথোপকথনে তাড়াহুড়োর পরিবেশ তৈরি করা হয়। আর এই অস্বাভাবিক তাড়াহুড়োই হতে পারে প্রতারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।
কণ্ঠস্বর নকল করেও প্রতারণা সম্ভব

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মানুষ ও ছোট ব্যবসার জন্য বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো নকল কণ্ঠস্বর ও নকল ভিডিও।
কয়েক বছর আগেও প্রতারকের ফোন বা বার্তায় অনেক সময় ভাষা, বানান, কণ্ঠস্বর কিংবা আচরণের অসঙ্গতি দেখে সন্দেহ করা যেত। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির ফলে সেই দুর্বলতা অনেকটাই কমে এসেছে।
এখন কোনো ব্যক্তির কণ্ঠস্বর বা চেহারা এতটাই বিশ্বাসযোগ্যভাবে নকল করা সম্ভব যে কাছের মানুষও বিভ্রান্ত হতে পারেন। ফলে শুধু পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে বা ভিডিওতে পরিচিত মুখ দেখেই কাউকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে বিশ্বাস করা নিরাপদ নয়।
নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে যা করবেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার নিরাপত্তার মৌলিক নিয়মগুলো এখনো অত্যন্ত কার্যকর। গুরুত্বপূর্ণ হিসাবগুলোতে একাধিক ধাপের পরিচয় যাচাই চালু রাখা, সফটওয়্যার নিয়মিত হালনাগাদ করা এবং শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা জরুরি।
কেউ যদি ফোন করে জরুরি কোনো অনুরোধ জানায়, বিশেষ করে অর্থ বা ব্যক্তিগত তথ্য চায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস না করে ফোনটি কেটে দিয়ে পরিচিত নম্বরে নিজে থেকে ফোন করা ভালো।
কারণ প্রতারকেরা এমন প্রযুক্তিও ব্যবহার করতে পারে, যার মাধ্যমে পরিচিত কোনো ফোন নম্বর থেকে কল আসছে বলে মনে হয়। তাই ফোনের পর্দায় পরিচিত নম্বর দেখা গেলেই সেটিকে সত্যিকারের কল ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একটি গোপন সংকেত বা নির্দিষ্ট প্রশ্নও ঠিক করে রাখা যেতে পারে। জরুরি পরিস্থিতিতে ফোন করা ব্যক্তি সত্যিই পরিবারের সদস্য কি না, তা যাচাই করতে সেই সংকেত ব্যবহার করা সম্ভব।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছেও ব্যক্তিগত তথ্য দেবেন না
শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিচালিত হামলা নয়, মানুষ যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবাগুলো নিজেরাই ব্যবহার করছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কথোপকথন ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবেদনশীল তথ্য রাখার জন্য নিরাপদ জায়গা হয়ে যায় না। তাই ব্যক্তিগত, আর্থিক বা গোপনীয় তথ্য কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থায় দেওয়ার আগে সেই তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ, ব্যবহার বা অন্যের সঙ্গে ভাগ করা হতে পারে, তা বোঝা জরুরি।
প্রযুক্তির সক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্বও তত দ্রুত বাড়ছে। তাই শুধু বড় প্রতিষ্ঠান বা সরকারের ওপর নির্ভর না করে ব্যক্তিগত পর্যায়েও সচেতনতা, যাচাই এবং নিরাপত্তার মৌলিক অভ্যাস গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো ভবিষ্যতের সাইবার হামলাকে আরও শক্তিশালী করবে, কিন্তু সতর্কতা, যাচাই এবং নিরাপত্তার সঠিক অভ্যাস এখনো প্রতারণার বিরুদ্ধে মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।




















