০৬:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
ফিফার ক্ষমতার নেপথ্যে আলোচিত ‘ফিক্সার’ মারিও গাল্লাভোত্তি নাইজারে বিদ্রোহী সেনাদের হামলার পর বিমানঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার তিন লাখ টাকা নিয়ে গরু কিনতে গিয়ে হামলার শিকার আ.লীগ নেতা, বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ পশ্চিমা প্রভাবের পাল্টা শক্তি হিসেবে মধ্য এশিয়ায় বড় সমাবেশ, একই মঞ্চে পুতিন-শি-মোদি-শেহবাজ শিশু-কিশোরীকে আত্মঘাতী হামলায় ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ, বেলুচিস্তানে উদ্ধার দুই বোনঝি দুর্যোগে যখন সব যোগাযোগ বন্ধ, পাকিস্তানে ভরসা হয়ে উঠছে পুরোনো রেডিও সন্ত্রাস মামলায় ‘মুখহীন গোপন বিচার’ চায় পাঞ্জাব, সংবিধান নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন জন্মের চেয়ে মৃত্যু বেশি, জনসংখ্যা কমছে হাঙ্গেরিতে জুলাইয়ে বিদেশি সহায়তা কমেছে ১৩.৪ শতাংশ, ঋণ পরিশোধে বেড়েছে চাপ তিব্বতের বন্যায় ২৩ দেশের ২৬১ বিদেশি নিখোঁজ, নেপালে মৃত ৭৩৪

জ্বালানি তেল বেসরকারিকরণ: প্রতিযোগিতা, নাকি নতুন সিন্ডিকেট?

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জ্বালানি তেল কোনো সাধারণ পণ্য নয়। এর দাম বাড়লে শুধু গাড়ির খরচ বাড়ে না; বাড়ে কৃষির উৎপাদন ব্যয়, পণ্য পরিবহনের খরচ, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতের সঙ্গে জ্বালানি তেলের সরাসরি বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তনের অভিঘাতও অন্য অনেক পণ্যের তুলনায় বহুগুণ বেশি।

এই বাস্তবতায় জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে বড় পরিসরে যুক্ত করার সরকারের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন। ৬ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া তৈরির নির্দেশ দেয়।

যদিও এখনো নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হয়নি। তবে ইতোমধ্যে এই বেসরকারিকরণ নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। সরকার বলেছে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নয়, বরং নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে তা চূড়ান্ত করা হবে।

এখানে আসল প্রশ্ন হলো হলো বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার ফলে এখাতে সত্যিকার প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, নাকি বাংলাদেশের জ্বালানি বাজার কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে এই সংস্কার শেষ পর্যন্ত জনগণের জন্য সুফল বয়ে আনবে, নাকি নতুন ধরনের বাজার-ঝুঁকি তৈরি করবে।

ইরান যুদ্ধ: বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুদ আসলে কত, চলবে কয়দিন? - BBC News  বাংলা

যে বাজারের ৯২ শতাংশই আমদানিনির্ভর

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন পেট্রোলিয়াম পণ্যের চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় ৯২ শতাংশই আমদানি করে বিপিসি; স্থানীয় উৎস থেকে আসে প্রায় ৮ শতাংশ। আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের একটি অংশ ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়, আর বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করে বিপিসি।

অন্য হিসাবে, বর্তমানে বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে বিপিসি; এর মধ্যে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টন পরিশোধিত এবং ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সরকার-টু-সরকার চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে এসব তেল আমদানি করা হয়।

অর্থাৎ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু একটি বাণিজ্যিক বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজার, ভূরাজনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা। এই কারণেই জ্বালানি তেলের বাজারে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে সাধারণ ভোগ্যপণ্যের বাজারের মতো চিন্তা করলে চলবে না।

বেসরকারি খাত আসলে বাজারের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

সরকারের উদ্যোগের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো বেসরকারি বিনিয়োগ এলে আমদানির উৎস বাড়বে, নতুন অবকাঠামো তৈরি হবে, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী হবে এবং প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।

এ যুক্তির যথেষ্ট ভিত্তি আছে। বিশ্বের অনেক দেশেই জ্বালানি খাতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাশাপাশি কাজ করে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশে বেসরকারি কোম্পানি আমদানি, পরিশোধন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনে অংশ নেয়। তবে সেসব দেশে সরকারের ভূমিকা শেষ হয়ে যায়নি; বরং মান, নিরাপত্তা, মজুত, বাজার প্রতিযোগিতা ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ থাকে।

অতএব বাংলাদেশেও বেসরকারি বিনিয়োগকে পুরোপুরি অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক অর্থনৈতিক সত্য মনে রাখা জরুরি, তা হলো বেসরকারি মালিকানা মানেই প্রতিযোগিতা নয়।

একটি বাজারে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ঢুকলেই সেখানে প্রতিযোগিতা তৈরি হয় না। বরং বাজারে প্রবেশের বাধা যদি বেশি হয়, বড় অঙ্কের মূলধন প্রয়োজন হয় এবং আমদানি, সংরক্ষণাগার, পরিবহন ও খুচরা বিক্রির অবকাঠামো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে প্রতিযোগিতার বদলে ‘অলিগোপলি’ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

জ্বালানি তেলের বাজারে সেই ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ এখানে শুধু পণ্য আমদানি করলেই ব্যবসা শেষ নয়। আমদানির পর তা সংরক্ষণ করতে হবে, পরিবহন করতে হবে, ডিপো গড়তে হবে, বিতরণ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত পাম্পে সরবরাহ করতে হবে।

অর্থাৎ যে প্রতিষ্ঠান আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, তার বাজারক্ষমতাও হবে বড়।

চারটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আগ্রহ:

সরকারি উদ্যোগের পেছনে বেসরকারি ব্যবসায়িক আগ্রহও রয়েছে। চারটি ব্যবসায়িক গ্রুপ জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছে। এর মধ্যে টিকে, মেঘনা ও বসুন্ধরা গ্রুপের নাম এসেছে। বসুন্ধরা পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির অনুমতি চেয়েছে; অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দেশে রিফাইনারি স্থাপন করে অপরিশোধিত তেল আমদানি ও পরিশোধনের আগ্রহ জানিয়েছে।

বসুন্ধরা গ্রুপের প্রস্তাবে বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টন ডিজেল, ২ লাখ টন অকটেন, দেড় লাখ টন পেট্রোল এবং ৮ থেকে ১০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল আমদানির পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানেই নীতিনির্ধারকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব করতে হবে। দেশের মোট বাজার যদি প্রায় ৭২ লাখ টন হয় এবং কোনো একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একাই কয়েক মিলিয়ন টন জ্বালানি আমদানির সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে সেটি কি শুধু প্রতিযোগিতা বাড়াবে, নাকি বাজারে একটি বড় শক্তি হিসেবেও আবির্ভূত হবে? এ প্রশ্নের উত্তর নীতিমালা তৈরির আগেই প্রয়োজন।

জ্বালানি তেল বিক্রিতে আসছে ডিজিটাল ব্যবস্থা | The Daily Star

২১ জুলাইয়ের সুপারিশ বনাম ৬ আগস্টের নির্দেশ

বিষয়টির আরেকটি দিকও উপেক্ষা করা যায় না। একটি শিল্পগোষ্ঠীর বেসরকারিভাবে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির আবেদন পর্যালোচনার জন্য ১৪ জুলাই বিপিসির ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে আইনগত ভিত্তি, বাণিজ্যিক বাস্তবতা, বিপিসি ও তার তিন বিপণন কোম্পানির বাজার হিস্যা, রাজস্ব, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছিল।

কমিটি ২১ জুলাই প্রতিবেদন দেয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, কমিটি বেসরকারি অপারেটরদের জন্য এই খাত উন্মুক্ত না করার সুপারিশ করেছিল।

এরপরই ৬ আগস্ট মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাতের কাঠামো বদলের ক্ষেত্রে এত অল্প সময়ের মধ্যে নীতিমালা তৈরির যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, নিয়ন্ত্রক, বাণিজ্যিক, আর্থিক ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রভাব নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন ছাড়া এমন নীতিমালা করা উচিত নয়।

সংস্কার যদি করতেই হয়, তাহলে তাড়াহুড়ো করে নয়; বরং তথ্য-উপাত্ত, অর্থনৈতিক মডেলিং, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে করা উচিত।

এলপিজি ও ভোজ্যতেল: যে অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করা যায় না

বাংলাদেশে বাজার উন্মুক্ত করার পর একটি প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছে, সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেই কি বাজারে সেই দামে পণ্য পাওয়া যায়? এলপিজির বাজার এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বিইআরসি মূল্য নির্ধারণ করলেও নির্ধারিত দামে ভোক্তা সবসময় সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। জ্বালানি খাতের সাবেক কর্মকর্তাদের একজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে এলপিজি কেনার অভিযোগ রয়েছে।

ভোজ্যতেলের বাজারেও সরবরাহ ঘাটতি এবং দাম বাড়ানোর অভিযোগ নতুন নয়। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর অনুমতি না পেলে সরবরাহ কমিয়ে বাজারে চাপ তৈরি করেন, এমন অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। একই উৎসে সরকারি নির্ধারিত ১৯৮ টাকা কেজির তেল ২২০ টাকায় বিক্রির উদাহরণও রয়েছে।

অবশ্য এসব উদাহরণ থেকে সরাসরি সিদ্ধান্ত টানা যাবে না যে, জ্বালানি তেল বেসরকারি খাতে গেলেই একই ঘটনা ঘটবে। এখানে পণ্যের বাজার কাঠামো আলাদা।

কিন্তু এগুলো একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে এমন দেশে, যেখানে বাজার তদারকি, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধে রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, সেখানে কৌশলগত পণ্যের বাজার উন্মুক্ত করার আগে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা জরুরি।

জ্বালানির বাজারে সিন্ডিকেট হলে ক্ষতি হবে বহুগুণ

ভোজ্যতেলের বাজারে সিন্ডিকেট বা সরবরাহ ঘাটতি হলে একটি পরিবারের খাদ্য ব্যয় বাড়ে। কিন্তু জ্বালানি তেলের বাজারে একই ধরনের সমস্যা হলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে পুরো অর্থনীতিতে।

কারণ জ্বালানির দাম বাড়ায় → পরিবহন ব্যয় → পণ্য পরিবহনের খরচ → কৃষি ও শিল্পের ব্যয় → উৎপাদন খরচ → পণ্যের দাম → সর্বপরি, মূল্যস্ফীতি।

এটি কেবল তাত্ত্বিক আশঙ্কা নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির অজুহাতে ২০২৬ সালে একাধিকার আভ্যন্তরীন বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয। প্রথম দফা ১৯ এপ্রিল একবারে সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ানো হয়। এ দফায় ডিজেল ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়। তার পরপরই ১ জুন থেকে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার অধীনে আবারও দাম কিছুটা বাড়ানো হয়। এ দফায় ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়ানো হয়। জুলাই ও আগস্ট মাসেও এই দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

আগে থেকেই বিগত ৪ বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মুল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। তারওপর এই দুই দাফায় জ্বালানি তেলের বড় ধরণের দাম বৃদ্ধির কারণে তখনই পরিবহন ও খাদ্য ব্যয়ের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। বাস্তবে সেই আশংকাই সত্যি হয়েছে। পরের মাসেই পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিততে মুল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপর উঠে যায়।

বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতিও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে নেমেছে, যা আগের অর্থবছরের ১০ দশমিক ০৩ শতাংশের চেয়ে কম। কিন্তু চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা এখনও কাটেনি। সাম্প্রতিক সময়ে মুল্যস্ফীতি যে সামান্য পরিমানে কমেছে তা পণ্যমুল্য কমার কারণে নয়। উচ্চ মুল্যভিত্তির কারণে। কারণ যে মূল্যের সঙ্গে এখনকার মুল্য তুলনা করে মুল্যস্ফীতি ঘোষণা করা হয়, সেই মুল্যভিত্তিও ছিল চড়া। যে কারণে এখন পন্যমুল্য না কমলেও মুল্যস্ফীতি ক্রমান্বয়ে কমে আসবে। এতে মুল্যস্ফীতি খাতায়পত্রে কম দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের উচ্চমুল্যের দুর্ভোগ কমবে না।

তাই এই সময়ে জ্বালানির বাজারে এমন কোনো নীতি গ্রহণ করা ঠিক হবে না, যা নতুন করে সরবরাহ ও মূল্য অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ: স্বচ্ছতা জরুরি

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি মূল্য সমন্বয় ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় ও বিনিময় হারের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ করা এবং জ্বালানি ভর্তুকির চাপ কমানো।

এটি নীতিগতভাবে একটি যুক্তিসংগত ব্যবস্থা হতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলে তার সুবিধা ভোক্তাকে দেওয়া এবং দাম বাড়লে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা, দুটিই একটি স্বচ্ছ সূত্রের মাধ্যমে হওয়া উচিত।

কিন্তু বেসরকারি আমদানিকারক যুক্ত হলে প্রশ্ন আরও জটিল হবে। তখন জানতে হবে- আমদানিকারকের প্রকৃত আমদানি ব্যয় কী?; পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয় কত?; তার মুনাফার সীমা কত?; সরকারি নির্ধারিত দামের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?; আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে স্থানীয় বাজারে কত দ্রুত দাম কমবে?; আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে কতটা দ্রুত দাম বাড়ানো যাবে? এবং সরকার ভর্তুকি দিলে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সমান সুবিধা পাবে কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর নীতিমালায় স্পষ্ট না থাকলে ‘বাজার উন্মুক্ত’ হলেও ভোক্তার জন্য বাজার স্বচ্ছ হবে না। বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিমও বলেছেন, বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান পাশাপাশি থাকলে মূল্য নির্ধারণ, প্রতিযোগিতা, বাজারে প্রবেশাধিকার, বিতরণ এবং ভর্তুকির কাঠামো স্পষ্ট করতে হবে।

আইএমএফের চাপই কী কারণ

জ্বালানি মূল্য ও ভর্তুকির প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশে বিতর্ক রয়েছে। আইএমএফের মূল নীতিগত অবস্থানের মধ্যে ছিল জ্বালানি ভর্তুকি কমানো, জ্বালানি মূল্যকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় ব্যবস্থার মাধ্যমে ভর্তুকির চাপ কমানো।

তারই আলোকে আইএমএফ বাংলাদেশকে জ্বালানি তেল আমদানি-বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

বাংলাদেশ ২০২৬ সালে আগের ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ কর্মসূচি থেকে বের হয়ে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। নতুন আলোচনাতেও রাজস্ব বাড়ানো, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। আইএমএফ সবচেয়ে বেশি চাপ দিচ্ছে, সরকারি অর্থে ভর্তূকি কমানো। কিন্তু প্রশ্ন হলো- সরকার কি আইএমএফের টাকায় ভর্তূীক দেয়, নাকি জনগনের করের টাকায় ভর্তূকি দেয়। সরকার জনগনের টাকায় ভর্তূীক দিলে আইএমএফের এতো উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ কী। আইএমএফ তো কখনো মুল্যস্ফীতি কমানোর কথা বলে না। বললেও পুরোনো তত্ত্ব হাজির করে বলে মুদ্রানীতি কঠোর করার মাধ্যমে মুল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে। কিন্তু বাংলাদেশে মুল্যস্ফীতি তৈরি হয়েছে পণ্যের উচ্চ মুল্য ও উচ্চ বিনিময় হারের কারণে। আইএমএফের উচিত কিভাবে পণ্যমুল্য এবং উচ্চ বিনিময় হার কমানো যায় সে ব্যাপারে পরামর্শ দেয়া। যাতে আমদানি ব্যয় কমে গিয়ে পণ্যমুল্য কমে আসে। আর যদি ভর্তূকি কমাতেই হয়, তাহলে ভর্তুকি কমানোর নীতি কীভাবে জনগণের ওপর অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ না দিয়ে বাস্তবায়ন করা যায়, সেই পরামর্শ দেয়া উচিত।

সিন্ডিকেট: দৃশ্য ও অদৃশ্য

ভর্তুকি কমলেই কি জনগণের লাভ হবে?

ভর্তুকি অর্থনীতিতে সবসময় খারাপ, এমন ধারণাও সঠিক নয়। আবার ভর্তুকি চিরস্থায়ী করাও কোনো সমাধান নয়। যেখানে ভর্তুকি অপচয় হয়, ধনী-গরিব নির্বিশেষে একই সুবিধা পায় বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা ঢেকে রাখে, সেখানে সংস্কার দরকার।

কিন্তু জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর সময় দেখতে হবে, তার বিপরীতে সাধারণ মানুষের ওপর কী পরিমাণ মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হচ্ছে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে- সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে কাকে? রাষ্ট্র যদি জ্বালানির দাম কিছুটা সহনীয় রাখতে অর্থ ব্যয় করে, সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থই। প্রশ্ন হওয়া উচিত সেই অর্থ দক্ষভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না। ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দিয়ে যদি বাজারের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত বাজারক্ষমতা অর্জন করে এবং ভোক্তাকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের ভর্তুকি কমলেও জনগণের বোঝা কমবে না। বরং ভর্তুকির জায়গায় বেসরকারি মুনাফা বড় হয়ে উঠতে পারে।

আসল দুর্বলতা দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা

এই বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা। বিইআরসির সক্ষমতা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বেসরকারি জ্বালানি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু প্রবিধান দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

বিইআরসির একজন সদস্যও বলেছেন, বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি দেওয়ার বিষয়টি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং এ মুহূর্তে এ বিষয়ে কমিশনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি।

এ অবস্থায় প্রশ্ন হলো, যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বর্তমান কাঠামোয় পর্যাপ্ত ক্ষমতা ও বিধিবিধান নিয়ে কাজ করতে পারছে না, তাকে আরও বড় ও শক্তিশালী বেসরকারি বাজারের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কীভাবে প্রস্তুত করা হবে?

বেসরকারি খাতকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। ভয় পাওয়ার কারণ হলো দুর্বল নিয়ন্ত্রণের মধ্যে শক্তিশালী ব্যবসায়িক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন।

রাষ্ট্রীয় একচেটিয়ার বিকল্প বেসরকারি একচেটিয়া হতে পারে না

বিপিসির বর্তমান ব্যবস্থারও সংস্কারের প্রয়োজন আছে। আমদানি, মজুত, পরিবহন, সরবরাহ, বিপণন ও মূল্য নির্ধারণে আরও দক্ষতা আনা দরকার। বিপিসির অবকাঠামো আধুনিক করা এবং অপচয় কমানো জরুরি।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দুর্বলতার সমাধান যদি হয় কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলের বড় অংশ তুলে দেওয়া, তাহলে সেটি কোনো অর্থবহ সংস্কার হবে না।

রাষ্ট্রীয় একচেটিয়ার জায়গায় বেসরকারি একচেটিয়া তৈরি করা বাজার সংস্কার নয়। বরং বেসরকারি খাতকে এমনভাবে যুক্ত করতে হবে, যাতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরস্পরের প্রতিযোগী হয়, কিন্তু কেউই বাজারের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে না পারে।

পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোই টেকসই সমাধান

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে, দেশে তেল পরিশোধন ক্ষমতা বাড়ানো। বর্তমানে দেশের বার্ষিক পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল ও কেরোসিনের চাহিদা প্রায় ৬৫ লাখ টন। এর মধ্যে মাত্র ১২ থেকে ১৫ লাখ টন দেশে পরিশোধন করা হয়; বাকিটা পরিশোধিত তেল হিসেবে আমদানি করা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অপরিশোধিত তেল আমদানি করে দেশে পরিশোধন করতে পারলে প্রতি লিটারে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে।

অর্থাৎ শুধু ‘কে তেল আমদানি করবে’ এই প্রশ্নের বদলে আরও বড় প্রশ্ন হতে পারে: কেন বাংলাদেশ আরও বেশি পরিশোধন সক্ষমতা তৈরি করবে না? দেশে পরিশোধন ক্ষমতা বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো, স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানো এবং সরবরাহের স্থিতিশীলতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

বেসরকারি বিনিয়োগ এখানে আসতে পারে। নতুন রিফাইনারি, স্টোরেজ, পাইপলাইন, টার্মিনাল ও আধুনিক লজিস্টিকস নির্মাণে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে।

শেষ ভরসা হতে হবে রাষ্ট্র

জ্বালানি বাজারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি দেখা যায় সংকটের সময়ে। স্বাভাবিক বাজারে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাভের হিসাব করে ব্যবসা করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে, আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে বা বৈদেশিক মুদ্রার সংকট তৈরি হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কি একইভাবে লোকসান নিয়ে সরবরাহ অব্যাহত রাখবে?

এটি একটি বাস্তব প্রশ্ন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিমও প্রশ্ন তুলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট তৈরি হলে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যদি বলে তারা আমদানি করতে পারবে না, তখন সরকার কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে?

এ কারণেই বেসরকারি আমদানি চালু হলেও কৌশলগত সরকারি মজুত এবং সরকারি আমদানি সক্ষমতা কোনোভাবেই দুর্বল করা যাবে না। সরকারের হাতে এমন সক্ষমতা থাকতে হবে, যাতে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ কমিয়ে দিলে বা বাজার থেকে সরে গেলে রাষ্ট্র নিজেই দ্রুত ঘাটতি পূরণ করতে পারে।

তাহলে পথ কী?

সমাধান বেসরকারি খাতকে বাদ দেওয়া নয়। আবার চোখ বন্ধ করে বাজার ছেড়ে দেওয়াও নয়। প্রথমত, বেসরকারি খাতকে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হলে সব যোগ্য প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, একটি প্রতিষ্ঠান যাতে আমদানি, মজুত, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা বাজারের অস্বাভাবিক বড় অংশ একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সে জন্য বাজার-হিস্যার সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক মূল্য, পরিবহন ব্যয়, মজুত ব্যয়, কর-শুল্ক ও মুনাফার কাঠামো স্বচ্ছ করতে হবে। চতুর্থত, কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে মজুত বা সরবরাহ বন্ধ করলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্থানীয় বাজারে তার সুফল পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। ষষ্ঠত, বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানকে একই মূল্য ও ভর্তুকি কাঠামোর আওতায় আনতে হবে, যদি ভর্তুকি রাখা হয়। সপ্তমত, বিইআরসিকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন, শক্তিশালী ও দক্ষ করতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রবিধান দ্রুত অনুমোদন করতে হবে। অষ্টমত, বিপিসির আমদানি সক্ষমতা ও কৌশলগত মজুত কোনোভাবেই কমানো যাবে না।

নবম, সরকারি তিন বিপণন কোম্পানি—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—কে আরও দক্ষ করে প্রয়োজনে তাদের নিজস্ব আমদানির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠনও এমন দাবি জানিয়েছে। সবশেষে, নীতিমালা প্রণয়নের আগে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা সমীক্ষা প্রকাশ করা উচিত।

সিন্ডিকেট ও মজুতদারির পরিণাম

জনগণ যাতে নতুন বাজার-ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে

বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি কমানো, মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে নেমে এলেও জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, অর্থাৎ স্বস্তি এখনও অনেক দূরে।

এমন সময়ে জ্বালানি বাজারে সংস্কার অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু সেই সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত দক্ষতা, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা এবং কম খরচে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ।

শুধু রাষ্ট্রের ভর্তুকি কমানো সংস্কারের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। কারণ জনগণকে যদি আজ রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির বোঝা থেকে মুক্ত করে আগামীকাল কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মূল্য-ক্ষমতার কাছে জিম্মি করা হয়, তাহলে সংস্কারের অর্থ কী দাঁড়াবে?

বাংলাদেশের ভোক্তারা ইতোমধ্যে নিত্যপণ্যের বাজারে নানা ধরনের বাজার-অস্থিরতা দেখেছেন। জ্বালানি তেলের বাজারে সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি হলে তার মূল্য দিতে হবে পুরো অর্থনীতিকে। তাই বেসরকারি বিনিয়োগ আসুক, কিন্তু বাজারের নিয়ন্ত্রণ যেন কারও হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়। নতুন রিফাইনারি হোক, স্টোরেজ বাড়ুক, আমদানির উৎস বাড়ুক, প্রযুক্তি আসুক, সরবরাহব্যবস্থা আধুনিক হোক, সবই প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রের হাতে থাকতে হবে জ্বালানি নিরাপত্তার চাবিকাঠি। কারণ ব্যবসায়ীর দায়িত্ব মুনাফা করা; রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষা করা।

শেষ কথা

জ্বালানি তেলের বাজারে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ তাই নিজে কোনো সমস্যা নয়। সমস্যার সম্ভাবনা তৈরি হয় তখনই, যখন দুর্বল নিয়ন্ত্রণের মধ্যে শক্তিশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বাজারের ওপর অস্বাভাবিক ক্ষমতা অর্জন করে।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অদক্ষতা থাকলে তার সংস্কার করতে হবে। বিপিসিকে আরও দক্ষ করতে হবে। রিফাইনারি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আমদানি ও মজুত ব্যবস্থায় প্রযুক্তি আনতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগকে সুযোগ দিতে হবে।

কিন্তু এই সংস্কারের মৌলিক শর্ত একটাই হতে হবে, রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ভাঙতে গিয়ে যেন বেসরকারি একচেটিয়া বাজার তৈরি না হয়।

বাংলাদেশের মানুষের সামনে এখন নতুন কোনো সিন্ডিকেটের ভয় তৈরি করার সময় নয়। সময় হলো এমন একটি জ্বালানি বাজার গড়ে তোলার, যেখানে ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করবেন, প্রতিযোগিতা করবেন, মুনাফা করবেন, কিন্তু ভোক্তা তার হাতে জিম্মি হবেন না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি দাড়ায়, কে জ্বালানি তেল আমদানি করবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, জ্বালানি তেলের বাজারে রাষ্ট্র কার স্বার্থকে সবার আগে রাখবে: ব্যবসায়ীর বাজারক্ষমতা, নাকি জনগণের ক্রয়ক্ষমতা?

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

জনপ্রিয় সংবাদ

ফিফার ক্ষমতার নেপথ্যে আলোচিত ‘ফিক্সার’ মারিও গাল্লাভোত্তি

জ্বালানি তেল বেসরকারিকরণ: প্রতিযোগিতা, নাকি নতুন সিন্ডিকেট?

০৫:২৮:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জ্বালানি তেল কোনো সাধারণ পণ্য নয়। এর দাম বাড়লে শুধু গাড়ির খরচ বাড়ে না; বাড়ে কৃষির উৎপাদন ব্যয়, পণ্য পরিবহনের খরচ, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতের সঙ্গে জ্বালানি তেলের সরাসরি বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তনের অভিঘাতও অন্য অনেক পণ্যের তুলনায় বহুগুণ বেশি।

এই বাস্তবতায় জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে বড় পরিসরে যুক্ত করার সরকারের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন। ৬ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া তৈরির নির্দেশ দেয়।

যদিও এখনো নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হয়নি। তবে ইতোমধ্যে এই বেসরকারিকরণ নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। সরকার বলেছে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নয়, বরং নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে তা চূড়ান্ত করা হবে।

এখানে আসল প্রশ্ন হলো হলো বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার ফলে এখাতে সত্যিকার প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, নাকি বাংলাদেশের জ্বালানি বাজার কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে এই সংস্কার শেষ পর্যন্ত জনগণের জন্য সুফল বয়ে আনবে, নাকি নতুন ধরনের বাজার-ঝুঁকি তৈরি করবে।

ইরান যুদ্ধ: বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুদ আসলে কত, চলবে কয়দিন? - BBC News  বাংলা

যে বাজারের ৯২ শতাংশই আমদানিনির্ভর

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন পেট্রোলিয়াম পণ্যের চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় ৯২ শতাংশই আমদানি করে বিপিসি; স্থানীয় উৎস থেকে আসে প্রায় ৮ শতাংশ। আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের একটি অংশ ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়, আর বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করে বিপিসি।

অন্য হিসাবে, বর্তমানে বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে বিপিসি; এর মধ্যে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টন পরিশোধিত এবং ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সরকার-টু-সরকার চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে এসব তেল আমদানি করা হয়।

অর্থাৎ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু একটি বাণিজ্যিক বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজার, ভূরাজনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা। এই কারণেই জ্বালানি তেলের বাজারে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে সাধারণ ভোগ্যপণ্যের বাজারের মতো চিন্তা করলে চলবে না।

বেসরকারি খাত আসলে বাজারের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

সরকারের উদ্যোগের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো বেসরকারি বিনিয়োগ এলে আমদানির উৎস বাড়বে, নতুন অবকাঠামো তৈরি হবে, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী হবে এবং প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।

এ যুক্তির যথেষ্ট ভিত্তি আছে। বিশ্বের অনেক দেশেই জ্বালানি খাতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাশাপাশি কাজ করে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশে বেসরকারি কোম্পানি আমদানি, পরিশোধন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনে অংশ নেয়। তবে সেসব দেশে সরকারের ভূমিকা শেষ হয়ে যায়নি; বরং মান, নিরাপত্তা, মজুত, বাজার প্রতিযোগিতা ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ থাকে।

অতএব বাংলাদেশেও বেসরকারি বিনিয়োগকে পুরোপুরি অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক অর্থনৈতিক সত্য মনে রাখা জরুরি, তা হলো বেসরকারি মালিকানা মানেই প্রতিযোগিতা নয়।

একটি বাজারে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ঢুকলেই সেখানে প্রতিযোগিতা তৈরি হয় না। বরং বাজারে প্রবেশের বাধা যদি বেশি হয়, বড় অঙ্কের মূলধন প্রয়োজন হয় এবং আমদানি, সংরক্ষণাগার, পরিবহন ও খুচরা বিক্রির অবকাঠামো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে প্রতিযোগিতার বদলে ‘অলিগোপলি’ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

জ্বালানি তেলের বাজারে সেই ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ এখানে শুধু পণ্য আমদানি করলেই ব্যবসা শেষ নয়। আমদানির পর তা সংরক্ষণ করতে হবে, পরিবহন করতে হবে, ডিপো গড়তে হবে, বিতরণ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত পাম্পে সরবরাহ করতে হবে।

অর্থাৎ যে প্রতিষ্ঠান আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, তার বাজারক্ষমতাও হবে বড়।

চারটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আগ্রহ:

সরকারি উদ্যোগের পেছনে বেসরকারি ব্যবসায়িক আগ্রহও রয়েছে। চারটি ব্যবসায়িক গ্রুপ জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছে। এর মধ্যে টিকে, মেঘনা ও বসুন্ধরা গ্রুপের নাম এসেছে। বসুন্ধরা পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির অনুমতি চেয়েছে; অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দেশে রিফাইনারি স্থাপন করে অপরিশোধিত তেল আমদানি ও পরিশোধনের আগ্রহ জানিয়েছে।

বসুন্ধরা গ্রুপের প্রস্তাবে বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টন ডিজেল, ২ লাখ টন অকটেন, দেড় লাখ টন পেট্রোল এবং ৮ থেকে ১০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল আমদানির পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানেই নীতিনির্ধারকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব করতে হবে। দেশের মোট বাজার যদি প্রায় ৭২ লাখ টন হয় এবং কোনো একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একাই কয়েক মিলিয়ন টন জ্বালানি আমদানির সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে সেটি কি শুধু প্রতিযোগিতা বাড়াবে, নাকি বাজারে একটি বড় শক্তি হিসেবেও আবির্ভূত হবে? এ প্রশ্নের উত্তর নীতিমালা তৈরির আগেই প্রয়োজন।

জ্বালানি তেল বিক্রিতে আসছে ডিজিটাল ব্যবস্থা | The Daily Star

২১ জুলাইয়ের সুপারিশ বনাম ৬ আগস্টের নির্দেশ

বিষয়টির আরেকটি দিকও উপেক্ষা করা যায় না। একটি শিল্পগোষ্ঠীর বেসরকারিভাবে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির আবেদন পর্যালোচনার জন্য ১৪ জুলাই বিপিসির ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে আইনগত ভিত্তি, বাণিজ্যিক বাস্তবতা, বিপিসি ও তার তিন বিপণন কোম্পানির বাজার হিস্যা, রাজস্ব, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছিল।

কমিটি ২১ জুলাই প্রতিবেদন দেয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, কমিটি বেসরকারি অপারেটরদের জন্য এই খাত উন্মুক্ত না করার সুপারিশ করেছিল।

এরপরই ৬ আগস্ট মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাতের কাঠামো বদলের ক্ষেত্রে এত অল্প সময়ের মধ্যে নীতিমালা তৈরির যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, নিয়ন্ত্রক, বাণিজ্যিক, আর্থিক ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রভাব নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন ছাড়া এমন নীতিমালা করা উচিত নয়।

সংস্কার যদি করতেই হয়, তাহলে তাড়াহুড়ো করে নয়; বরং তথ্য-উপাত্ত, অর্থনৈতিক মডেলিং, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে করা উচিত।

এলপিজি ও ভোজ্যতেল: যে অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করা যায় না

বাংলাদেশে বাজার উন্মুক্ত করার পর একটি প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছে, সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেই কি বাজারে সেই দামে পণ্য পাওয়া যায়? এলপিজির বাজার এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বিইআরসি মূল্য নির্ধারণ করলেও নির্ধারিত দামে ভোক্তা সবসময় সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। জ্বালানি খাতের সাবেক কর্মকর্তাদের একজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে এলপিজি কেনার অভিযোগ রয়েছে।

ভোজ্যতেলের বাজারেও সরবরাহ ঘাটতি এবং দাম বাড়ানোর অভিযোগ নতুন নয়। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর অনুমতি না পেলে সরবরাহ কমিয়ে বাজারে চাপ তৈরি করেন, এমন অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। একই উৎসে সরকারি নির্ধারিত ১৯৮ টাকা কেজির তেল ২২০ টাকায় বিক্রির উদাহরণও রয়েছে।

অবশ্য এসব উদাহরণ থেকে সরাসরি সিদ্ধান্ত টানা যাবে না যে, জ্বালানি তেল বেসরকারি খাতে গেলেই একই ঘটনা ঘটবে। এখানে পণ্যের বাজার কাঠামো আলাদা।

কিন্তু এগুলো একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে এমন দেশে, যেখানে বাজার তদারকি, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধে রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, সেখানে কৌশলগত পণ্যের বাজার উন্মুক্ত করার আগে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা জরুরি।

জ্বালানির বাজারে সিন্ডিকেট হলে ক্ষতি হবে বহুগুণ

ভোজ্যতেলের বাজারে সিন্ডিকেট বা সরবরাহ ঘাটতি হলে একটি পরিবারের খাদ্য ব্যয় বাড়ে। কিন্তু জ্বালানি তেলের বাজারে একই ধরনের সমস্যা হলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে পুরো অর্থনীতিতে।

কারণ জ্বালানির দাম বাড়ায় → পরিবহন ব্যয় → পণ্য পরিবহনের খরচ → কৃষি ও শিল্পের ব্যয় → উৎপাদন খরচ → পণ্যের দাম → সর্বপরি, মূল্যস্ফীতি।

এটি কেবল তাত্ত্বিক আশঙ্কা নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির অজুহাতে ২০২৬ সালে একাধিকার আভ্যন্তরীন বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয। প্রথম দফা ১৯ এপ্রিল একবারে সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ানো হয়। এ দফায় ডিজেল ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়। তার পরপরই ১ জুন থেকে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার অধীনে আবারও দাম কিছুটা বাড়ানো হয়। এ দফায় ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়ানো হয়। জুলাই ও আগস্ট মাসেও এই দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

আগে থেকেই বিগত ৪ বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মুল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। তারওপর এই দুই দাফায় জ্বালানি তেলের বড় ধরণের দাম বৃদ্ধির কারণে তখনই পরিবহন ও খাদ্য ব্যয়ের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। বাস্তবে সেই আশংকাই সত্যি হয়েছে। পরের মাসেই পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিততে মুল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপর উঠে যায়।

বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতিও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে নেমেছে, যা আগের অর্থবছরের ১০ দশমিক ০৩ শতাংশের চেয়ে কম। কিন্তু চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা এখনও কাটেনি। সাম্প্রতিক সময়ে মুল্যস্ফীতি যে সামান্য পরিমানে কমেছে তা পণ্যমুল্য কমার কারণে নয়। উচ্চ মুল্যভিত্তির কারণে। কারণ যে মূল্যের সঙ্গে এখনকার মুল্য তুলনা করে মুল্যস্ফীতি ঘোষণা করা হয়, সেই মুল্যভিত্তিও ছিল চড়া। যে কারণে এখন পন্যমুল্য না কমলেও মুল্যস্ফীতি ক্রমান্বয়ে কমে আসবে। এতে মুল্যস্ফীতি খাতায়পত্রে কম দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের উচ্চমুল্যের দুর্ভোগ কমবে না।

তাই এই সময়ে জ্বালানির বাজারে এমন কোনো নীতি গ্রহণ করা ঠিক হবে না, যা নতুন করে সরবরাহ ও মূল্য অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ: স্বচ্ছতা জরুরি

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি মূল্য সমন্বয় ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় ও বিনিময় হারের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ করা এবং জ্বালানি ভর্তুকির চাপ কমানো।

এটি নীতিগতভাবে একটি যুক্তিসংগত ব্যবস্থা হতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলে তার সুবিধা ভোক্তাকে দেওয়া এবং দাম বাড়লে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা, দুটিই একটি স্বচ্ছ সূত্রের মাধ্যমে হওয়া উচিত।

কিন্তু বেসরকারি আমদানিকারক যুক্ত হলে প্রশ্ন আরও জটিল হবে। তখন জানতে হবে- আমদানিকারকের প্রকৃত আমদানি ব্যয় কী?; পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয় কত?; তার মুনাফার সীমা কত?; সরকারি নির্ধারিত দামের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?; আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে স্থানীয় বাজারে কত দ্রুত দাম কমবে?; আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে কতটা দ্রুত দাম বাড়ানো যাবে? এবং সরকার ভর্তুকি দিলে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সমান সুবিধা পাবে কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর নীতিমালায় স্পষ্ট না থাকলে ‘বাজার উন্মুক্ত’ হলেও ভোক্তার জন্য বাজার স্বচ্ছ হবে না। বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিমও বলেছেন, বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান পাশাপাশি থাকলে মূল্য নির্ধারণ, প্রতিযোগিতা, বাজারে প্রবেশাধিকার, বিতরণ এবং ভর্তুকির কাঠামো স্পষ্ট করতে হবে।

আইএমএফের চাপই কী কারণ

জ্বালানি মূল্য ও ভর্তুকির প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশে বিতর্ক রয়েছে। আইএমএফের মূল নীতিগত অবস্থানের মধ্যে ছিল জ্বালানি ভর্তুকি কমানো, জ্বালানি মূল্যকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় ব্যবস্থার মাধ্যমে ভর্তুকির চাপ কমানো।

তারই আলোকে আইএমএফ বাংলাদেশকে জ্বালানি তেল আমদানি-বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

বাংলাদেশ ২০২৬ সালে আগের ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ কর্মসূচি থেকে বের হয়ে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। নতুন আলোচনাতেও রাজস্ব বাড়ানো, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। আইএমএফ সবচেয়ে বেশি চাপ দিচ্ছে, সরকারি অর্থে ভর্তূকি কমানো। কিন্তু প্রশ্ন হলো- সরকার কি আইএমএফের টাকায় ভর্তূীক দেয়, নাকি জনগনের করের টাকায় ভর্তূকি দেয়। সরকার জনগনের টাকায় ভর্তূীক দিলে আইএমএফের এতো উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ কী। আইএমএফ তো কখনো মুল্যস্ফীতি কমানোর কথা বলে না। বললেও পুরোনো তত্ত্ব হাজির করে বলে মুদ্রানীতি কঠোর করার মাধ্যমে মুল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে। কিন্তু বাংলাদেশে মুল্যস্ফীতি তৈরি হয়েছে পণ্যের উচ্চ মুল্য ও উচ্চ বিনিময় হারের কারণে। আইএমএফের উচিত কিভাবে পণ্যমুল্য এবং উচ্চ বিনিময় হার কমানো যায় সে ব্যাপারে পরামর্শ দেয়া। যাতে আমদানি ব্যয় কমে গিয়ে পণ্যমুল্য কমে আসে। আর যদি ভর্তূকি কমাতেই হয়, তাহলে ভর্তুকি কমানোর নীতি কীভাবে জনগণের ওপর অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ না দিয়ে বাস্তবায়ন করা যায়, সেই পরামর্শ দেয়া উচিত।

সিন্ডিকেট: দৃশ্য ও অদৃশ্য

ভর্তুকি কমলেই কি জনগণের লাভ হবে?

ভর্তুকি অর্থনীতিতে সবসময় খারাপ, এমন ধারণাও সঠিক নয়। আবার ভর্তুকি চিরস্থায়ী করাও কোনো সমাধান নয়। যেখানে ভর্তুকি অপচয় হয়, ধনী-গরিব নির্বিশেষে একই সুবিধা পায় বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা ঢেকে রাখে, সেখানে সংস্কার দরকার।

কিন্তু জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর সময় দেখতে হবে, তার বিপরীতে সাধারণ মানুষের ওপর কী পরিমাণ মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হচ্ছে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে- সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে কাকে? রাষ্ট্র যদি জ্বালানির দাম কিছুটা সহনীয় রাখতে অর্থ ব্যয় করে, সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থই। প্রশ্ন হওয়া উচিত সেই অর্থ দক্ষভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না। ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দিয়ে যদি বাজারের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত বাজারক্ষমতা অর্জন করে এবং ভোক্তাকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের ভর্তুকি কমলেও জনগণের বোঝা কমবে না। বরং ভর্তুকির জায়গায় বেসরকারি মুনাফা বড় হয়ে উঠতে পারে।

আসল দুর্বলতা দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা

এই বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা। বিইআরসির সক্ষমতা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বেসরকারি জ্বালানি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু প্রবিধান দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

বিইআরসির একজন সদস্যও বলেছেন, বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি দেওয়ার বিষয়টি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং এ মুহূর্তে এ বিষয়ে কমিশনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি।

এ অবস্থায় প্রশ্ন হলো, যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বর্তমান কাঠামোয় পর্যাপ্ত ক্ষমতা ও বিধিবিধান নিয়ে কাজ করতে পারছে না, তাকে আরও বড় ও শক্তিশালী বেসরকারি বাজারের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কীভাবে প্রস্তুত করা হবে?

বেসরকারি খাতকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। ভয় পাওয়ার কারণ হলো দুর্বল নিয়ন্ত্রণের মধ্যে শক্তিশালী ব্যবসায়িক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন।

রাষ্ট্রীয় একচেটিয়ার বিকল্প বেসরকারি একচেটিয়া হতে পারে না

বিপিসির বর্তমান ব্যবস্থারও সংস্কারের প্রয়োজন আছে। আমদানি, মজুত, পরিবহন, সরবরাহ, বিপণন ও মূল্য নির্ধারণে আরও দক্ষতা আনা দরকার। বিপিসির অবকাঠামো আধুনিক করা এবং অপচয় কমানো জরুরি।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দুর্বলতার সমাধান যদি হয় কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলের বড় অংশ তুলে দেওয়া, তাহলে সেটি কোনো অর্থবহ সংস্কার হবে না।

রাষ্ট্রীয় একচেটিয়ার জায়গায় বেসরকারি একচেটিয়া তৈরি করা বাজার সংস্কার নয়। বরং বেসরকারি খাতকে এমনভাবে যুক্ত করতে হবে, যাতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরস্পরের প্রতিযোগী হয়, কিন্তু কেউই বাজারের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে না পারে।

পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোই টেকসই সমাধান

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে, দেশে তেল পরিশোধন ক্ষমতা বাড়ানো। বর্তমানে দেশের বার্ষিক পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল ও কেরোসিনের চাহিদা প্রায় ৬৫ লাখ টন। এর মধ্যে মাত্র ১২ থেকে ১৫ লাখ টন দেশে পরিশোধন করা হয়; বাকিটা পরিশোধিত তেল হিসেবে আমদানি করা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অপরিশোধিত তেল আমদানি করে দেশে পরিশোধন করতে পারলে প্রতি লিটারে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে।

অর্থাৎ শুধু ‘কে তেল আমদানি করবে’ এই প্রশ্নের বদলে আরও বড় প্রশ্ন হতে পারে: কেন বাংলাদেশ আরও বেশি পরিশোধন সক্ষমতা তৈরি করবে না? দেশে পরিশোধন ক্ষমতা বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো, স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানো এবং সরবরাহের স্থিতিশীলতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

বেসরকারি বিনিয়োগ এখানে আসতে পারে। নতুন রিফাইনারি, স্টোরেজ, পাইপলাইন, টার্মিনাল ও আধুনিক লজিস্টিকস নির্মাণে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে।

শেষ ভরসা হতে হবে রাষ্ট্র

জ্বালানি বাজারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি দেখা যায় সংকটের সময়ে। স্বাভাবিক বাজারে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাভের হিসাব করে ব্যবসা করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে, আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে বা বৈদেশিক মুদ্রার সংকট তৈরি হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কি একইভাবে লোকসান নিয়ে সরবরাহ অব্যাহত রাখবে?

এটি একটি বাস্তব প্রশ্ন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিমও প্রশ্ন তুলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট তৈরি হলে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যদি বলে তারা আমদানি করতে পারবে না, তখন সরকার কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে?

এ কারণেই বেসরকারি আমদানি চালু হলেও কৌশলগত সরকারি মজুত এবং সরকারি আমদানি সক্ষমতা কোনোভাবেই দুর্বল করা যাবে না। সরকারের হাতে এমন সক্ষমতা থাকতে হবে, যাতে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ কমিয়ে দিলে বা বাজার থেকে সরে গেলে রাষ্ট্র নিজেই দ্রুত ঘাটতি পূরণ করতে পারে।

তাহলে পথ কী?

সমাধান বেসরকারি খাতকে বাদ দেওয়া নয়। আবার চোখ বন্ধ করে বাজার ছেড়ে দেওয়াও নয়। প্রথমত, বেসরকারি খাতকে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হলে সব যোগ্য প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, একটি প্রতিষ্ঠান যাতে আমদানি, মজুত, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা বাজারের অস্বাভাবিক বড় অংশ একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সে জন্য বাজার-হিস্যার সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক মূল্য, পরিবহন ব্যয়, মজুত ব্যয়, কর-শুল্ক ও মুনাফার কাঠামো স্বচ্ছ করতে হবে। চতুর্থত, কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে মজুত বা সরবরাহ বন্ধ করলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্থানীয় বাজারে তার সুফল পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। ষষ্ঠত, বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানকে একই মূল্য ও ভর্তুকি কাঠামোর আওতায় আনতে হবে, যদি ভর্তুকি রাখা হয়। সপ্তমত, বিইআরসিকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন, শক্তিশালী ও দক্ষ করতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রবিধান দ্রুত অনুমোদন করতে হবে। অষ্টমত, বিপিসির আমদানি সক্ষমতা ও কৌশলগত মজুত কোনোভাবেই কমানো যাবে না।

নবম, সরকারি তিন বিপণন কোম্পানি—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—কে আরও দক্ষ করে প্রয়োজনে তাদের নিজস্ব আমদানির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠনও এমন দাবি জানিয়েছে। সবশেষে, নীতিমালা প্রণয়নের আগে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা সমীক্ষা প্রকাশ করা উচিত।

সিন্ডিকেট ও মজুতদারির পরিণাম

জনগণ যাতে নতুন বাজার-ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে

বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি কমানো, মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে নেমে এলেও জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, অর্থাৎ স্বস্তি এখনও অনেক দূরে।

এমন সময়ে জ্বালানি বাজারে সংস্কার অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু সেই সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত দক্ষতা, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা এবং কম খরচে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ।

শুধু রাষ্ট্রের ভর্তুকি কমানো সংস্কারের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। কারণ জনগণকে যদি আজ রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির বোঝা থেকে মুক্ত করে আগামীকাল কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মূল্য-ক্ষমতার কাছে জিম্মি করা হয়, তাহলে সংস্কারের অর্থ কী দাঁড়াবে?

বাংলাদেশের ভোক্তারা ইতোমধ্যে নিত্যপণ্যের বাজারে নানা ধরনের বাজার-অস্থিরতা দেখেছেন। জ্বালানি তেলের বাজারে সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি হলে তার মূল্য দিতে হবে পুরো অর্থনীতিকে। তাই বেসরকারি বিনিয়োগ আসুক, কিন্তু বাজারের নিয়ন্ত্রণ যেন কারও হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়। নতুন রিফাইনারি হোক, স্টোরেজ বাড়ুক, আমদানির উৎস বাড়ুক, প্রযুক্তি আসুক, সরবরাহব্যবস্থা আধুনিক হোক, সবই প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রের হাতে থাকতে হবে জ্বালানি নিরাপত্তার চাবিকাঠি। কারণ ব্যবসায়ীর দায়িত্ব মুনাফা করা; রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষা করা।

শেষ কথা

জ্বালানি তেলের বাজারে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ তাই নিজে কোনো সমস্যা নয়। সমস্যার সম্ভাবনা তৈরি হয় তখনই, যখন দুর্বল নিয়ন্ত্রণের মধ্যে শক্তিশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বাজারের ওপর অস্বাভাবিক ক্ষমতা অর্জন করে।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অদক্ষতা থাকলে তার সংস্কার করতে হবে। বিপিসিকে আরও দক্ষ করতে হবে। রিফাইনারি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আমদানি ও মজুত ব্যবস্থায় প্রযুক্তি আনতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগকে সুযোগ দিতে হবে।

কিন্তু এই সংস্কারের মৌলিক শর্ত একটাই হতে হবে, রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ভাঙতে গিয়ে যেন বেসরকারি একচেটিয়া বাজার তৈরি না হয়।

বাংলাদেশের মানুষের সামনে এখন নতুন কোনো সিন্ডিকেটের ভয় তৈরি করার সময় নয়। সময় হলো এমন একটি জ্বালানি বাজার গড়ে তোলার, যেখানে ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করবেন, প্রতিযোগিতা করবেন, মুনাফা করবেন, কিন্তু ভোক্তা তার হাতে জিম্মি হবেন না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি দাড়ায়, কে জ্বালানি তেল আমদানি করবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, জ্বালানি তেলের বাজারে রাষ্ট্র কার স্বার্থকে সবার আগে রাখবে: ব্যবসায়ীর বাজারক্ষমতা, নাকি জনগণের ক্রয়ক্ষমতা?

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক