জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত যত তীব্র হচ্ছে, খরা আর কেবল একটি মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা এখন খাদ্য উৎপাদন, পানির নিরাপত্তা, জীবিকা ও ভূমির স্বাস্থ্যের ওপর একই সঙ্গে চাপ তৈরি করছে। এই বাস্তবতায় সংকট দেখা দেওয়ার পর ত্রাণ বা জরুরি সহায়তা দেওয়ার বদলে আগেভাগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রস্তুতি নেওয়ার দিকে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ঝোঁক বাড়ছে।
এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে যাচ্ছে গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটির (GEF) নতুন ড্রাইল্যান্ডস অ্যান্ড ড্রট ম্যানেজমেন্ট ইন্টিগ্রেটেড প্রোগ্রাম। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত GEF-9 বিনিয়োগ চক্রে পরিচালিতব্য এই কর্মসূচির প্রাথমিক অর্থায়ন ধরা হয়েছে ১৪০ মিলিয়ন ডলার। জাতিসংঘের মরুকরণবিরোধী কনভেনশনের পক্ষগুলোর অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মূল প্রশ্নটি অর্থের পরিমাণ নিয়ে নয়, বরং সেই অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হবে তা নিয়ে। কর্মসূচিটির লক্ষ্য হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ শুষ্ক অঞ্চলগুলোকে এমন সক্ষমতা দেওয়া, যাতে খরা আঘাত হানার পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে তার সম্ভাব্য প্রভাব আগে থেকেই অনুমান করে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। জাতীয় পর্যায়ে নজরদারি, প্রস্তুতি এবং ঝুঁকি প্রশমনের সক্ষমতা তৈরিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
খরা মানেই শুধু পানির সংকট নয়
শুষ্ক অঞ্চলে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব এক খাতের মধ্যে আটকে থাকে না। পানির ঘাটতি কৃষিকে দুর্বল করে, কৃষির ক্ষতি খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে এবং জীবিকার ওপর চাপ বাড়ায়। একই সঙ্গে ভূমির অবক্ষয় আরও বেশি শুষ্কতা ও উৎপাদনশীলতা হ্রাসের পথ তৈরি করতে পারে।
তাই নতুন কর্মসূচিতে পরিবেশ, খাদ্যব্যবস্থা, পানিসম্পদ ও স্থানীয় জীবিকাকে আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে না দেখে পরস্পর সংযুক্ত সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ দৃষ্টিভঙ্গিই উদ্যোগটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি।
আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বও এর কাঠামোর অংশ। রিয়াদ গ্লোবাল ড্রট রেজিলিয়েন্স পার্টনারশিপ এবং ড্রট রেজিলিয়েন্স ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটির মতো বৃহত্তর উদ্যোগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে অর্থ ও কর্মসূচির প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ একটি বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের বদলে খরা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকে একটি বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে।
চারণভূমি রক্ষার সঙ্গে খরা মোকাবিলা
এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো র্যাংল্যান্ডস ফ্ল্যাগশিপ ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে এর সংযোগ। মঙ্গোলিয়া ও জাতিসংঘের মরুকরণবিরোধী কনভেনশনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই বৈশ্বিক প্রচারণার লক্ষ্য বিশ্বের চারণভূমি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করা।
এ ক্ষেত্রে GEF ৩.৩ মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের মাধ্যমে বাস্তবায়িত একটি প্রকল্পে। এর সঙ্গে মঙ্গোলিয়া ও IUCN-এর ৮ মিলিয়ন ডলার সহ-অর্থায়ন রয়েছে। আগের GEF-8 চক্রে চারণভূমি ও পশুপালক জনগোষ্ঠীকে সহায়তার জন্য অনুমোদিত ৫০টি প্রকল্পে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়নের ধারাবাহিকতাও এতে রয়েছে।
এখানে একটি বড় শিক্ষা রয়েছে। খরা মোকাবিলা শুধু অবকাঠামো বা জরুরি পানির সরবরাহের বিষয় নয়; যে ভূমির ওপর স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পশুপালকদের জীবন নির্ভরশীল, সেই ভূমির স্থিতিশীলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চারণভূমি রক্ষা তাই পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জীবিকা সুরক্ষার একই সঙ্গে কাজ করতে পারে।
অর্থায়নের কাঠামোতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত
GEF-9-এর প্রাথমিক কর্মসূচি কাঠামোয় মোট ৩.৯ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে খরা সহনশীলতার জন্য আলাদা পর্যবেক্ষণ সূচক এবং বিশেষ সম্পদ বরাদ্দের সূত্র রাখা হচ্ছে। ভূমি, খাদ্য ও প্রতিবেশব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে চারটি সমন্বিত কর্মসূচির মাধ্যমে ৮০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ পরিচালিত হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
তবে অর্থের পরিমাণের পাশাপাশি কারা সেই অর্থের সুফল পাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। GEF-এর তহবিল কাঠামোর ২০ শতাংশ সম্পদ সরাসরি আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের উপকারে ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। একই সঙ্গে GEF-9-এর মোট অর্থের ১০ শতাংশ ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স ব্যবস্থার জন্য নির্ধারিত। লক্ষ্য হলো GEF-এর অর্থ ব্যবহার করে বেসরকারি খাত থেকে আরও বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, যার সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা মোট GEF সম্পদের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত।
এখানে জলবায়ু অর্থায়নের একটি পরিবর্তিত বাস্তবতা স্পষ্ট। কেবল অনুদান দিয়ে সমস্যা সমাধানের বদলে সরকারি, আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি অর্থকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এই মডেলের সাফল্য নির্ভর করবে বিনিয়োগ কতটা বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটা কার্যকর ভূমিকা থাকছে তার ওপর।
প্রতিক্রিয়া নয়, প্রস্তুতিই হতে হবে মূল কৌশল
খরার প্রভাব ক্রমেই বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী হলে পুরোনো ধরনের জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা যথেষ্ট নাও হতে পারে। কোনো অঞ্চলে পানি ফুরিয়ে যাওয়ার পর নতুন ব্যবস্থা নেওয়া, ফসল নষ্ট হওয়ার পর কৃষকদের সহায়তা দেওয়া কিংবা ভূমি অতিরিক্ত অবক্ষয়ের পর পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া—এসব প্রয়োজনীয় হলেও মূল সংকট প্রতিরোধ করে না।
নতুন আন্তর্জাতিক উদ্যোগটির তাৎপর্য এখানেই। এর কেন্দ্রে রয়েছে আগাম প্রস্তুতি, তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকি প্রশমন। অর্থাৎ খরাকে অনিবার্য বিপর্যয় হিসেবে মেনে নেওয়ার পরিবর্তে তার ঝুঁকি কমানোর সক্ষমতা তৈরি করা।
তবে ১৪০ মিলিয়ন ডলার কিংবা বৃহত্তর তহবিল কাঠামো একাই সাফল্যের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। কার্যকর জাতীয় প্রতিষ্ঠান, নির্ভরযোগ্য তথ্য, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া অর্থায়ন দ্রুত বিচ্ছিন্ন প্রকল্পে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা এড়ানোও জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে খরা মোকাবিলার আসল পরীক্ষা তাই শুধু কত টাকা বরাদ্দ হলো, তা নয়। পরীক্ষা হবে সেই অর্থ দিয়ে দেশ ও সম্প্রদায়গুলো কতটা আগে থেকে প্রস্তুত হতে পারল, ভূমি ও পানির সম্পদ কতটা টেকসইভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারল এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষগুলোকে কতটা সুরক্ষিত রাখা গেল।
GEF-এর নতুন কর্মসূচি সেই দিকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর সাফল্য প্রমাণ করতে হবে মাঠপর্যায়ে—যেখানে খরা একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং পানি, খাদ্য ও জীবিকার প্রতিদিনের বাস্তব সংকট।
জেসি জ্যাকবস 



















