ফ্রান্সে সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বন্দিত্ব ও প্রদর্শনীর অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে প্রাণীকল্যাণের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু মারিনল্যান্ড অঁতিবের ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, কোনো নিষ্ঠুর শিল্পের বিরুদ্ধে আইন পাস করাই শেষ কথা নয়। সেই শিল্প বন্ধ হওয়ার পর তার ভেতরে থাকা প্রাণীগুলোর কী হবে, কোথায় যাবে, কে তাদের আজীবন দেখভাল করবে—এসব প্রশ্নের উত্তর আগে থেকেই প্রস্তুত না থাকলে নিষেধাজ্ঞা নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
জুলাইয়ের শেষ দিকে মারিনল্যান্ড থেকে আটটি বোতলনোজ ডলফিন—ড্যাম, রকি, লুয়া, নিও, টাক্স, কাই, আনিয়া ও জো—অবশেষে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তারা সড়কপথে নিস বিমানবন্দরে যায় এবং সেখান থেকে কার্গো বিমানে স্পেনের মালাগায় পৌঁছে সেলভো মারিনায় রাখা হয়।
দেড় বছরেরও বেশি সময় একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া পার্কের ক্রমশ অবনতিশীল অবকাঠামোর মধ্যে কাটানোর পর এই স্থানান্তর অবশ্যই স্বস্তির খবর। কিন্তু এটিকে চূড়ান্ত সমাধান বলা যাবে না। সেলভো মারিনাও একটি চালু ডলফিনারিয়াম এবং এর মালিক সেই প্যারকেস রেউনিদোস, যে প্রতিষ্ঠান মারিনল্যান্ডেরও মালিক।
পরিকল্পনা হচ্ছে ডলফিনগুলোকে পরে ফ্রান্সের জুপার্ক দ্য বোভালে নির্মাণাধীন একটি নতুন স্থাপনায় নেওয়া। কিন্তু সেই স্থাপনা কবে প্রস্তুত হবে, তার নিশ্চিত সময়সূচি এখনো নেই।
অঁতিবে এখনও চারটি ডলফিনের পাশাপাশি রয়ে গেছে উইকি ও কেইজো—ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া শেষ দুটি বন্দি অর্কা। ডলফিনগুলোকে ভ্যালেন্সিয়ার ওশেনোগ্রাফিকে পাঠানোর প্রস্তাব রয়েছে। আর উইকি ও কেইজোকে টেনেরিফের লোরো পার্কে পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে ফ্রান্স। তবে সেই স্থানান্তরের জন্য স্পেন সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন।
আইন যখন ভবিষ্যৎ তৈরি করে না
ফ্রান্স ২০২১ সালে সিটাসিয়ান প্রাণীদের প্রদর্শনী বন্ধের আইন পাস করেছিল। মারিনল্যান্ড বন্ধ হয় ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি। অথচ এই দুই সময়ের মাঝেও প্রাণীগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্থায়ী সমাধান তৈরি হয়নি।
স্থানান্তরের বিভিন্ন প্রস্তাব এসেছে, বিরোধিতার মুখে পড়েছে, আবার সামনে এসেছে। প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলোর আপত্তিরও যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল। ফ্রান্স যে বাণিজ্যিক বন্দিত্বের ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করেছে, সেই প্রাণীগুলোকে অন্য একটি বাণিজ্যিক ডলফিনারিয়াম বা অর্কা প্রদর্শনী কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিলে নিষেধাজ্ঞার নৈতিক উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হবে?
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ওয়ান ভয়েস আদালতের মাধ্যমে এমন একটি অস্থায়ী নির্দেশনা আদায় করে, যার ফলে মারিনল্যান্ডের অর্কাদের স্থানান্তর আটকে যায় এবং তাদের স্বাস্থ্য ও জীবনযাপনের অবস্থা নিয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়। অন্য সংগঠনগুলোও চালু ডলফিনারিয়ামে স্থানান্তরের বিরোধিতা করে অভয়ারণ্যের দাবি জানায়।
এই অবস্থানকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু সমস্যাটি হলো, বিতর্কের সময় কোনো কার্যকর অভয়ারণ্য প্রাণীগুলোকে গ্রহণ করার মতো প্রস্তুত ছিল না। ফলে আদর্শ গন্তব্যের সন্ধান চলতে থাকলেও প্রাণীগুলো থেকে যায় এমন একটি প্রতিষ্ঠানে, যার অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছিল।
তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা বনাম দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য
এই জায়গাতেই নীতিনির্ধারণের একটি মৌলিক পার্থক্য বুঝতে হবে। বন্দিত্বের অবসান একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। কিন্তু ইতিমধ্যে বন্দি অবস্থায় জন্ম নেওয়া প্রাণীদের বেঁচে থাকা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি তাৎক্ষণিক দায়িত্ব।
মারিনল্যান্ডের সাম্প্রতিক ইতিহাস সেই দায়িত্বের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে উইকির ১২ বছর বয়সী ছেলে মোয়ানা ব্যাকটেরিয়াজনিত সেপটিসেমিয়ায় মারা যায়। পাঁচ মাস পর তার ভাই ইনুক ধাতব বস্তু গিলে মারা যায়।
এই মৃত্যুগুলো কেবল অতীতের ঘটনা নয়। এগুলো এমন একটি পরিবেশের ঝুঁকি তুলে ধরে, যেখানে উইকি ও কেইজো এখনও অবস্থান করছে। তাদের ঘিরে অবকাঠামোগত অবনতির পাশাপাশি নির্মাণকাজও চলেছে।
২০২৬ সালের মে মাসে ফ্রান্সের পরিবেশগত রূপান্তরবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মাতিয়ু লেফেভর জানান, বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদনে মারিনল্যান্ডের পুলগুলোকে অস্থিতিশীল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো প্রস্তাবিত অভয়ারণ্য প্রয়োজনীয় সময়ের মধ্যে প্রাণীগুলোকে গ্রহণ করতে পারবে না বলেও তিনি জানান। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে কোনো পুল ভেঙে পড়লে প্রাণীগুলোকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ছাড়া বিকল্প নাও থাকতে পারে বলে সতর্ক করা হয়।
এমন অবস্থায় কেবল ‘অন্য বন্দিত্বে পাঠানো যাবে না’—এই নীতিতে আটকে থাকা যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, এখন কোন সিদ্ধান্তে প্রাণীগুলোর ঝুঁকি সবচেয়ে কম?
উইকি ও কেইজো দুজনই মারিনল্যান্ডে জন্মেছে। তাদের সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তারা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের ওপর নির্ভরশীল এবং ভবিষ্যতেও খাবার, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার প্রয়োজন হবে। তাই অভয়ারণ্য তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য একটি নিরাপদ মধ্যবর্তী ব্যবস্থা অপরিহার্য।
লোরো পার্ক আদর্শ সমাধান নয়
লোরো পার্ক নিজেকে উইকি ও কেইজোর যত্ন নেওয়ার সক্ষমতা রাখে বলে মনে করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কোনো অভয়ারণ্য নয়; এটি একটি পর্যটনকেন্দ্র, যেখানে অর্কারা জনসাধারণের সামনে প্রদর্শিত হয়। সেখানে অর্কার প্রজননও অব্যাহত রয়েছে। মরগান নামের একটি অর্কা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুটি বাচ্চার জন্ম দিয়েছে; প্রথমটি উলা ২০২১ সালে দুই বছর বয়সে মারা যায় এবং দ্বিতীয়টি তেনো জন্ম নেয় ২০২৫ সালের মার্চে।
অতএব উইকি ও কেইজোকে লোরো পার্কে পাঠানো হলে তারা এক ধরনের বিনোদনকেন্দ্র থেকে অন্য একটি চালু বিনোদনকেন্দ্রে যাবে। এটিকে বন্দিত্বের সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে অঁতিবের অবস্থা যদি সত্যিই তাদের জীবনকে তাৎক্ষণিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে, তাহলে লোরো পার্কে স্থানান্তর হয়তো সবচেয়ে কম ক্ষতিকর অস্থায়ী বিকল্প হতে পারে। কিন্তু এমন স্থানান্তরকে কোনোভাবেই লোরো পার্কের বাণিজ্যিক মডেলের অনুমোদন হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বরং যেকোনো স্থানান্তর চুক্তিতে কঠোর শর্ত থাকতে হবে। উইকি ও কেইজোকে একসঙ্গে রাখতে হবে। তাদের প্রজনন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখতে হবে। স্বাধীন পর্যালোচনা ছাড়া তাদের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে বিক্রি বা স্থানান্তর করা যাবে না। তাদের স্বাস্থ্য ও কল্যাণের ওপর নিয়মিত এবং স্বচ্ছ নজরদারি থাকতে হবে। ভবিষ্যতে বিশ্বাসযোগ্য অভয়ারণ্য তৈরি হলে সেখানে অবসর নেওয়ার পথও খোলা রাখতে হবে।
বর্তমান প্রাণীদের দায় এড়ানো যাবে না
বন্দি অর্কা ও ডলফিনের প্রজনন বন্ধ হওয়া জরুরি। কিন্তু নতুন প্রাণী জন্ম না দেওয়ার সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে ইতিমধ্যে জন্ম নেওয়া প্রাণীদের প্রতি দায়িত্বও শেষ হয়ে গেল।
বরং এখানেই সবচেয়ে বড় নীতিগত শিক্ষা রয়েছে। যে কোম্পানিগুলো প্রাণীদের প্রজনন করিয়েছে, প্রদর্শন করেছে এবং তাদের ঘিরে ব্যবসা করেছে, তাদেরই প্রথমে আজীবন পরিচর্যার আর্থিক দায় বহন করতে হবে।
কোনো সরকার বন্দি প্রাণীভিত্তিক শিল্প বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলে, গেট বন্ধ হওয়ার আগেই প্রতিটি প্রাণীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে। পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগেই আলাদা করে আজীবন পরিচর্যার তহবিল গঠনে বাধ্য করা যেতে পারে। সেই অর্থ যেন কোম্পানি দেউলিয়া হলে, মালিকানা বদলালে বা ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলেও প্রাণীদের জন্য সুরক্ষিত থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। দাতব্য সংগঠনগুলোকেও ভূমিকা রাখতে হতে পারে। কিন্তু বাণিজ্যিক লাভের সময় প্রাণীদের ব্যবহার করে পরে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে পুরো ব্যয় রাষ্ট্র ও দাতব্য খাতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না।
একই সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য অভয়ারণ্য, অন্তর্বর্তীকালীন আবাসন, নিরাপদ পরিবহন এবং বিশেষায়িত পশুচিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য বিনিয়োগ প্রয়োজন।
মারিনল্যান্ডের ঘটনা তাই কেবল কয়েকটি ডলফিন বা অর্কার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরোধ নয়। এটি দেখাচ্ছে, প্রাণী বন্দিত্বের অবসান ঘটাতে হলে আইন, অর্থায়ন এবং বাস্তব ব্যবস্থাপনা—তিনটিকেই একসঙ্গে পরিকল্পনা করতে হবে।
ড. রেবেকা গ্যাস্টনের মূল যুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই: বন্দিত্বের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োজন, কিন্তু সেই আইন যেন এমন প্রাণীদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে না দেয়, যাদের জীবন মানুষের তৈরি ব্যবস্থার সঙ্গে ইতিমধ্যেই সম্পৃক্ত।
বন্দিত্বের দরজা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত তখনই সত্যিকারের প্রাণীকল্যাণের পদক্ষেপ হবে, যখন সেই দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাণীদের জন্য নিরাপদ একটি পথও আগে থেকেই তৈরি থাকবে।
ড. রেবেকা গ্যাস্টন 



















