হিমালয়ের দেশ নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শনিবার উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে ধ্বংসস্তূপ সরানো, সুড়ঙ্গে আটকে থাকা মানুষকে উদ্ধার, যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং মরদেহ শনাক্ত করতে বিদেশি কারিগরি সহায়তা চেয়েছে নেপাল।
বুধবারের আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও তিব্বতে অন্তত ৬৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনো প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালে নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৪২৬ জন। তিব্বতের গিরং জেলায় নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৫৫৪ জন। নিখোঁজদের মধ্যে ৫৪০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক, যাদের অনেকেই ভারতের হিন্দু তীর্থযাত্রী।
খারাপ আবহাওয়ায় উদ্ধারকাজ স্থগিত
নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া জেলায় শনিবার বৃষ্টি ও ঘন কুয়াশার কারণে উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। এখন উদ্ধার হওয়া তীর্থযাত্রীদের রাজধানী কাঠমান্ডুতে পৌঁছে দিতে স্থলপথে পরিবহনের ব্যবস্থা করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বন্যার তিন দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েকটি মরদেহ পচে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে সেগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে এসব মরদেহ খোলা জায়গায় দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে কাঠমান্ডুর একটি চিকিৎসাকেন্দ্রের সামনে বহু পরিবার ভিড় করেছেন। উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি দেখে স্বজনদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন তারা। হাসপাতালে নেওয়া ৪৯টি মরদেহের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র সাতটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
মরদেহ শনাক্তে বিশেষজ্ঞ সহায়তা
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, দেশটির এখন সাধারণ অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই। তবে কিছু বিশেষায়িত কাজে পর্যাপ্ত দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে।
সুড়ঙ্গে আটকে থাকা মানুষকে উদ্ধার, ধ্বংস হয়ে যাওয়া সেতুর কারণে বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা সচল করা, মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করা, বংশগত নমুনা পরীক্ষা এবং মরদেহ দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের মতো কাজে বিদেশি বিশেষজ্ঞ সহায়তা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি।
নেপাল ইতোমধ্যে এসব বিশেষায়িত সেবা ও কারিগরি সহায়তার জন্য বিভিন্ন দেশের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে।
পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৫০০ কোটি ডলার
ভয়াবহ বন্যায় নেপালের অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে ভবন, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও যোগাযোগব্যবস্থা। দেশটির অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে জানিয়েছেন, প্রাথমিক হিসাবে পুনর্গঠনে প্রায় ৪০০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতে পারে।
তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো করা হয়নি। ফলে পুনর্গঠনের প্রকৃত ব্যয় আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সীমান্তের হ্রদ নিয়ে শঙ্কা কিছুটা কমেছে
বন্যার পর নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী এলাকায় তৈরি হওয়া একটি হ্রদ উপচে পড়ার আশঙ্কায় শুক্রবার উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। হ্রদের পানি নেপালের লেন্দে খোলা ও ত্রিশূলী নদীর দিকে প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
শনিবার চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হ্রদ উপচে পড়ার ঝুঁকি কিছুটা কমেছে। উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, হ্রদের পানি ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং জলাধারের পানির স্তর কমছে।
তবে বন্যার ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। সীমান্তের উজানে থাকা দুটি হ্রদ সম্পূর্ণ খালি না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে বন্যার আশঙ্কা থাকবে বলে সতর্ক করেছেন কর্মকর্তারা।
ভারত ও চীনের সহায়তা
দুর্যোগের পর নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রতিবেশী ভারত। দেশটি তিনটি উড়োজাহাজে প্রায় ৬০ টন ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে কম্বল, ওষুধ, খাবার এবং পানি বিশুদ্ধ করার উপকরণ।
এ ছাড়া সুড়ঙ্গে আটকে থাকা মানুষ উদ্ধারে বিশেষ দল ও চিকিৎসক দল পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী, অস্থায়ী সেতু এবং কারিগরি দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে ভারত।
চীনও নেপালের দুর্যোগকবলিত এলাকায় জরুরি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্ধার তৎপরতায় সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে।
বুধবারের আকস্মিক বন্যাটি সম্ভবত হিমবাহ ধসে সৃষ্ট বিশাল জলপ্রবাহ থেকে শুরু হয়েছিল। পাহাড়ি নদীগুলো দিয়ে পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নেমে এসে কয়েক মিনিটের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা তছনছ করে দেয়। এখন উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি ধ্বংসপ্রাপ্ত যোগাযোগব্যবস্থা পুনর্গঠন ও বিপুল অর্থের সংস্থানই নেপালের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেপালের ভয়াবহ বন্যায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত, নিখোঁজ প্রায় ৩ হাজার। পুনর্গঠনে প্রয়োজন হতে পারে ৫০০ কোটি ডলার। বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি সহায়তা চেয়েছে কাঠমান্ডু।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















