পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজারে সামরিক বাহিনীর একদল বিদ্রোহী সেনার হামলার পর রাজধানী নিয়ামির গুরুত্বপূর্ণ একটি সামরিক বিমানঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের দাবি করেছে দেশটির সরকার। শনিবারের এই হামলা সামরিক শাসক আবদুরাহামানে তিয়ানির জন্য নতুন করে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
রাজধানীজুড়ে গুলির শব্দ ও বিস্ফোরণ
শনিবার ভোরে নিয়ামির বিভিন্ন এলাকায় গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। সামরিক বিমানঘাঁটি এবং প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের আশপাশেও ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
বেসামরিক বিমানবন্দরের একই চত্বরে অবস্থিত ওই বিমানঘাঁটিটি নাইজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সামরিক বিমান ও চালকবিহীন বিমান রয়েছে। পাশাপাশি নাইজার, মালি ও বুরকিনা ফাসোর সমন্বয়ে গঠিত সাহেল জোটের সন্ত্রাসবিরোধী একটি ইউনিটও সেখানে অবস্থান করে।
এ ছাড়া রাশিয়া ও ইতালির বাহিনীর সদস্যরাও ওই এলাকায় অবস্থান করছেন। রাশিয়ার আফ্রিকা কোর্পস নামের সামরিক বাহিনীকে বিদ্রোহীদের দমন করতে সহায়তার অনুরোধ করা হয়েছিল বলে রুশ রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন।
শত শত সেনা বিদ্রোহে জড়িত
নাইজারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, কয়েক শ অসন্তুষ্ট সেনা এই হামলায় অংশ নেয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ চলার পর তিয়ানির অনুগত বাহিনী বিমানঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বিদ্রোহী সেনাদের আত্মসমর্পণের দৃশ্যও প্রচার করা হয়েছে। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তিনটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী তিয়ানির পক্ষে অবস্থান নেয়। তবে রোববার সকাল পর্যন্ত তিয়ানি নিজে জনসমক্ষে আসেননি।
জঙ্গি হামলায় ক্ষোভ বাড়ছে
নাইজারের সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষের পেছনে জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের ব্যর্থতা বড় কারণ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট জঙ্গিরা নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে। চলতি মাসের শুরুতে ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট একটি হামলায় ১৮ সেনা নিহত হয়।
সাম্প্রতিক বিদ্রোহে রাজধানীর সেনাদের পাশাপাশি ওয়াল্লাম, তেরা ও দোসো এলাকার সেনারাও অংশ নিয়েছিল বলে জানা গেছে। এসব এলাকায় জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে নাইজারের সেনাবাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ফলে সামনের সারিতে থাকা সেনাদের মধ্যে সরকারের প্রতি হতাশা বাড়ছে বলে নিরাপত্তা সূত্র ও বিশ্লেষকদের মত। এতে তিয়ানির জন্য জঙ্গি বিদ্রোহের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।
পশ্চিমাদের থেকে দূরে, রাশিয়ার আরও কাছে
২০২৩ সালের জুলাইয়ে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট মোহামেদ বাজুমকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে নাইজার সামরিক কর্মকর্তাদের শাসনে রয়েছে।
ক্ষমতা দখলের পর তিয়ানি সরকার পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিম আফ্রিকার আঞ্চলিক জোট থেকেও দূরত্ব তৈরি করেছে।
এর মধ্যেই দেশটির ইউরেনিয়াম খাত নিয়েও সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে। ফরাসি প্রতিষ্ঠান ওরানোর সম্পদও নাইজার দখলে নিয়েছে। পরমাণু জ্বালানি উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইউরেনিয়ামের অন্যতম সরবরাহকারী ছিল নাইজার।
সাম্প্রতিক সেনা বিদ্রোহ তাই শুধু একটি বিমানঘাঁটি দখলের ঘটনা নয়; বরং জঙ্গি সহিংসতা, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে তিয়ানির সামরিক সরকারের স্থিতিশীলতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
নাইজারে সামরিক শাসনের ভবিষ্যৎ এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ঐক্য এখন দেশটির রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















